মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

ভারতীয় পণ্য বর্জন স্বাধীনতা বিরোধীদের নয়া কৌশল

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ২০:৫১

ভারতীয় পণ্য বর্জনের নামে ফের গোটা দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি একজোট হতে চাইছে। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তারা ভারতের সার্বিক সহযোগিতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানকে সমর্থন জানিয়েছিল। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানও গোপনে পাকিস্তানিদেরই সাহায্য করতেন, বিভিন্ন গবেষণায় সেটা আজ প্রমাণিত সত্য। 

তার প্রতিষ্ঠিত দল আজ তাই অন্ধ ভারত বিরোধিতার নামে দেশের স্বার্থকেই বিসর্জন দিতে চাইছে। স্বাধীনতাবিরোধী বিদেশি শক্তির মদদে বিদেশের মাটিতে বসে গোটা পরিকল্পনা রূপায়ণ করে চলেছেন তারেক রহমান। তার নির্দেশেই বিএনপি মহানচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ভারতীয় পণ্য বর্জনে সামিল হয়েছেন। জনগণ থেকে প্রত্যাখাত হয়ে বিএনপি এখন গোটা দেশকে অস্থির করে তুলতে চাইছে। পাকিস্তান ও চীনা দূতবাস এই কাজে তাদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ।

পাকিস্তানি বর্বরতার বিরুদ্ধে আমাদের পাশে যে দেশটি সবার আগে দাঁড়িয়েছিল তার নাম ইন্ডিয়া বা ভারত। ভারতের কারণেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সাহায্য করে। যুক্তরাষ্ট্র বা চীন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে সাহায্য করেছিল পাকিস্তানকে। ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৩ লাখেরও বেশি মা-বোন। সেই ভয়ঙ্করতম সময়ে ভারতই আমাদের পাশে ছিল। পাকিস্তানি বর্বরতার বিরুদ্ধে লড়াই সম্ভব হয়েছিল ভারতের মদদেই। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং ভারতের আপামর জনগণ বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। অস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে, সৈন্য দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছিল। শুধু তাই নয়, এক কোটিরও বেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল ভারত। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণও তারাই দিয়েছে। পাকিস্তানি বর্বরতার কথা গোটা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরেছিল ভারত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বহু ভারতীয় শহীদ হয়েছিলেন। 

সেই সময়ও ভারতীয়দের এই সাহায্যের সমান বিরোধিতা সমর্থন আর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করতে গিয়ে বহু বাঙালির প্রাণ কেড়ে নেন। দেশীয় বিশ্বাসঘাতকরা চায়নি এই স্বাধীনতা। তারা সর্বতভাবে সাহায্য করেছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে। 

বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, জিয়াউর রহমান প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করলেও গোপনে পাকিস্তানি গুপ্তচরদের সমস্ত খবরাখবর সরবরাহ করতেন। স্বাধীনতা লাভের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ষরযন্ত্রেও জড়িয়ে রয়েছে তার নাম। জিয়া কখনও বাংলাদেশের ভালো চাননি। তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া  ও ছেলে তারেক রহমান সেই পরম্পরাই ধরে রেখেছেন। পাকিস্তানের হাতের পুতুল হয়ে দেশবিরোধী বিভিন্ন পরিকল্পনা করে চলেছেন তারা। তাই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জামায়াতের সঙ্গেও তাদের গড়ে ওঠে সখ্যতা। ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত, ভারত বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। শুধু মুক্তিযুদ্ধের সময়ই নয়, সবসময়ই ভারত আমাদের পাশে থেকেছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনাকে দিল্লিতে আশ্রয় দিয়েছিল ভারত।

সেইসময় ভারত সরকার তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করলে ঘাতকেরা তাদেরও হত্যা করতো। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বকেও শেষ করতে চেয়েছিল ঘাতকেরা। কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সরকার সেই সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করে। ভারত ও বাংলাদেশ আজ শুধু প্রতিবেশী দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রই নয়, একে অন্যের প্রকৃত বন্ধু। 

বাংলাদেশের যাবতীয় বিপর্যয়ে তাই সবার আগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ভারত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে শুরু করে সবকিছুতেই ভারতের সাহায্য আমরা পেয়ে থাকি। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যও নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে আজ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। উত্তর পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলির সঙ্গে ট্রেড ব্যালান্স রয়েছে আমাদের পক্ষে। 

বাংলাদেশের তুলনায় আয়তনে ভারত অনেক বড়। লোকসংখ্যাতেও কোনো তুলনা হয়না। ১৪০ কোটির দেশ ভারত। পাকিস্তান আমলের দুঃশাসন এবং স্বাধীনতার পরবর্তীতেও সামরিক শাসন এবং বিএনপির দুঃশাসন দেশকে অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন অনেক সামাজিক সূচকে ভারতকেও টেক্কা দিচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এখন পশ্চিমারাও প্রশংসা করছেন। তবু আমাদের ভারত থেকে অনেক কিছু আমদানি করতে হয়।

পাকিস্তান বা চীন থেকেও আমরা অনেক কিছু নিয়ে আসি। দেশীয় ক্রেতারা তাদের পছন্দের জিনিষ সস্তামূল্য পান। কিন্তু হঠাৎ করে ভারতীয় পণ্য বর্জনের এই  স্লোগান আসলে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির উত্থানেরই সূচক। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা গোটা দেশকেই অস্থির করে তুলতে চাইছে। আওয়ামী  লীগকে দুর্বল করাই তাদের উদ্দেশ্য। তাই বিদেশ থেকে সামাজিক গণমাধ্যম দিয়ে শুরু হয় এই প্রচার। আওয়ামী লীগের গায় ‘ভারতীয় দালাল’ এই তকমা লাগাতে চাইছে তারা। অথচ বাংলাদেশের জন্মই হয়েছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে। 

দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে কখনওই আপোষ করতে পারেন না বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। ভারতও কোনও কালে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে চায়নি। পাকিস্তান সেনা আত্মসমর্পণের পর ভারতীয় সেনারা বাংলাদেশ পরিত্যাগ করতে বিন্দুমাত্র সময় নেননি। গণতান্তিক দেশ ভারতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন পররাষ্ট্র নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসে না। 

কোভিড অতিমারির সময় নিজেদের দেশে টিকার ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্বেও বাংলাদেশকে সাহায্য করতে ভোলেনি দিল্লি। বর্তমানে নিজেদের দেশের বাজারে পেয়াঁজের চাহিদা তুঙ্গে। তাই বিদেশে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ভারত। কিন্তু বাংলাদেশে পেয়াঁজ রপ্তানিতে কোনও বাধা নেই। শুধু পেয়াঁজ বা কোভিড-টিকা নয়, বাংলাদেশের প্রয়োজনে সবধরনের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কুন্ঠিত নয় দিল্লি। ভারত থেকে স্বল্পমূল্যে বিদ্যুতও আমদানি করছি আমরা। আবার ভুটান থেকে ভারতের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুত আমদানিতেও আপত্তি নেই দিল্লির। বাংলাদেশে বাড়ছে ভারতীয় বিনিয়োগও।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের গায়ে লেগে রয়েছে ৩০ লাখ শহীদের রক্তের দাগ। গণহত্যার জন্য তারা আজও ক্ষমা চায়নি। বরং স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে সমানে মদদ জুগিয়ে চলেছে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে পাকিস্তান দূতাবাসের ততপরতা আমরা সবাই দেখেছি। তারা চাইছে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে। চীনও একাত্তরে পাকিস্তানের সঙ্গেই ছিল। সেই চীন এখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে বাংলাদেশেও তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। তাই ভারত বিরোধী প্রচারে পাকিস্তানপন্থীদের মদদ দিয়ে চলেছে। বিএনপি দলটাই তো দ্বিচারিতায় ভরা। মির্জা ফখরুলরা প্রকাশ্যে ভারতের বিরোধিতা করে মানুষকে উত্তপ্ত করতে চাইছে। আবার গোপনে গিয়ে বৈঠক করছেন ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার পর দিল্লির হাতে পায়ে ধরে ফের ভেসে থাকতে চাইছে তারেক রহমানের লোকজন। ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিয়ে বিএনপি আসলে নিজেদের আরও রাজনৈতিক দেউলিয়া হিসেবে তুলে ধরছে। চাইছে ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের নজর টানতে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তাদের চায় না। পাকিস্তানপন্থী বিশ্বাসঘাতকেরা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি হিসাবেই চিহ্ণিত। ভারত আমাদের প্রকৃত বন্ধু, এটা প্রমাণিত।

ইত্তেফাক/এসআর