সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪, ৯ বৈশাখ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

আস্থার সংকটে শেয়ার বাজার ছাড়ছেন বিনিয়োগকারীরা

  • আবারও ডিএসইতে বড় দরপতন
  • এক দিনেই সূচক কমল ৬৮ পয়েন্টর বেশি
আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:০০

চলতি সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে সূচকের উত্থানের পর গতকাল সোমবার আবারও দেশের প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) শেয়ারের বড় দরপতন হয়েছে। এক দিনেই প্রধান সূচকটি কমেছে ৬৮ পয়েন্টর বেশি। এভাবে এক দিন সূচক বাড়ছে তো পরের দিনই আবার কমছে। কিন্তু কেন এ অবস্থা দেশের শেয়ার বাজারের?

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বাজারে আস্থার সংকট প্রকট। ব্যাংকে সুদের হার বাড়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারী থেকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী অনেকেই সেখানে ছুটছেন টাকা রাখতে। গত ২১ থেকে ২৮ মার্চের মধ্যে মাত্র চার কার্যদিবসে ১০ হাজার বিনিয়োগকারী তাদের হাতে থাকা সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। এ সব কারণে শেয়ার বাজার তারল্যসংকটে পড়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলেন, বাজারের এ সংকটময় সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সাপোর্ট দিলে বাজার ঘুরে দাঁড়াত।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল ডিএসইতে লেনদেনকৃত মোট ৩৯৭টি কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের। কমেছে ৩১৫টি প্রতিষ্ঠানের। আর ৩৫টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। এতে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬৮ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৭৬১ পয়েন্টে নেমে গেছে।

অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৩ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে। আর ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৪ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ২৫১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।  সবকটি মূল্যসূচক কমলেও ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। এদিন এই বাজারে লেনদেন হয়েছে ৪৬৮ কোটি ৮২ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৪৬৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে লেনদেন বেড়েছে ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্য সূচক সিএএসপিআই কমেছে ১১৭ পয়েন্ট। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২১৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬২টির দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ১৩৬টির এবং ১৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। লেনদেন হয়েছে ৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগের দিন লেনদেন হয় ১১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এদিকে আস্থার সংকটে শেয়ার বাজার ছাড়ছেন বিনিয়োগকারীরা।

শেয়ার বাজারে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে শেয়ার ও বিও হিসাব সংরক্ষণ করে সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য বলছে, ২৮ মার্চ লেনদেন শেষে শেয়ার বাজারে শেয়ারশূন্য বিও হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫২ হাজার ২১৯, যা এক সপ্তাহ আগে ২১ মার্চ ছিল ৩ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৪টি। সেই হিসাবে মাত্র চার কার্যদিবসে শেয়ারশূন্য বিও হিসাব বেড়েছে ৯ হাজার ৭৪৫টি। যে হারে বিনিয়োগকারীরা সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে বাজারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন, সেভাবে নতুন বিনিয়োগকারী আসছেন না। সিডিবিএলের হিসাবে, গত সপ্তাহে যেখানে প্রায় ১০ হাজার বিও হিসাব খালি হয়, সেখানে নতুন হিসাব খোলা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৭০টি।

বাজারের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট রয়েছে। তাই এক দিন শেয়ারের দাম বাড়লে পরের দিনই আবার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ব্যাংকে সুদের হার বাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা সেখানে যাচ্ছেন। এছাড়া বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপ রয়েছে। সবমিলিয়ে বাজারের এ অবস্থা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাজারে যদি এখন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সাপোর্ট থাকত তাহলে বাজার ঘুরে দাঁড়াত। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ এ প্রসঙ্গে ইত্তেফাককে বলেন, বাজারে ব্যাপক তারল্য সংকট রয়েছে। একদিন বাজার বাড়লেও পরেরদিনই আবার বাজারে দরপতন হচ্ছে। তারপরও আমি বলব বাজার নিয়ে হতাশার কিছু নেই।

দরপতন ঠেকাতে নানা উদ্যোগ:
টানা দরপতনের কারণে বাজারে যাতে ফোর্সড সেল বা জোর করে বিক্রির চাপ না বাড়ে, সে জন্য ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নীতি ছাড়ের মেয়াদ বাড়িয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। শেয়ার বাজারে ঋণদাতা ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের দেওয়া ঋণের অনাদায়ি অংশের জন্য নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনিংয়ের মেয়াদ বাড়িয়ে আগামী বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। 

এ ছাড়া বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তারল্য ও নীতিসহায়তা নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছে ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)। বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ডিবিএ ও বিএমবিএর নেতারা শেয়ারবাজারের বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণে তারল্য সরবরাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিসহায়তা চেয়েছেন।  বাংলাদেশ ব্যাংকও এ ব্যাপারে ইতিবাচক বলে জানা গেছে।

ইত্তেফাক/এমএএম