ন্যাটোর প্রতিরক্ষায় পরবর্তী চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:৩০

গতকাল ছিল নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশেনের (ন্যাটো) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ন্যাটোর এই সুদীর্ঘ ৭৫ বছরের পথচলার ইতিহাসকে মোটাদাগে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে। প্রত্যেক পর্যায়েই ন্যাটোকে বড় ধরনের সংকটের সম্মুখীন হতে দেখা গেছে। পশ্চিমা সুরক্ষার প্রশ্নে অস্তিত্বের হুমকির অবতারণা ঘটেছে এসব পর্যায়ে। ন্যাটো অবশ্য সেসব বেশ ভালোমতোই সামাল দিয়েছে।

হুমকির প্রথম সূত্রপাত ঘটে স্নায়ুযুদ্ধের কালে। আমেরিকার সামনে বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয় তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে প্রথম বারের মতো বসনিয়া ও কসোভোতে সেনা মোতায়েন করে ন্যাটো। এরপর আসে আফগানিস্তান ও ইরাক অধ্যায়। এই দুই ক্ষেত্রে অবশ্য ন্যাটোকে বেশ বুঝেশুনে পা ফেলতে হয়েছে। সবশেষে তৃতীয় পর্যায় আসে ২০১৪ সালে। এই বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনের ক্রিমিয়ায় আগ্রাসন চালান। সোভিয়েত জমানার স্বঘোষিত খেলাফত ঘোষণা করা পুতিনকে ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে আমেরিকার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা ধীরে ধীরে পিছু হটতে থাকে বলে শোনা যেতে থাকে! এ ধরনের পটভূমিতে ন্যাটোর ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে চলে আলোচনা-সমালোচনা।

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে ন্যাটোর ‘চতুর্থ পর্যায়’ বলছেন বিশ্লেষকরা। চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে ন্যাটোকে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল হিসেবে দেখতে চাইছেন অনেকে। এর পেছনে অবশ্য কারণও আছে।

বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ন্যাটো সদস্যরা প্রতিরক্ষা খাতে ক্রমান্বয়ে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমের বিরোধী শক্তিগুলো ঠিকই সামরিক ক্ষমতার আধুনিকীকরণের বিষয়কে বড় করে দেখেছে। সামরিক সক্ষমতার উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। এটা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয় বিশেষ করে ২০২২ সালে। ইউক্রেনে রাশিয়ার বৃহত্তর সামরিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়, ন্যাটোকে শক্তিশালী করতে জোট সংশ্লিষ্টরা যখন অনীহা প্রদর্শন করেছে, ঠিক সেই সময়ে সামরিক শক্তিমত্তা বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখেছে মস্কো।

ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অবশ্যই প্রধান ও একমাত্র দায়ী হচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে সুরক্ষার বিষয়কে অবজ্ঞা, উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে পশ্চিমারা যে উদাসীনতা দেখিয়ে আসছে, তা সাহস জুগিয়েছে পুতিনকে। অনেক ন্যাটো সদস্য এই বিষয়ে একমত হবে যে, ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পটভূমিতে প্রতিরক্ষা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে যে সতর্ক সংকেত ছিল, শক্তি ও শান্তির ভারসাম্য বজায় রাখার প্রশ্নে যা যা করা উচিত ছিল, অনেক ক্ষেত্রে সেসব উপেক্ষা করা হয়েছে।

ওপরের দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করেন ২০০৮-২০১২ সাল মেয়াদে লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা রাসা জুবেনিভিয়েন। ২০১২ সালে পেন্টাগনে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বাকি ন্যাটো সদস্য দেশগুলো সর্বসম্মতিক্রমে একমত হয় যে, ২০১৯ সাল নাগাদ ন্যাটোকে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হতে পারে। বাস্তবতা হলো, এ ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও ন্যাটোর সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যত কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। বরং প্রতিরক্ষা তহবিল নিয়ে হিমশিম অবস্থায় পড়ে যায় ন্যাটো। এই অবস্থা চলতে থাকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত। তত্কালীন ৩০টি ন্যাটো সদস্যের মধ্যে মাত্র তিনটি দেশ নির্ধারিত প্রতিরক্ষাব্যয় পরিশোধ করে। অবস্থা বদলায়নি পরের বছরগুলোতেও। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় সাতে।

এক সাক্ষাত্কারে জুবেভিয়েনিয়েন বলেন, ‘২০১০-এর দশকে ন্যাটো যেন ঘুমিয়ে পড়ে! ঐ সময় আঞ্চলিক হুমকির চেয়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকেই বড় করে দেখেছে জোট। এদিকেই বেশি মনোনিবেশ করে ন্যাটোর অধিকাংশ দেশ। বাজেটের ওপর চাপ পড়বে—কেবল এ কারণেই যে প্রতিরক্ষা ব্যয় পরিশোধ করা হতো না, তা নয়; বরং ভয় ছিল অন্যখানে! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় সবার মধ্যে একধরনের শঙ্কা ছিল, নিয়মিত প্রতিরক্ষা ব্যয় পরিশোধ করা হলে তাতে উসকে যেতে পারে রাশিয়া। বলা যায়, এই ভয়ই চেপে বসেছিল পশ্চিমাদের ঘাড়ে।

জুবেভিয়েনিয়েনের পরের কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আমার মতে, এর ফলে রাশিয়া ধরে নেয় যে, নিজেদের প্রতিরক্ষা সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নয় ন্যাটো সদস্যরা। মস্কোর এ ধরনের চিন্তাই মূলত পুতিনকে ইউক্রেনে আক্রমণ চালাতে উত্সাহ যুগিয়েছে।’

প্রতিরক্ষা বাজেটে দীর্ঘ সময় ধরে তহবিল সরবরাহ না করার ফলে ন্যাটো ক্রমাগত নাজুক হতে থাকে। অবস্থা এতটাই বাজে পর্যায়ে চলে যায় যে, পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে ন্যাটোর অস্ত্রসরঞ্জাজামাদির রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ইউক্রেনকে ন্যাটো যদি অস্ত্র বা গোলাবারুদ সরবরাহ করতে চায়, তাহলে কী পরিমাণ যুদ্ধসরঞ্জাম কিয়েভের হাতে তুলে দিতে পারবে, তা এক প্রশ্ন বটে! অথচ নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ইউরোপের মিত্ররা যদি তাদের বাজেটের ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা বাবদ ন্যাটোর হাতে তুলে দিত, তাহলে অস্ত্রের অভাব পড়ত না একদমই। উপরন্তু, ইউক্রেনকে দেওয়ার পরও বহু অস্ত্র থেকে যেত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইউক্রেনের সাবেক রাষ্ট্রদূত জন হার্বস্টও এমনটাই মনে করেন। হার্বস্টের দাবি বেশ যুক্তিসংগত—‘এর ফলে ইউক্রেনের হাতে আরো বেশি অস্ত্রসরঞ্জাম থাকত, যাতে করে পুতিন আটকানো আরো বেশি সহজ হতো।’

ইউক্রেন ন্যাটোর সদস্য না হওয়ায় ইউক্রেনকে রুশ আক্রমণ থেকে রক্ষা করা ন্যাটোর কাজ নয়। তবে মনে রাখা দরকার, কিয়েভকে সমর্থন করে যাচ্ছে পশ্চিমারা। এর অর্থ, ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন রয়েছে ন্যাটোর। ইউক্রেনকে ন্যাটো মিত্রদের এই যে সমর্থন, (হোক তা প্রকাশ্যে বা আড়ালে) তা কতটুকু কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে? বরং এর মধ্য দিয়ে ন্যাটো দেশগুলোর এক ধরনের দুর্বলতাই লক্ষ করা যায়। অর্থাত্, বছরের পর বছর ন্যাটোর তহবিলে অর্থ প্রদান না করার ফলে এই জোট যে সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন, তা একদম পরিষ্কার।

সত্যি বলতে, ন্যাটো নিয়ে সেভাবে চিন্তা করা হয়নি! একমুহূর্তের জন্য ধরে নেওয়া যাক, ন্যাটোর হাতে এখন প্রচুর অর্থ দেওয়া হলো। এতেই কি রাতারাতি সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? অবশ্যই না। অর্থ থাকা মানেই অস্ত্র থাকা নয়। অন্যদিকে, রাশিয়ার দিকে তাকালে ভিন্ন কিছু দেখা যাবে। যুদ্ধের কথা মাথায় রেখে মস্কো বহু বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে আসছে। অস্ত্রের উত্পাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে ক্রেমলিন। এমনকি আরো অস্ত্রের প্রয়োজন দেখা দিলে যেন উত্তর কোরিয়া ও ইরানসহ পশ্চিমা বিরোধীদের পাশে পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থাও করে রেখেছে। এসব কথার সহজ অর্থ হলো, ‘প্রস্তুতি গ্রহণ ও সচেতনতা’।

তবে ন্যাটো তহবিলে নিয়মিত অর্থ সরবরাহ আগামী দিনগুলোতে বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। আগের চেয়ে আরো বেশি মিত্রকে ন্যাটো তহবিলে তাদের বাজেটের ২ শতাংশ প্রদান করবে বলে আশা প্রকাশ করেছে। আসছে মে মাসে ওয়াশিংটনে ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনের আগেই ন্যাটোর তহবিল বাড়তে চলেছে বলে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।

ন্যাটো নেতা জেনস স্টলটেনবার্গ গত ফেব্রুয়ারিতে বলেছিলেন, চলতি বছর ন্যাটোর ১৮টি সদস্য দেশ তাদের জিডিপির কমপক্ষে ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে কয়েক বিলিয়ন ডলার যুক্ত হবে ন্যাটো তহবিলে। এসবের ফলে ন্যাটোর ভান্ডারে অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত বাড়ানোর  পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আদতে কী পরিমাণ অর্থ আসবে এবং সেই অর্থ দিয়ে কী পরিমাণ অস্ত্রের জোগান সম্ভবপর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

অস্ত্রের পাশাপাশি ন্যাটো সেনাদের নিয়মিত সেনা-প্রশিক্ষণের বিষয় নিয়ে প্রায়ই কথা হয়। এ সম্পর্কে স্টলটেনবার্গ সচেতনতা অবলম্বন করছেন বলেই প্রত্যাশিত। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘ইউক্রেনকে সামরিক সরঞ্জাম প্রদানের পাশাপাশি প্রশিক্ষণের সমন্বয় সাধনের বিষয় নিয়েও আরো বেশি দায়বদ্ধ হওয়া উচিত।’

ন্যাটো তহবিলে দেশগুলোর অর্থ প্রদানের খবর স্বস্তির বটে। তবে এক্ষেত্রে অন্য কথাও আছে। ন্যাটোর সাবেক যুক্তরাজ্য রাষ্ট্রদূত পিটার রিকেটসকে এক সাক্ষাত্কারে বলতে শোনা গেছে, ‘দেশগুলোর ২ শতাংশ প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে মনে রাখতে হবে, নতুন অর্থের কার্যকারিতার সুফল পেতে সাধারণত লম্বা সময় লেগে যায়। হতে পারে তা কয়েক বছর। ফলে এক্ষেত্রে যে আমাদের বেশ দেরি হয়ে গেছে, তা অস্বীকার করা যায় না। অথচ এই সময়ের মধ্যে ইউরোপে হুমকি বেড়েছে অনেকখানি। বিশেষত ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার সংবাদ ইউরোপের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনছে।’

৭৫ বছরের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় ন্যাটোর এই নাজুক অবস্থা দুঃখজনকই বটে। তবে অবস্থা আরো বেশি খারাপ হওয়ার আগেই যে দেশগুলো এ নিয়ে সচেতন হয়ে উঠেছে, সেটাই ভালো লাগার বিষয়। একেবারে না হওয়ার চাইতে দীর্ঘকালে হলেও তাকে ভালোই বলতে হয়।

ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে ন্যাটোর পরিসর আরো কিছুটা বেড়েছে। ফলে নতুন কিছু দেখা যাওয়াটাই স্বাভাবিক। ঠিক এ কারণেই ন্যাটোর সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডগলাস লুটে মনে করেন, ‘আমি মনে করি গ্লাসকে অর্ধেক খালি না বলে অর্ধেক পূর্ণ মনে করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বিশ্বের মানচিত্রে ন্যাটোর আঞ্চলিক সীমানা এখনো বেশ নিরাপত্তাবেষ্টিত। নতুন উদ্যোগের মধ্য দিয়ে এই চিত্র আরো সুদৃঢ় হবে বলেই ধরে নিতে হবে।’

লেখক: সিএনএন ডিজিটালের যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় নীতি ও রাজনীতির সম্পাদক
সিএনএন থেকে অনুবাদ: সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন