সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

বর্তমানে নষ্ট হচ্ছে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ

সংরক্ষণজনিত ক্ষতি কমালে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়েই মিটবে চাহিদা

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৩০

দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই দৃষ্টিনন্দন এই ঘরটিতেই দীর্ঘমেয়াদে পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে বাঁশ, কাঠ, টিন, কনক্রিটের তৈরি পিলার ও অ্যাবুনাইট শিট দিয়ে তৈরি এই ঘরের এক পাশের বেড়ার সঙ্গে ছয়টি ফ্যান লাগানো হয়েছে। এতে বাইরে থেকে ঘরের ভেতরে স্বাভাবিক তাপমাত্রার বাতাস ঢুকছে। ভেতর থেকে গরম বাতাস বের হয়ে যাচ্ছে। উচ্ছ্বসিত কৃষক প্রশনজিত মণ্ডল জানালেন, এতে পেঁয়াজের ওজনটা ঠিক থাকবে। পেঁয়াজ ঠোস খাবে না, পচনও ধরবে না।

সম্প্রতি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বহলবাড়িয়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় ষাটোর্ধ কৃষক প্রশনজিতের সঙ্গে। বৈশাখের এই তপ্ত দুপুরে যখন ঘরের ভেতরে থাকাই দায়, তখন ঠা ঠা রোদের মধ্যে পেঁয়াজ সংরক্ষণের এই ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশনজিত জানান, দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি বছর ১০/১২ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেন তিনি। উত্পাদন হয় ৭০০ থেকে ৮০০ মণ পেঁয়াজ। এই পেঁয়াজ বসতবাড়ির চাতালে ছড়িয়ে রাখতেন। ঘরে আলো বাতাসের তেমন ব্যবস্থা ছিল না। এতে স্বাভাবিক নিয়মেই পেঁয়াজের ওজন কমে যায় মণে প্রায় ১৫ কেজি। আর পচন ধরলে তো কথাই নেই। সবমিলিয়ে সংরক্ষণজনিত সমস্যার কারণে উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক পেঁয়াজই নষ্ট হয়ে যায়। এতে লাভতো দূরের কথা, তাকে লোকসান গুনতে হয়। কিন্তু এবার তিনি সরকারের দেওয়া ‘মডেল ঘরে’ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন। এই ঘরে একসঙ্গে প্রায় ৪৫০ মণ পেঁয়াজ রাখা যাবে। আশা করছেন, সংরক্ষণজনিত ক্ষতি কম হওয়ায় এবার পেঁয়াজ বিক্রি করে তিনি বেশ লাভবান হবেন। উল্লেখ্য, দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টন। আর উৎপাদন হয় ৩২ থেকে ৩৪ লাখ টন। চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন হওয়ার পরও প্রতি বছর ৬ থেকে ৮ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রতি বছর সংরক্ষণে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট (ঘাটতিসহ) হয়ে যায়। কখনো কখনো এরচেয়ে বেশিও নষ্ট হয়। এ হিসেবে প্রায় ৭ থেকে ১০ লাখ টন পেঁয়াজ নষ্ট হয়। ফলে পেঁয়াজের প্রকৃত উৎপাদন দাঁড়ায় ২০ থেকে ২২ লাখ টন। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও প্রতি বছরই ঘাটতিতে পড়তে হয়। যদি পেঁয়াজ সংরক্ষণে ক্ষতি কমানো যায়, তাহলে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্বব। শুধু তাই নয়, এতে একদিকে যেমন পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে না, অন্যদিকে কৃষকও তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে। ফলে পেঁয়াজ সংরক্ষণে সরকার সারা দেশে এই ‘মডেল ঘর’ নির্মাণ করছে। এই মডেল ঘরে পেঁয়াজ সংরক্ষণে ক্ষতির হার ৭ থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ‘কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং বিপণন কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্পের আওয়ায় এই ‘মডেল ঘর’ নির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য কৃষকদের উৎপাদিত পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়নের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকার ১০-১৫ শতাংশ কৃষকের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা। ইতিমধ্যে কুষ্টিয়া ছাড়াও পাবনা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, রাজশাহী, ঝিনাইদহ ও মাগুরায় ২২০টি মডেল ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য জেলা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রতিটি ঘরে ৩০০ থেকে ৪৫০ মণ পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ করা যাবে।

এ প্রসঙ্গে ‘কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং বিপণন কার্যক্রম উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক হেলাল উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, প্রতি বছর দেশে চাহিদার চেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হওয়ার পরও আমদানি করতে হয়। কারণ, যথাযথভাবে সংরক্ষণের অভাবে পেঁয়াজ উৎপাদনের একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এই ‘মডেল ঘরে’ পেঁয়াজ রাখলে নষ্ট হওয়ার হার ১০ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে আসবে।

ইত্তেফাক/এমএএম