সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে জবি উপাচার্য 

‘বাবা মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করার পরামর্শ দিতেন’

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৪, ১৬:৫৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফজলুল হালিম চৌধুরীর ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ (৯ এপ্রিল)। তিনি ১৯৭৬-১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৩ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের স‌ঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী। তার কন্যা অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জ‌বি) উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মৃতিচারণ করে জবি উপাচার্য সাদেকা হালিম বলেন, ১৯৮০ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বর্ষে ভর্তি হই, তখন বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। বাবা আমাকে বলেছিলেন, অন্যান্যদের মতোই শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রথম পরিচয়, এরপর উপাচার্যের মেয়ে হিসেবে পরিচয়। আমি যেন সবার সঙ্গে মিশে চলি, ভালো আচরণ করি এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করি বাবা সেই পরামর্শ দিতেন সবসময়। 

ড. সাদেকা হালিম বলেন, যখন আমি সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করি তখন বাবা আমাকে বলেছিলেন অনার্স বা মাস্টার্সে ফার্স্ট হওয়া কিছুই না যতক্ষণ না পর্যন্ত তুমি ভালো একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করবে এবং সেই পিএইচডি ডিগ্রিই তোমাকে শিক্ষকতার শীর্ষে নিয়ে যাবে। কারণ শিক্ষকদের জন্য আর্টিকেল প্রকাশ করা ও বই লেখার পাশাপাশি উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া আবশ্যক।

উপাচার্য আরও বলেন, আমি সবসময় আমার বাবাকে দেখে বড় হয়েছি। আমার বাবা যখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে উপাচার্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন তখন তিনি অতিরিক্ত সাত দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ব্যবহার করেছিলেন। গাড়ি ব্যবহার করার জন্য বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রারকে চিঠি দিয়েছিলেন এবং চিঠিতে বলেছিলেন অতিরিক্ত সাত দিন গাড়ি ব্যবহার করায় যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন হয়েছে তার খরচ আমি দিতে চাচ্ছি। সেই চিঠিটা আমি এখনো সংরক্ষণ করে রেখেছি। 

তিনি আরও বলেন, আমি যখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছি তখন আমার মনে হয়েছে বাবা আমার সঙ্গে ছায়া হয়ে আছেন। তার অনেক দোয়া-আশীর্বাদ আমার মাথার ওপরে আছে। আমি যেন বাবার আত্মসম্মানবোধ বজায় রেখেই উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারি সেটিই কামনা করি। 

অধ্যাপক ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী ১৯৩০ সালের ১ আগস্ট জেলার কুঞ্জ শ্রীপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে বিএসসি (সম্মান) প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং এমএসসি (স্নাতকোত্তর) প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। 

১৯৫২ সালে ফজলুল হালিম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৬৩ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত হন। 

অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী ১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত রসায়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭২ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে বিজ্ঞান সদস্য হিসেবে প্রথম নিয়োগ পান। 

১৯৭৬ সালে ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট থেকে নীল প্যানেলে উপাচার্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৮৫-১৯৯১ সাল পর্যন্ত ইউনেস্কোতে বিজ্ঞান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। সেই দায়িত্ব পালনকালেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কোর্স ও সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করেন, পাশাপাশি বিজ্ঞান গবেষণাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করেন।  

অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী বাংলাদেশ রসায়ন সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইলেক্ট্রো রসায়ন, সেলুলোজ রসায়ন এবং পলিইলেক্ট্রোলাইটস-এর ভৌত রসায়ন ক্ষেত্রে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে তার প্রায় ৩০টির মতো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

ড. ফজলুল হালিম চৌধুরী কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নুফিল্ড ফাউন্ডেশনের ফেলো (১৯৬০-১৯৬২), একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কমনওয়েলথ একাডেমিক স্টাফ ফেলো (১৯৭২-১৯৭৩),এশিয়া ফাউন্ডেশন এবং আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স-এর সিনিয়র ফেলো ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালের ৯ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।

ইত্তেফাক/এএএম