সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মৃত মাকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া শিশু দেড়মাস পর ফিরে পেল বাবাকে

আপডেট : ০৯ মে ২০২৪, ২২:৩০

মৃত মাকে খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া সাত বছরের শিশু মো. ইয়ামিন দেড়মাস পর ফিরে পেল তার বাবাকে। দীর্ঘ দিন পর বাবা সাইফুল ইসলাম মাতৃহীন একমাত্র ছেলেকে কাছে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। মাতৃহীন সন্তান আর পিতার একে-অপরকে কাছে পাওয়ায় দৃশ্যে উপস্থিত সকলের কাছে সৃষ্টি হয় আবেগঘন এক পরিবেশের।

জানা যায়, গত ১৯ মার্চ সকালে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে কৌতুহলের বশে ট্রেনে উঠে পড়ে মো. ইয়ামিন। সন্ধ্যায় শিশুটি খুলনা রেলওয়ে স্টেশনে এসে পৌছায়। এরপর সে খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে ঘুরতে রাত ৯টায় নগরীর গল্লমারী এলাকায় এসে কান্নাকাটি করতে থাকে। রাস্তার ধারে শিশুটির কান্নাকাটি দেখে পথচারীরা ঘটনাটি নগরীর হরিণটানা থানা পুলিশকে জানায়। খবর পেয়ে হরিণটানা থানার এসআই (নি:) মো. মাসুম বিল্লাহসহ পুলিশ সদস্যরা এসে শিশুটির কাছে তার নাম-ঠিকানা জানতে চায়। এ সময় সে তার নাম ইয়ামিন ও বাসা ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশে বলে উল্লেখ করে। পরে পুলিশ সদস্যরা শিশু ইয়ামিনকে হরিণটানা থানায় নিয়ে আসে। এরপর হরিণটানা থানা পুলিশ কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশের থানায় যোগাযোগ করেও শিশুটির কোনো অভিভাবকের সন্ধান পায়নি। পরে তাকে বটিয়াঘাটা উপজেলা সমাজসেবা অফিসারের কাছে দেওয়া হয়। এরপর শিশুটিকে শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের বালক হোস্টেলে রাখা হয়। পাশাপাশি হরিণটানা থানা পুলিশ ও বটিয়াঘাটা উপজেলা সমাজসেবা অফিসার শিশুটির অভিভাবকের সন্ধানে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতে থাকে। এ ছাড়া কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের আশপাশসহ ডিএমপি’র বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। 

পরবর্তীতে শিশুটি জানায়, তাকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে নিয়ে গেলে সে তার বাড়ি চিনিয়ে দিতে পারবে। সেই অনুযায়ী কেএমপির পুলিশ কমিশনার মো. মোজাম্মেল হকের নির্দেশে হরিণটানা থানা পুলিশ, বটিয়াঘাটা উপজেলা সমাজসেবা অফিসার ও শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পাঁচ সদস্যের একটি টিম গত বুধবার সকাল ৬টায় শিশু মো. ইয়ামিনকে নিয়ে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশে রওনা করে। 

এসআই মাসুম বিল্লাহর নেতৃত্বে উক্ত টিমের সদস্যরা বেলা ১১টায় কমলাপুর রেলস্টেশনে পৌঁছে ইয়ামিনকে নিয়ে তার পরিবারের সদস্যদের খোঁজ করতে থাকে। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজি করে তার পরিবারের কারো সন্ধান না পেয়ে তারা বেশ হতাশ হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে দুপুর ১টার দিকে ইয়ামিন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা নারায়ণগঞ্জ রুটের একটি ট্রেন দেখিয়ে বলে- এই ট্রেন যেখান থেকে এসেছে- তাকে সেখানে নিয়ে গেলে সে তার বাড়ি চিনিয়ে দিতে পারবে। তখন উক্ত টিমের সদস্যরা ইয়ামিনকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ রুটের উক্ত ট্রেনে করে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেয়। পথিমধ্যে উক্ত ট্রেনের একজন যাত্রী ইয়ামিনকে দেখে তাকে চিনতে পারে। 

ঐ সময় ঘটনাটি জানতে পেরে জানায়, ইয়ামিন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার লালপুর গ্রামের মো. সাইফুল ইসলামের ছেলে। এরপর উক্ত টিমের সদস্যরা তাকে নিয়ে লালপুর গ্রামের উদ্দেশে রওনা করে। এভাবে টিমের সদস্যরা দীর্ঘ দেড়মাস পর শিশু ইয়ামিনকে নিয়ে তার বাড়িতে হাজির হয়। হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া মাতৃহীন ছেলে ইয়ামিনকে পেয়ে তার পিতা সাইফুল ইসলাম বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। 

হরিণটানা থানার এসআই মো. মাসুম বিল্লাহ জানান, ভূমিষ্ট হওয়ার পর শিশু ইয়ামিনের মা মারা যায়। তার বাবা  সাইফুল ইসলাম আর বিয়ে করেননি। মাবিহীন সে তার বাবাসহ চাচা ফুফুদের সঙ্গে থেকে বড় হয়ে উঠছিল। তার বাবা গরীব পরিবহন শ্রমিক হওয়ায় তার তেমন খোঁজ খবর রাখতে পারে না। শিশুটি তার মায়ের খোঁজে প্রায়ই বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়। কারণ তার শিশুসুলভ মন আজও বিশ্বাস করতে  পারেনি- তার মা এই পৃথবীতে নেই। জানি না কবে শেষ হবে তার মাকে খোঁজার এই প্রয়াস। 

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক বলেন, হারিয়ে যাওয়া শিশুটিকে তার পরিবারের কাছে দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। পুলিশের দায়িত্বই হচ্ছে মানুষের সেবা করা। আমরা সেই দায়িত্বই পালন করছি।

ইত্তেফাক/পিও