শাস্তির কারণে ঘর ছাড়ে অনেক শিশু

আজ আন্তর্জাতিক শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বিলোপ দিবস

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৪, ০৩:০০

মো. সুজনের বয়স ৭ বছর। ৬ বছর বয়সে মায়ের মার খেয়ে সে বাড়ি ছাড়ে। ময়মনসিংহের কোথায় তার বাড়ি, ঠিকঠাক বলতে পারে না। তবে ট্রেনে চেপে ঢাকার কমলাপুরে নামে তা জানায়। সেখানে কয়েক দিন ভিক্ষা করার পর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত কাওরান বাজার পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে জায়গা হয়। সুজনকে প্রশ্ন করলে সে বলে, মা শুধু মারে। ভালোবাসে না। মার খেলে তার ভালো লাগে না।

সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দুটি পথশিশু পুনর্বাস কেন্দ্রের তথ্যমতে, ১৪৯ জন পথশিশুর মধ্যে ৯০ শতাংশই মা-বাবা ও শিক্ষকের শারীরিক শাস্তিতে বাড়ি ছেড়ে এসেছে। কেউ কেউ রাগ কমলে বাবা-মায়ের কাছে যেতে চাইলে তারা সঠিক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পৌঁছে দেন। তবে বেশির ভাগ শিশু পথে বাস করে নানা রকম অপরাধ ও নেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে দীর্ঘদিন পথে থাকার পর তারা পথে থাকতেই অভ্যস্ত। আর বাড়িতেও ফিরে যেতে চায় না। এ অবস্থায় আজ ৩০ এপ্রিল অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিশুদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বিলোপ দিবস।

১১ বছরের মো. আফিকুল ইসলামের বাড়ি রংপুরে। সে মাদ্রাসায় পড়ত। মাদ্রাসর শিক্ষক খেলার জন্য তাকে এমন মার দেয় যে, সে সেদিনই বাড়ি না গিয়ে পালিয়ে যায়। ৯ বছরের মো. শরিফের বাড়ি নরসিংদী। বাবা তাকে প্রায়ই বেদম পেটাতেন। বাবার মার সহ্য করতে না পেরে সে বাড়ি ছাড়ে। কাওরান বাজার ও কমলাপুর পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক  আফরোজা আক্তার ও কামরুন নাহার রত্না ইত্তেফাককে বলেন, তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৭৫ জন করে শিশু থাকছে, যার ৯০ শতাংশই বাবা-মা ও শিক্ষকের মার খেয়ে বাড়ি ছাড়ে। ২০১৬ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় পথশিশুদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে জরিপ করে। জরিপের তথ্যমতে, বাবা-মায়ের দারিদ্র্য, বহুবিবাহ, কলহ, পিতামাতার মাদকাসক্তি প্রভৃতি কারণে পারিবারিক শাস্তির শিকার হয়ে পথে আসে শিশুরা। এই শিশুদের পুনর্বাসন প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ড. আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্যাগুলো এখানো শেষ হয়নি, তাই এখনো পথশিশুরাও আছে। তারা নানা রকম শ্রম, অপরাধ কিংবা মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত হচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক ও মানসিক শাস্তি পেয়ে বেড়ে ওঠা শিশুরা নিজেরাও অপরাধী হয় কিংবা অপরাধের শিকার হওয়াকে স্বাভাবিক মনে করে। তাই সব ক্ষেত্রে শিশুর শারীরিক ও মানসিক শাস্তি বন্ধে আইন প্রণয়ন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ওপর গুরুত্বারোপ ও আইন প্রণয়নের কথা বলেন তারা।

কিছু পরিসংখ্যান: মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসেই ১৮৬ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ১২ জন শিশু শিক্ষক কর্তৃক নির্যাতনের শিকার এবং ১৬ জন শিশু শিক্ষক কর্তৃক যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ২০২৩ সালে মোট ১ হাজার ১৩ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরকম অসংখ্য ঘটনা প্রকাশ হয় না।

দূর করতে হবে শাস্তি: ২০১০ সালে শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের ক্রমবর্ধমান শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের ক্রমাগত ব্যর্থতাকে চ্যালেঞ্জ করে মানবাধিকার সংস্থার দায়েরকৃত একটি রিট পিটিশনের  পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব ধরনের শারীরিক শাস্তি অসাংবিধানিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘোষণা করে রায় দেয়। এ রায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১১ ধরনের শারীরিক ও দুই ধরনের  মানসিক শাস্তি নিষিদ্ধ করতে ২০১১ সালে একটি পরিপত্র জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে, ১২ বছর পরও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না।

শাস্তি শিশুদের অপরাধী করে: মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, শুধু শারীরিক নয়, সঙ্গে মানসিক নির্যাতন শিশুকে গালি দেওয়া, অপমান করা—এসব কারণে শিশুরা বিচ্যুতিমূলক আচরণ করে। ক্রমেই তারা বড় ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সমাজে কিশোর গ্যাংয়ের আবির্ভাব হয়। শিশুদের পুনর্বাসন কাজ রাষ্ট্রকে আরও বড় পরিসরে করার ওপর জোর দেন তিনি।

ইত্তেফাক/এমএএম