তাহাদের দুঃসাহস এখন লাগামহীন হইয়া গিয়াছে

আপডেট : ০৪ মে ২০২৪, ০৮:১৫

নির্বাচনে কারচুপি হইয়াছে কিংবা হয় নাই—ইহার দায়দায়িত্ব কেন সরকার প্রধানের উপর পড়িবে? সরকারপ্রধান কি বলিয়াছেন যে, অমুকখানে পুলিশ দিয়া কারচুপি করো? নিশ্চয়ই বলেন নাই। যদিও কোনো অনিয়ম হইলে তাত্ত্বিক বা নীতিগতভাবে তাহার দায়দায়িত্ব নিশ্চয়ই সরকারপ্রধানের। কিন্তু সরকারপ্রধান যদি মহিরুহ হইয়া থাকেন, তবে তাহার অসংখ্য শাখা-প্রশাখা, শতসহস্র পত্রপল্লবের সমাহার রহিয়াছে। এই বিশাল বহরের কাজ হইল সরকারপ্রধানকে সঠিক তথ্য দেওয়া। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই তাহা ঘটে না। আর এই ব্যত্যয় ঘটে বলিয়াই সরকারপ্রধানের অজ্ঞাতে যত অনিয়মের ঘটনা ঘটে। যাহারা দুষ্কর্ম করিতেছে, তাহাদের দুঃসাহস এখন লাগামহীন হইয়া গিয়াছে। আমরা এখন দেখিতে পাইতেছি, কোথাও কোথাও পুলিশ বাড়িতে গিয়া হয়রানি পর্যন্ত করিতেছে। বয়োজ্যেষ্ঠ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে পুলিশ হেনস্তা করিতেছে রাজাকারের বংশধরদের নির্দেশে! যেমন, একটি উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাকে প্রার্থী না হইতে থানায় তলব করিয়াছেন ওসি! ওসি প্রচ্ছন্ন হুমকির মতো বলিয়াছেন যে, ‘সামনে (উপজেলা) ইলেকশন, সেইহেতু আপনি বয়স্ক মানুষ, নিরিবিলি থাকাই ভালো।’ এইখানেই শেষ নহে, ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী হইবার ইচ্ছা পোষণ করায় এক উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাকেও মারধর করা হইয়াছে। আরেক জন মহিলা প্রার্থী হইবার জন্য জামানতের টাকা জমা দিতে গেলে তাহাকে মারধর করিয়া ছিনাইয়া নেওয়া হইয়াছে কাগজপত্র। প্রশ্ন হইল—কাহারা এই ধরনের দুষ্কর্ম করিতেছে? কী তাহাদের পরিচয়? একটু কি কেস স্টাডি করিয়া দেখা যায় না—কোথায় তাহাদের শেকড়? কোন মতাদর্শ লইয়া তাহারা অতীতে পরিচালিত হইয়াছে এবং তাহাদের বাপ-দাদারা কী ছিলেন? তাহাদের ব্যাপারেই তো প্রথিতযশা সাংবাদিক কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী মৃত্যুর পূর্বে এক সাক্ষাত্কারে বলিয়াছেন, ‘আওয়ামী লীগে কত রাজাকার আছে। বিপদের সময় ইহারা ভয়ানকভাবে আসে। তাহারা এখন বঙ্গবন্ধুর নাম বেশি বলে।’

এই যখন অবস্থা, তখন কী করা উচিত? উপজেলা-পর্যায়ে মাঠে গিয়া দেখা হউক, সাধারণ মানুষ ও অত্যাচারিত কর্মীদের নিকট শুনা হউক—আসলে কী ঘটিতেছে। একটি নির্বাচনে কারসাজির মাধ্যমে জয় পাইতে একজন প্রার্থী বিভিন্ন জায়গায় তাহার অঢেল টাকা ঢালিয়াছিল বলিয়া কোনো কোনো এলাকার বাতাসে কান পাতিলেই শুনা যায়। বিনিময়ে সেই প্রার্থী ঐ এলাকায় কী দিয়াছে? দিয়াছে মাদকের নহর। সেই নহরে ডুবিয়া যাইতে পারে একটি এলাকার তরুণ প্রজন্ম। আইনশৃঙ্খলার সহযোগিতা ছাড়া একটি জনপদ যেমন শান্তিতে থাকিতে পারে না, তেমনিভাবে আইনশৃঙ্খলার কোনো কোনো কর্মকর্তা যদি রাজাকারের বংশধরদের নিকট হইতে এত বিপুল অর্থ গ্রহণ করেন, যাহা তাহাদের সারা জীবনের বেতনের চাইতেও অধিক, তাহা হইলে তাহাদের রিটায়ারমেন্টের পরে আমরা হয়তো নজিরবিহীন কাহিনি শুনিতে পাইব, এখন যেমন কাহারো কাহারো ক্ষেত্রে শুনা যায়। দুঃখের বিষয় হইল—ইহারাই সরকারপ্রধানের লোক হিসাবেই যাহা করিবার করিতেছে। পৃষ্ঠপোষকতা ও মদত—তাহা যেই উপায়েই আসুক, এই শক্তির উত্স সরকারপ্রধান।

ক্ষমতাসীনদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করিয়া এই রাজাকাররা যেইভাবে ক্ষমতার প্রভাবে-প্রতাপে চারিদিক অন্ধকার করিয়া দিতেছে, তাহাতে জনাব গাফ্ফার চৌধুরীর সুরে সুর মিলাইয়া প্রশ্ন তোলা যাইতে পারে—কোথাও কোথাও মুক্তিযুদ্ধের সরকারের ঘাড়ে সিন্দবাদের ভূতের মতো রাজাকাররা যেইভাবে চাপিয়া বসিয়াছে, তাহার শেষ কোথায়? যাহারা রাজাকারদের বংশধর, তাহারা টাকা ইনকাম করিতে ক্ষমতাসীন দলের অংশীদার হইয়াছে, তাহারা আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করিয়া নিজেদের অর্থসম্পদ তৈরি করিতেছে। কিন্তু যাহা করিতেছে, তাহাতে শেষ বেলায় বদনাম হইতেছে সরকারপ্রধানেরই। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, সরকারপ্রধান কখনই এমন বদনাম চাহিবেন না। তাহা হইলে প্রশ্ন করা যাইতে পারে—সরকারপ্রধান কেন অ্যাকশনে যান না? তাহার দলেরই প্রভাবশালীরা অর্থের বিনিময়ে কিংবা যে কোনো হিসাবনিকাশেই হউক—রাজাকারদের পক্ষে কাজ করিতেছেন! তাহা হইলে হিসাবটা দাঁড়াইতেছে—সরকারপ্রধানের সদিচ্ছার অভাব নাই, কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে তিনি যেন অসহায়! ইহাই ট্র্যাজেডি। ইহা সরকারপ্রধানের জন্য ট্র্যাজেডি, রাজনীতির জন্যও ট্র্যাজেডি।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন