শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০
The Daily Ittefaq

অটোরিকশা চার্জে বিদ্যুৎ চুরি বিলের বোঝা অন্যের কাঁধে

নারায়ণগঞ্জে বিদ্যুৎকর্মী ও মালিকদের যোগসাজশে অনিয়ম

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৪, ০২:০০

নারায়ণগঞ্জবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে গোলটেবিল বৈঠকে বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে ফুটপাত এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে আপাতত হকার সমস্যা কিছুটা সমাধান হলেও শহরের সড়কগুলোতে অবৈধ অটোরিকশা প্রতিরোধ করা হবে—জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা দেওয়া হলেও মূলত অবৈধ অটোরিকশা শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে প্রবেশ বন্ধে কার্যকর তেমন ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে না। তবে রমজানের শুরুতে অটোরিকশার ব্যাপারে কঠোর মনোভাব থাকলেও এখন কিছুটা শিথিল হয়ে পড়েছে প্রশাসন।

অথচ অভিযোগ রয়েছে, অটো গ্যারেজগুলোতে অবৈধ বিদ্যুত্সংযোগ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অথচ গোলটেবিল বৈঠকে জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হক অটো গ্যারেজগুলোর প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, শহরে কোনোভাবে ব্যাটারিচালিত অটো, মিশুক, ইজিবাইক প্রবেশ করতে পারবে না। তারা যদি এই নির্দেশনা না মানে তাহলে গ্যারেজে অভিযান পরিচালনা করা হবে। তার হুঁশিয়ারির পর এখনো অবাধে শহরে অটোরিকশা প্রবেশ করছে। ঘোষণার পর দেড় মাস পার হলেও এ পর্যন্ত গ্যারেজগুলোতে কোনো অভিযান চালানো হয়নি। কবে নাগাদ হবে তাও জানেন না নগরবাসী।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের কাশিপুর ইউনিয়নে অটোরিকশা ও মিশুকের গ্যারেজ রয়েছে ২৫০টি। এছাড়া ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ, গোগনগরসহ অন্য জায়গায় অন্তত ৭০০ গ্যারেজ রয়েছে। ঐসব গ্যারেজে ডিপিডিসির অসাধু মিটার রিডারদের মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। রাতদিন অবৈধ লাইন দিয়ে অটোগাড়ির ব্যাটারি চার্জ করা হয়। বিভিন্ন শিফটের চালকরা চার্জ করা অটোগাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হন। এক বেলা শেষে ফের গাড়ি জমা করতে হয় গ্যারেজে। এটাই এখন নারায়ণগঞ্জের বাস্তব চিত্র। আগে রিকশা রাখা হতো। এখন মহল্লায় মহল্লায় চার্জের অটোগাড়ির গ্যারেজ তৈরি হয়েছে। রিকশা ছেড়ে মালিকরা এখন অটোগাড়ির ব্যবসা ধরেছেন। এ গাড়িতে উপার্জন হয় বেশি। চার্জ দিতে বিদ্যুৎ বিল লাগে না। দুয়েকটা গাড়ির বিল দিয়ে বাকিগুলোর বিল চুরি করা হয়। গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে অসাধু মিটার রিডার ও বিল বিলিকারকদের দহরম-মহরম সম্পর্ক। মিটার রিডাররা নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ায় তারাও একবারেই নিশ্চুপ। প্রশাসনের কারো এ ব্যাপারে বাড়তি কোনো নজর নেই। গ্যারেজমালিকরা ছয়-নয় করে বিদ্যুৎ বিল মেরে দেয়। সেই টাকা দিয়ে নতুন বা চোরাই অটো কিনে আয় বাড়ায়। অথচ সরকার দিনের পর দিন বিদ্যুতের বিল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

কাশিপুর এলাকার কয়েক জন বাড়ির মালিক জানান, ‘এলাকায় অনেকগুলো রিকশার গ্যারেজ রয়েছে। অনেকে বংশ পরম্পরায় রিকশার ব্যবসা করে আসছেন। এরা অধিকাংশ প্যাডেল রিকশায় মোটর সংযুক্ত করে দৈনিক জমা বৃদ্ধি করেছেন। এতে তাদের আয় বেড়েছে। তবে বিপদ হয়েছে আমাদের। আমাদের বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে। মহল্লায় রিকশার গ্যারেজগুলো অটোর গ্যারেজে রূপান্তরের পর থেকেই আমাদের বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে। মিটার রিডারকে প্রশ্ন করলে তারা আজগুবি কথাবার্তা বলেন। কখনো বলেন, পুরোনো বিল অ্যাডজাস্ট হচ্ছে। কখনো বলেন, ভূতুড়ে বিল। এর সঙ্গে কম্পিউটারের ভুলের কথা তো আছেই। মহল্লার গ্যারেজগুলোতে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। সেই চুরির খেসারত দিতে হয় মহল্লার অন্য সাধারণ গ্রাহকদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাবুরাইলের একটি গ্যারেজের ম্যানেজার জানান, মাসদাইর গুদারাঘাট, ঘোষেরবাগ, দেওভোগ পানির ট্যাংক, নাগবাড়ী, মাদ্রাসার শেষমাথা, বাঁশমুলি, গাইবান্দা বাজার, বারৈভোগ, ভোলাইল বাজার, গেদ্দারবাজার, কাশীপুর দেওয়ানবাড়ী, খিলমার্কেট, হোসাইনীনগর, ভূঁইয়াপাড়া, বউবাজার, ১ নম্বর বাবুরাইল শেষমাথা, আমবাগান, হাকিম কন্ট্রাক্টারের মাঠ, বাংলাবাজার ও আশপাশ এলাকায় শতাধিক গ্যারেজ রয়েছে। এসব গ্যারেজে কমপক্ষে ২ হাজার গাড়ি দিনরাত চার্জ দেওয়া হয়। রাস্তায় তিন শিফটে এসব গাড়ি চলে। গ্যারেজগুলোতে বৈধ মিটার থাকলেও অবৈধ লাইন টেনে গাড়ি চার্জ করা হয়। ফলে গ্যারেজের বৈধ মিটারে বিল আসে একেবারেই সামান্য। গ্যারেজের বিদ্যুত্ চুরির খেসারত দিতে হয় আশপাশের গ্রাহকদের। গ্যারেজের মালিক ও বিদ্যুৎ বিল বিতরণকারীর মধ্যে অলিখিত চুক্তি রয়েছে। ওদের চুক্তিতে জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে। তাই নগরবাসীর দাবি, জেলা প্রশাসকের ঘোষণা অনুযায়ী গ্যারেজগুলোতে অভিযান চালানো হোক।

ইত্তেফাক/এমএএম