মুজিবনগর সরকার ও আজকের বাংলাদেশ

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৩০

পৃথিবীর প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের একটা ইতিহাস থাকে। স্বাধীন-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ইতিহাস তৈরি হয়। সেই ইতিহাসের ওপর ভর করে গড়ে ওঠে নতুন সভ্যতা, নতুন সংস্কৃতি। একেক দেশের ইতিহাস একেক রকম। আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাস আত্মত্যাগের ইতিহাস, সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ইতিহাস নানাভাবে বাঙালির বীরত্বকে করেছে সমৃদ্ধশালী। আমাদের বাঙালি জাতির ঐতিহ্যের অঙ্গীকার কীভাবে প্রশমিত হয়েছে তা সত্যি এক বিস্ময়কর ঘটনা বটে।

আমরা কেবল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের ৯ মাসকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি। কিন্তু এর পূর্বাপর ঘটনাবলি কতটা মহিমান্বিত করেছে, সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছি? আমাদের প্রত্যয়দীপ্ত মানসিকতার বিভাজনকে ভেবে দেখার চেষ্টা করি না। কয়েকটি বিষয় আজও রয়েছে অমীমাংসিত কিংবা অবিবেচনাপ্রসূত। বাঙালি জাতির ইতিহাসের মহানায়ক সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আজও বিতর্কে জড়িয়ে সার্বভৌম দেশের ঐতিহাসিক মহিমাকে কলঙ্কিত করেই চলেছি। একদল আছে, যারা বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করতে কার্পণ্য বোধ করে।

আরেক দল আছে, বঙ্গবন্ধুকে অতিমাত্রায় অতি উচ্চতায় ওঠাতে গিয়ে মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে চলেছে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ—এ দুটি অভিন্ন শব্দ কিংবা সমার্থক শব্দ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে যত্রতত্র ব্যবহার করে তার ভাবমূর্তি, তার আদর্শের অবিচার করা হচ্ছে। একদল কুচক্রী ক্ষমতার আশপাশে থেকে বঙ্গবন্ধুকে ঘোড়সয়ার বানানোর প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তাদের সেই চেষ্টা যদি সফল হয়ে যায়, তবে বাংলাদেশের মৌলিকত্ব বিনষ্ট হতে বাধ্য। যুদ্ধজয়ের ইতিহাস নানাভাবে বর্ণিত হচ্ছে। তবে ইতিহাসে যার যে স্থান আছে, সেখানে থাকবেই। স্থানচ্যুত করা অত সহজ নয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্তভাবে জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল, যার রূপরেখা বঙ্গবন্ধু নিজেই তৈরি করে গিয়েছিলেন।

২৫ মার্চ ১৯৭১ কালরাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানি জান্তা বাহিনী। গ্রেফতারের প্রাক্কালে ২৬ মার্চকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। শুরু হয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাঙালি নিধনযজ্ঞ। ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানিরা। সে এক বীভত্স দৃশ্য। নিরীহ মানুষ প্রাণ বাঁচাতে শহর ত্যাগ করে গ্রামে চলে যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয় প্রায় ১ কোটি শরণার্থী। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ভারতে ট্রেনিং নেয় বাংলার দামাল ছেলেরা। এমনি পরিস্থিতিতে ১০ এপ্রিল গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। কেননা, একটি যুদ্ধ পরিচালনা করতে রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর প্রয়োজন পড়ে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকার।

প্রবাসী সরকারের আদলে গঠিত সরকারের নামকরণ করা হয় ‘মুজিবনগর সরকার’। ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় নতুন সরকারের। কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করে এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। মেহেরপুর বর্তমানে একটা জেলা এবং বৈদ্যনাথতলা মুজিবনগর হিসেবে নামাঙ্কিত হয়। এখন মুজিবনগর মেহেরপুর জেলার একটি উপজেলা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকলেও তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। তবে বঙ্গবন্ধুর সক্রিয় অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধকালীন সরকারের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তাজউদ্দীন আহমদ।

মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠানটি পরিচালন করেন তদানীন্তন সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী। এক অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল মুজিবনগর সরকার। আব্দুল মান্নান শপথ করালেও শপথবাক্য তৈরি করেছিলেন ঊষীনর মজুমদার—তারা এখন প্রত্যেকেই প্রয়াত। মুজিবনগর সরকার গঠনের নেপথ্যে অনেক কিছুই ঘটেছিল। কলকাতার বিবিসি নিউজ বাংলার সাংবাদিক অমিতাভ ভট্টাশালীর প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানা যায়। সে বিষয়ে এই সংক্ষিপ্ত লেখায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়।

আন্তর্জাতিক মান্যতার প্রশ্নে একটি দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সরকারি কাঠামো অপরিহার্য। এই ভাবনা প্রথমে আসে তত্কালীন গণপরিষদের সদস্য ছহীউদ্দিন বিশ্বাসের কাছ থেকে। তিনিই শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে এমন রূপরেখার কথা তুলে ধরেন। শ্রীমতি গান্ধী তা গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগের তত্কালীন শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শেই প্রবাসী সরকার গঠন করেন। যুদ্ধাবস্থার মধ্যে স্বদেশের মাটিতে নিরস্ত্র বাঙালির টিকে থাকা কঠিন ছিল। সেজন্যই মেহেরপুরের আম্রকাননে সরকার গঠিত হলেও সরকারের সদসর দপ্তর স্থাপিত হয় কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে। বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে ভারত সরকার কলকাতায় যে ভবনটি দিয়েছিল, সেটিই ৮ নম্বর থিয়েটার রোড। যেটি বর্তমানে শেক্সপিয়র সরণি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কলকাতার বিখ্যাত সেই ভবনে আমাদের প্রবাসী সরকারের কোনো স্মৃতিই এখন আর বহন করছে না। নেই কোনো নামফলকও। বাংলাদেশ আজ অনেক সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়েছে।

অতীতের অনেক স্মৃতিকেই আর ধরে রাখতে চায় না কেন? আজকের বাংলাদেশের এমন অবস্থা কেন হলো, ভেবে দেখা উচিত। কলকাতার ঐ বাড়ি ছিল ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের বীর সেনানি অরবিন্দ ঘোষের। শেক্সপিয়র সরণির ঐ ভবন অরবিন্দ ভবন হিসেবে চিহ্নিত। যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের ঐ ভবনে সংবাদ সংগ্রহের জন্য নিয়মিত যাতায়াত করতেন আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক সুখরঞ্জন দাশ গুপ্ত। থিয়েটার রোডের ৮ নম্বর বাড়িকে ঘিরেই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। এই সত্যকে চাপা দিয়ে আজকের বাংলাদেশ কোন ইতিহাস তৈরি করতে যাচ্ছে তা বোধ্যগম্য নয়।

প্রবাসী সরকারের সদর দপ্তরের ঐ বাড়িতে বসতেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী কর্নেল ওসমানী, অর্থমন্ত্রী মনসুর আলী। তাজউদ্দীন আহমদের পরিবারের অন্যান্য সদস্য থাকতেন ইন্টালি অঞ্চলে। সেখানে অন্যান্য মন্ত্রির সদস্যরাও থাকতেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামারুজ্জামান সাহেব বসতেন ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের কাছাকাছি অন্য একটি বাড়িতে। সেটি স্বরাষ্ট্র দপ্তর ছিল। উল্লেখ্য, ৯ মাসের যুদ্ধের সময়ে তাজউদ্দীন সাহেব এতটাই পরিশ্রম করেছেন যে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতেও পারতেন না।

এই ৯ মাস পরিবারের সদস্যরা যেখানে থাকতেন, সেখানে একবারও যাননি। এই সত্য ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। প্রবাসী সরকারের স্মৃতি সামনে রেখেই সরকারকে এগিয়ে যেতে হবে। ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের বাড়িটিকে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে সব সময় স্মরণ করতে হবে। সেখানে একটি নামফলক পুনঃস্থাপনের দাবি জানাই। এবং ঐ বাড়ির স্মৃতিবিজরিত আসবাবপত্রগুলো যেন সংরক্ষিত থাকে। অতীতকে ভুলে গিয়ে নতুন ইতিহাস লেখা যায় না। ইতিহাস বিকৃত করে কোনো জাতিই টিকে থাকতে পারে না। ধর্মীয়, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক কোনো বিপ্লব সংগঠিত হয় একক বা একাধিক মহান নেতার নেতৃত্বে। বাংলাদেশের বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেথ মুজিবের একক নেতৃত্বে। কিন্তু তার সহযোগীদের অবদানও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে। তা না হলে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে একদিন। ইতিহাস নিজস্ব গতিতেই ধাবমান হয়।    

লেখক :কলাম লেখক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন