মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মৃত্যুর আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে চান বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০২৪, ২১:০২

অসুস্থ নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তিনি এ সাক্ষাতের কোনো উপায় পাচ্ছেন না। মৃত্যুর আগে শেখের বেটির (শেখ হাসিনা) সঙ্গে দেখা করতে পারলে শান্তি পাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি। 

এই বীর নারী আরও জানিয়েছেন, আশির দশকের মাঝামাঝি শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল। টাঙ্গাইলের কালিহাতী হয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সখীপুরের বহেড়াতৈলে আসেন শেখ হাসিনা। ওই খানে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ফাতেমার। তখন হাতে হাত রেখে নানা অনুভূতির কথা বলেছিলেন শেখের বেটির কাছে। ফাতেমাকেও কথা দিয়েছিলেন তার দুঃখ-বেদনা আর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ আর বীরত্বগাঁথা শুনবেন। শেখ হাসিনা ফাতেমার হাতে ধরে বলেছিলেন ‘বইন (বোন) গো এখন সময় খুব কম; বেঁচে থাকলে দেখা হবে। সেই কথাই এখন ৭২ বছর বয়সী ফাতেমার বারবার মনে পড়ছে জানিয়ে বলেন, আমার ইচ্ছা ছিল আমি যদি একবার শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে পারতাম, তার মুখটা দেখলেই আমার মনের আশা পূরণ হতো। 

নাতি নাতনিদের সঙ্গে বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন। ছবি: ইত্তেফাক
 
দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করেছেন সখীপুরের ফাতেমা খাতুন। অথচ দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। আর আজ নানা রোগে-শোকে ভুগছেন এই বীর নারী। জানালেন, ‘টাঙ্গাইলের পূর্বাঞ্চলের এই পাহাড়ের কোল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়া শুরু করলো। তখন আমি খুব সাহসী ছিলাম। আমি কোনো কিছুকেই ভয় পেতাম না। তখন মুক্তিযোদ্ধারা বললেন, তোমার মতো একজন সাহসী মেয়ে আমাদের দরকার। যাকে মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটিতে থাকতে হবে, রান্না করা এবং তথ্য ও চিঠিপত্র আনা-নেওয়ার কাজ করতে হবে। আমি তখন ছেলেদের মতো চুল কেটে রাখতাম। নাক-কান না ফোঁড়ার কারণে আমাকে পুরোপুরি ছেলেদের মতো মনে হতো। ফলে আমি সহজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে গেলাম। নানা খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য আমাকে বহেড়াতৈল ক্যাম্প থেকে সখীপুরের কোকিলা পাবর, আমতৈল, আন্দি, সানবান্ধা, ছিলিমপুর, গোহাইল বাড়ি, রতনগঞ্জ ও মরিচাসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠাতো। এ ছাড়া বহেড়াতৈল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে অস্ত্র পাহারা দেওয়া এবং যত্ন নেওয়ার কাজ করতাম। তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য গ্রাম থেকে খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করে আনতাম। বাড়িতে গিয়ে মা-চাচিদের দিয়ে মরিচ, হলুদ এবং অন্য মসলা বেটে নিয়ে যেতাম।’ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কীভাবে দেশের জন্য যুদ্ধের কাজে যোগ দেন বিষয়ে এভাবেই ইত্তেফাক এ প্রতিনিধির কাছে বলছিলেন সখীপুরের একমাত্র নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন।

সখীপুর উপজেলার বহেড়াতৈল গ্রামের সিরাজ উদ্দিন ও লাল জানের মেয়ে ফাতেমা খাতুন। ১৯৭১ সালে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি বহেড়াতৈলে কর্মরত ছিলেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে যেতে চাইলে অল্প বয়সি বলে তাকে যুদ্ধে নিয়ে যাননি মুক্তিযোদ্ধারা। বরং ঘাঁটি পাহারা দেওয়া এবং অন্যান্য কাজের জন্যই তাকে নিযুক্ত করা হয়েছিল বলে জানান ফাতেমা।

একদিন নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে কীভাবে কয়েকজন রাজাকারকে ফাঁদে ফেলেন, সেই ঘটনা সম্পর্কে জানালেন ফাতেমা খাতুন। তার ভাষায়, একদিন মরিচার দিক থেকে কয়েকজন রাজাকার রাইফেলকে চার ভাঁজ করে কাপড়ের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে আসছে। এ সময় তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, এই তুমি ছেলে না মেয়ে? আমি বলি, ছেলে। তখন তারা বলে, তোমাকে তো মেয়ের মতো মনে হয়। তো তুমি কোথায় যাও? আমি তখন বলি, বোনের বাড়িতে যাবো। তখন তারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, বহেড়াতৈলে কি মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি আছে। আমি বলি, না, না এদিকে তাদের কোনো ঘাঁটি নাই। সোজা চলে যান! তারা আমার দেখানো পথ ধরে চলে যায়। সামনে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পড়ে। সেখানে তাদের ধরে বেদম মেরে ফেলে রেখেছিল মুক্তিযোদ্ধারা।’

মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার আগে সখীপুর পৌর সভায় মাস্টাররোলে ঝাড়ুদারের কাজ করতেন এই বীর নারী। অভাব অনটনে থাকা ফাতেমা বর্তমানে নানা রোগে ভুগছেন। টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। আর অসুখের কারণে তেমন হাঁটা চলাও করতেও পারছেন না তিনি। জীবন সায়াহ্নে এসে চলৎশক্তিহীন এই বীর নারীর বেশিরভাগ সময়ই কাটছে তার শয্যাশায়ী হয়ে। রোগে-শোকে ভগ্ন শরীর এবং ভগ্ন মন নিয়ে কোনো রকমে দিন পার করছেন তিনি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমার স্বামী মারা গেছেন দেড় বছর বছর আগে। পরিবারের কোনো জমিজমা নেই। তাই উপজেলা কেন্দ্রীয় স্মৃতিসৌধের পাশে সানবান্ধা এলাকায় বনের জমিতে ঘর তুলে দুই ছেলে ও তিন মেয়ের সঙ্গে বসবাস করে আসছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাসিক ভাতা প্রসঙ্গে ফাতেমা বলেন, কয়েক বছর আগে ছেলে নজরুলকে বিদেশে পাঠানোর জন্য তিনি সোনালী ব্যাংক থেকে ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ওই ঋণের বিপরীতে প্রতি মাসে কিস্তি কেটে নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রতি মাসে তিনি হাতে পাচ্ছেন ১০ হাজার টাকা করে। ওষুধ কিনতেই ওই টাকা খরচ হয়ে যায়।

আবার ফাতেমার ছেলে নজরুলও বিদেশে গিয়ে থিতু হতে পারেননি। ফলে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হন নজরুল। এখন ভ্যানগাড়ি চালিয়ে ও দিনমজুরের কাজ করে যা রোজগার করেন, তা দিয়ে কোনো মতে চলে সংসার। 

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন। ছবি: ইত্তেফাক

ফাতেমা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে ‘বীর নিবাস’ (বাড়ি) করে দেওয়া হয়েছে। তবে, ফাতেমার ওই বীর নিবাস যেখানে বানানো হয়েছে, তার পাশে একটি বাড়িঘরও নেই। ফলে নিস্তব্ধ ওই বাড়িতে একা বাস করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তা ছাড়া, ফাতেমা ছেলেমেয়ের সঙ্গে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ বছর ধরে বসবাস করে আসছেন। সেখানে নাতি-নাতনিসহ অনেককে নিয়ে তার সংসার।

পাঁচ সন্তানের জননী বীর মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন জানান, তার স্বামী মোবারক হোসেন ছিলেন একজন মানসিক প্রতিবন্ধী। টাকার অভাবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারেননি তিনি। ফাতেমা আরও বলেন, শরীরে শক্তি পাই না। সারা শরীর ও মাথায় ব্যথা। মাথা ও সারা শরীরে ঘা হয়েছে। যেন সারা শরীর কীট কীট করে কামড়াচ্ছে! টাকার অভাবে ভালো চিকিৎসাও করাতে পারছি না।’ 

এ প্রসঙ্গে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা এম ও গণি ইত্তেফাককে বলেন, নারী মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খুবই অসুস্থ। তার উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন।

সখীপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ হোসেন পাটোয়ারী ইত্তেফাককে বলেন, নারী মুক্তিযোদ্ধা ফাতেমা খাতুন অসুস্থ এ বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তিনি যাতে উন্নত চিকিৎসা পান সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

ইত্তেফাক/পিও