সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

উপজেলা নির্বাচনেও ভোটে আগ্রহ কমার ইঙ্গিত

আপডেট : ১০ মে ২০২৪, ০০:৩৩

প্রথম ধাপে ১৩৯টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের হার আগের তিনটি নির্বাচনের চেয়ে কম- ৩৬.১ শতাংশ। এর মধ্যেও জাল ভোট পড়েছে, হয়েছে সংঘাত সংঘর্ষ। বুধবারের নির্বাচনে বিএনপির কিছু ‘বিদ্রোহী প্রার্থী' থাকলেও তারা তেমন সুবিধা করতে পারেননি। ভোট হয়েছে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ।

বৃহস্পতিবার ভোটের হার আনুষ্ঠানিকভাবে জানান নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। তিনি জানান, ১৪৯ টি উপজেলায় গড়ে ভোট পড়েছে ৩৬.১ শতাংশ। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে সোনাতলা, মীরসরাই ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলায়। সেখানে ভোট পড়েছে ১৭ শতাংশ। সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলায়। সেখানে ভোট পড়েছে ৭৩.১ শতাংশ। অনিয়ম ও গোলযোগের কারণে দুটি কেন্দ্রে ভোট বন্ধ করা হয়। অনিয়মের চেষ্টার অভিযোগে আটক করা হয় ৩৭ জনকে। ভোটের সময় খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলা হাট, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, মাদারীপুর, সিরাজগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ বেশ কিছু এলাকায় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠে।

তিনি জানান, ইভিএমে ভোটের হার ৩১.৩১ শতাংশ, ব্যালটে ৩৭.২২ শতাংশ। এই ধাপে ২২টি উপজেলায় ইভিএম ও বাকিগুলোয় ব্যালট পেপারে ভোট নেওয়া হয়।

ভোট কম পড়ার কারণ এবং ভোটের প্রতি ভোটারদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগ্রহ কমে যাচ্ছে কিনা সেটা তো গবেষণার বিষয়। সেটা আমরা বলতে পারবো না। আমরা বলতে পারবো ভোট কম পড়েছে। এর কারণ হলো ধান কাটার মৌসুম, তার ওপরে বৃষ্টি। এছাড়া বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ভোটাররা পছন্দের প্রার্থী না পেলেও ভোট দিতে না আসতে পারেন। ভোটের হার কমার আরো অনেক কারণ থাকতে পারে।

জাল ভোট ও সংঘর্ষের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘যা হয়েছে তা বড় কিছু নয়। নির্বাচন সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ হয়েছে। আমাদের দায়িত্ব নির্বাচন আয়োজন করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠান করা। আমরা তা করেছি। কেউ নির্বাচনে না এলে তাদের নির্বাচনে আনার দায়িত্ব আমাদের নয়।’

এর আগে বুধবার ভোট শেষ হওয়ার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল নির্বাচন ভবনে সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘নির্বাচনে ভোটের হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হতে পারে। সকালে বৃষ্টি হয়। আবার ধান কাটার মৌসুম বিধায় ভোট পড়ার হার কম হতে পারে। ভোটাররা ধান কাটতে থাকায় ভোটকেন্দ্রে আসেননি, এটা জানতে পেরেছি। এছাড়া কিছু কিছু জায়গায় ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। ভোটার বেশি এলে আরো বেশি ভালো হতো।আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে।’

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ২০০৯ সালে উপজেলা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬৮.৩২ ভাগ,  ২০১৪ সালে ৬১ ভাগ, ২০১৯ সালে ৪০.২২ শতাংশ। প্রতিবারই জাতীয় নির্বাচনের (সংসদ নির্বাচন) পর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হয়। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ওই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ওই নির্বাচনের পর ২০০৯ সালে যে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয় তাতেও সব দল অংশ নেয়। আর নির্বাচন পরিচালনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সময় গঠিত নির্বাচন কমিশন। ভোটের হার ছিল সর্বোচ্চ ৬৮.৩২  শতাংশ। এরপর ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও ওই বছর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা অংশ নেয়। ভোটের হারও ভালো ছিল ৬১ শতাংশ। ২০১৯ সালে বিএনপির উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জন করে। ওই বছর ভোটের হার  কমে ৪০.২২ ভাগ হয়। এবারও বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে এবং ভেটের হার আরো কমে  ৩৬.১ শতাংশ হয়েছে।

নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যা বলছে

বিএনপির যুগ্ম মহাচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘এই নির্বাচন দেশের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। এই সরকার আর নির্বাচন কমিশনের প্রতি দেশের মানুষের কোনো আস্থা নাই। ভোটার যে ভোট কেন্দ্রে যায়নি, তা প্রধান নির্বাচন কমিশনারও প্রকারান্তরে স্বীকার করেছেন। উনি সত্য কথা বললে তো ওনার চাকরি থাকবে না। তাই তিনি বলেছেন এই সময় ধান কাটা হয়। তাই ধান কাটার কারণে ভোটার সমাগম কম হয়েছে।’

রিজভী বলেন, ‘৭ জানুয়ারির নির্বাচন যে কারণে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে সেই একই কারণে উপজেলা নির্বাচনও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। আমরা নির্বাচন বর্জন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেশে গণতন্ত্র তো নাই। তারপরও যেটুকু আছে তা-ও এই ধরনের নির্বাচন করে রক্তশূন্য করে ফেলা হচ্ছে। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে আমাদের দাবি মেনে সর্বপ্রথম নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন করতে হবে।’

তবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বেশি হয় ভোটারের উপস্থিতি তত বাড়ে। প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের নিয়ে আসেন ভোট কেন্দ্রে। এবার যেহেতু প্রতিদ্বন্দ্বিতা কম, একই ঘরানার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাই ভোটার উপস্থিতি কম হয়েছে। আবহাওয়াও একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে। গতকাল (বুধবার) প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে।  আর এটা ধান কাটার মৌসুম। কৃষকরা মাঠে ধান কাটায় ব্যস্ত ছিলেন। এর মধ্যে আবার বৃষ্টি হওয়ায় ধান দ্রুত কেটে আনা তাদের জন্য জরুরি ছিল। কারণ, বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হয়ে যায়।’

তার কথা, "নির্বাচনটা অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া দরকার ছিল, সেটা হয়েছে।  কেউ কোনো বাধার মুখে পড়েননি। আর দুই-এক জায়গায় জাল ভোট বা সংঘর্ষ সংঘাতের যে কথা বলা হচ্ছে, তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই জাল ভোট অতীতেও হয়েছে।’

বিশ্লেষকদের বক্তব্য

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, ‘নির্বাচন কমিশনের প্রতি, নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি, নির্বাচনের প্রতি ভোটাররা আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। কারণ, তারা সংশয়ে আছেন যে, ভোট দিতে যেতে পারবেন কিনা, যেতে পারলেও ভোট দিতে পারবেন কিনা, আবার ভোট দিতে পারলেও তা সঠিকভাবে গণনা করা হবে কিনা। এই আস্থাহীনতার কারণেই তো বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে। তাদের নির্বাচন বর্জন হলো উপসর্গ। আসল কারণ তো আস্থাহীনতা।’

‘আর ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে গিয়েও তো লাভ নাই। কারণ, সবাই তো পছন্দের প্রার্থী পাচ্ছেন না। সবাই তো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এই নির্বাচন আসলে একটা পোশাকি নির্বাচনে পরিণত হয়েছে। এতে জনগণের কোনো লাভ নাই। কিন্তু যারা নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে তাদের লাভ আছে। এটা তো রাজনৈতিক দলগুলোর একটা ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। আর যারা নির্বাচিত হয়েছে, তারা নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করবে,’ বলেন তিনি।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তারপরও জাল ভোট ও সংঘাত সংঘর্ষ হচ্ছে এর কারণ হলো নিজেদের মধ্যে হলেও তো একজন উপজেলা চেয়ারম্যান হবেন এক উপজেলায়। সবাই তো হতে পারবেন না। আর হতে পারলে তো অনেক ক্ষমতা আর সুবিধা। তাই প্রত্যেকেই যে-কোনো উপায়ে জিততে চান।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আসলে এই নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। এক পক্ষের মধ্যে নির্বাচন। ফলে ভোটারা আগ্রহ পায়নি। তারা জানে যে, ভোট দিলেও যা হবে, না দিলেও তা হবে। নির্বাচন তে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে। বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করেছে। ভোটাররাও বলতে গেলে বর্জন করেছে।’

তার কথা, ‘তারপরও নির্বাচনে জাল ভোট হয়েছে, মারামারি হয়েছে। প্রিজাইডিং অফিসারকে কোনো কোনো প্রার্থী তার পক্ষে কাজ করার জন্য চাপ দিয়েছে। এর কারণ নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা। পেশি শক্তি, টাকা ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়া। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে ভোটের প্রতি আগ্রহ কমতেই থাকবে।’

এদিকে উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপে একটির ফলাফল এখনো জানা যায়নি। বাকি ১৩৮টির মধ্যে ১১০টিতে চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। স্বতন্ত্র (কোনো দলের নয়) হিসেবে দাঁড়ানো প্রার্থীদের মধ্যে জয়ী হয়েছেন ১৯ জন। এ ছাড়া বিএনপির বহিষ্কৃত ৭ জন, জাতীয় পার্টির একজন এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের একজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হয়নি। স্থানীয়ভাবে তাদের দলীয় পরিচয় জানা গেছে।

(ডয়চে ভেলে বাংলা সংস্করণের পক্ষ থেকে প্রতিবেদনটি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন)

ইত্তেফাক/এএইচপি