খাড়িয়া ভাষায় কথা বলেন দুই নারী

খাড়িয়া ভাষা সংরক্ষণে সরকারকে উদ্যোগী হতে আহ্বান প্রধান বিচারপতির

আপডেট : ০৩ মে ২০২৪, ১৭:২৮

চা শ্রমিক ভেরোনিকা কেরকেট্টা ও ক্রিস্টিনা কেরকেট্টা। দুই সহদোরা। মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট চা বাগানের অদূরে খ্রিস্টান পাড়ায় তাদের বসবাস। তবে তাদের পূর্বপুরুষদের বসবাস বাংলাদেশে ১৮৩৫ সাল থেকে। এদের মাতৃভাষা ছিল খাড়িয়া। সময়ের বিবর্তনে আজ বিলুপ্ত হতে বসেছে এই ভাষাটি। 

ভেরোনিকা ও ক্রিস্টিনা ছাড়া এদেশে বসবাসকারী তাদের জনগোষ্ঠীর কেউ খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন না। দুই সহোদরা চিন্তিত তাদের জীবনাবসানের পর প্রাচীন এই ভাষাটি কী এদেশ থেকে হারিয়ে যাবে। 

এমন ভাবনা-চিন্তার মধ্যেই দুই সহোদরা আজ শুক্রবার সাক্ষাৎ পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের। এতে তারা অনেকটাই আবেগ আপ্লুত। মন খুলে কথা বলেছেন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে। একইসঙ্গে খাড়িয়া ভাষা রক্ষায় বিচার বিভাগের অভিভাবকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

দুই সহোদরা প্রধান বিচারপতিকে বলেন, স্যার আমরা দুই বোন মারা গেলে এই ভাষায় কথা বলার বা চর্চা করার কেউ থাকবে না। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে যাবে ভাষাটি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কেউ এ ভাষায় কথাও বলতে পারে না। এখানেই আমাদের যত দুশ্চিন্তা! 

এ সময় সেখানে উপস্থিত মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক উর্মি বিনতে সালামকে ভারতের সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে খাড়িয়া ভাষার বর্ণমালাসহ অন্যান্য পুস্তকাদি সংগ্রহের নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি। যাতে সরকারিভাবে এই ভাষাটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এর চর্চা কীভাবে বাড়ানো যায় সে ব্যাপারে উদ্যোগী হতে বলেন তিনি।

মঙ্গলবার মৌলভীবাজার সফরে যান প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। জেলা জজ আদালত ও ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পরিদর্শন করেন তিনি। কয়েকটি সেমিনারেও প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন। এই সফরকালে খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে পারা ওই দুই সহোদরার সঙ্গে নিজ থেকে দেখা করার ইচ্ছাপোষণ করেন প্রধান বিচারপতি। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক আজ সকাল সাড়ে ১০ টায় চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের রেস্ট হাউজে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ভেরোনিকা ও ক্রিস্টিনাকে দেখা করার ব্যবস্থা করেন। এ সময় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ছিলেন রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এএম আমিন উদ্দিন। 

পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। কিন্তু অনেকের মাতৃভাষা ভিন্ন। ইতিমধ্যে সরকারের তরফ থেকে খাড়িয়া ভাষা রক্ষায় কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তাতে আরও জোরারোপ করা প্রয়োজন। 

তিনি বলেন, ভারতের যে সকল অঞ্চলে এ ভাষার প্রচলন আছে, সেখানে যোগাযোগ স্থাপন করা দরকার। এছাড়া খাড়িয়া বর্ণমালা প্রচলনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এ ভাষার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান প্রধান  বিচারপতি।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি বাংলা এক প্রতিবেদনে বলেছে, খাড়িয়া ভাষায় কথা বলা ক্রিস্টিনা ও ভেরোনিকার পূর্বপুরুষরা প্রায় দুইশত বছর পূর্বে ভারতের রাঁচি থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। ভারতের ঝাড়খণ্ড এবং উড়িষ্যা প্রদেশে খাড়িয়া ভাষার প্রচলন আছে। খাড়িয়া ভাষাটি পারসি ভাষা হিসেবেও পরিচিত। বাংলাদেশে বসবাসকারী এই দুই বোনই কেবল অনর্গল খাড়িয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন। পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে প্রয়োজন অনুসারে বাংলা, সাদরি এবং বাগানি ভাষায় কথা বলেন। পরিবার পরিজন, পরবর্তী প্রজন্ম, পাড়া, গ্রামে কোথাও খাড়িয়া ভাষায় কথা বলার মতো মানুষ নেই। মাতৃভাষার চর্চা, বইপত্র এবং সংরক্ষণের অভাবে বাংলাদেশ থেকেই ভাষাটির হারিয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে বলে জানান স্থানীয় অধিবাসীরা।

এদিকে গত মঙ্গলবার সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় কুশিয়ারা আন্তর্জাতিক কনভেনশন হলে আয়োজিত এক নাগরিক সংবর্ধনায় দেওয়া বক্তৃতায়ও খাড়িয়া ভাষা ও নাগরী লিপি সংরক্ষণের আহবান জানান প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

ইত্তেফাক/এএএম