শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

গাফিলতিতে মৃত্যু, দায় নিতে চায় না কেউ

জবাবদিহিতার অভাব ও অব্যবস্থাপনায় এই অবস্থা: অধ্যাপক নজরুল ইসলাম

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ০৮:০০

‘জন্মিলে মরিতে হবে/ অমর কে কোথা কবে/ চির স্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে...’। কবির এই উচ্চারণ শ্বাশ্বত, চিরন্তন। মৃত্যুর স্বাদ সবাইকে নিতে হবে, এটা খুবই স্বাভাবিক ও নির্জলা সত্য। কিন্তু তাই বলে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতিতে মৃত্যু কে-ই-বা মেনে নিতে পারে? এর সহজ জবাব, কেউই পারে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, নানা ক্ষেত্রে নানা জনের গাফিলতিতে অকালে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুবরণ করতে হচ্ছে অনেককে। কখনো লিফটে আটকে, কখনোবা আগুনে পুড়ে অসহায়ের মতো প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। কখনো ভবনে বিস্ফোরণে ঘটছে প্রাণহানি। গ্যাসলাইন, স্যুয়ারেজ লাইন—সবই যেন বিস্ফোরণোন্মুখ। গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডারেও সব সময় ভরসা রাখা দায়। 

এসবের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা, নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ থেকে ইট, লোহার রড পড়া ইত্যাদি তো আছেই। নির্মাণ শ্রমিকরা বেশিরভাগ সময় কাজ করেন প্রাণটা হাতে নিয়ে। উঁচু ভবন থেকে পা ফসকে পড়ে কত শ্রমিক মারা যান তার হিসেব কে রাখে!

বায়ুর মান বিবেচনায় প্রায় সবসময় সবচেয়ে খারাপ শহরগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকা আমাদের রাজধানী ঢাকায় ভারী বৃষ্টিতে পানিবন্দি অবস্থা দেখা দিলে সেই পানি বিদ্যুতায়িত হয়েও মারা যায় মানুষ। কখনো গাছের মরা ডাল ভেঙে পড়ে পথচারীর মাথায়। একটু অসতর্কতায় ঢাকনা খোলা ম্যানহোলে পড়ে গিয়েও যেতে পারে জীবন। রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ধাক্কা দিচ্ছে যানবাহনকে, ঘটছে প্রাণহানি। কিন্তু এতসব অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর দায় নিতে চায় না কেউ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতার অভাব ও অব্যবস্থাপনাতেই ঘটছে এসব অপমৃত্যু। লিফটে আটকে যে রোগী মারা গেল, তার দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। আমাদের দেশে সমস্যাটা হচ্ছে, বেইলি রোডে আগুনের পর কতজনের অবহেলার লেজ বের হলো। কিন্তু কারো বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। এখানে তো ব্যবস্থা নেওয়ার নজির নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে কোনো কাজে স্বচ্ছতা নেই। নেই জবাবদিহিতাও। এখন আপনি যদি কোনো অপকর্ম করে পার পেয়ে যান তাহলে তো এটা বন্ধ হবে না।’

সর্বশেষ গত রবিবার গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের লিফটে আটকে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। মৃত ৫০ বছর বয়সী মমতাজ বেগমের ভাগ্নে খন্দকার শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, মমতাজ বেগম শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগে  ভুগছিলেন। তিনি হাঁটাচলা করতে পারলেও তাকে দ্রুত হৃদরোগ বিভাগে নিতে ট্রলিতে ওঠানো হয়। তিনি বলেন, ‘পরে মামিকে নিয়ে আমরা হাসপাতালের ৩ নম্বর লিফটে উঠি। লিফট হাসপাতালের নবম ও দশম তলার মাঝামাঝি থাকা অবস্থায় হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে থেমে যায়। তখন আমি লিফটে থাকা মোবাইল নম্বরে একাধিক ব্যক্তিকে বারবার ফোন করলেও তারা কর্ণপাত করেনি। উপরন্তু বার বার ফোন করায় তারা বিরক্ত হয়ে আমাদের গালিগালাজ করেন। এক পর্যায়ে মামি ছটফট করতে শুরু করলে আবারও অপারেটরদের এবং জরুরি সেবা নম্বর-৯৯৯ এ ফোন করি। আটকে থাকার ৪৫ মিনিট পর এক পর্যায়ে কয়েক জন অপারেটর গিয়ে দরজা কিছুটা ফাঁক করে আবার দরজা বন্ধ করে চলে যায়। এ সময় অনেক কষ্টে আমরা তিন জন বেরিয়ে আসতে পারলেও মামিকে বের করা সম্ভব হয়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে মামির মৃতদেহ উদ্ধার করে।’

তবে এই মৃত্যুর দায় নিতে রাজি নয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রোগীর মৃত্যুর ঘটনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে জানায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে বলা হয়, ‘লিফটে আটকে পড়া রোগীসহ লোকজন দরজা ধাক্কাধাক্কি করায় লিফটের দরজার নিরাপত্তাব্যবস্থা কাজ করেনি’। রবিবার বিকেলে হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিঠিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর পাঠানো হয়। চিঠিতে সই করছেন হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১০ ঢাকার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবদুল হালিম। চিঠিতে আরও বলা হয়, লিফটে রোগীসহ অন্যরা ৪৫ মিনিট নয়, মাত্র ১০-১৫ মিনিট আটকে ছিলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ইত্তেফাককে বলেন, ‘শহীদ তাজউদ্দীন মেডিক্যালের ঘটনায় তাদের একটা রিপোর্ট আমরা পেয়েছি। আজই (সোমবার) একটা টিম আমি সেখানে পাঠিয়েছিলাম। তারা আগামীকাল রিপোর্ট দেবে। রিপোর্ট পাওয়ার পর আমরা ব্যবস্থা নেব। পাশাপাশি আজকে সারা দেশের সবগুলো হাসপাতালে আমরা একটা নির্দেশনা দিয়েছি। সেখানে এই লিফটের বিষয়টি বলা হয়েছে। লিফটম্যান ছাড়া যেন কোনো লিফট না চালানো হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বলেছি।’ 

শুধু এই লিফটের ঘটনা না, এমন অসংখ্য ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। খুলনার মেয়ে দীপু সানা বাংলাদেশ ব্যাংকের সদরঘাট শাখার সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১০ জানুয়ারি বিকালে কর্মস্থল থেকে অফিসের বাসে রওনা দিয়ে শান্তিনগরে নামেন। এরপর হেঁটে মগবাজারের গাবতলার বাসায় ফিরছিলেন। মৌচাক উড়ালসড়কের নিচ দিয়ে হেঁটে আসার সময় ফখরুদ্দিন রেস্টুরেন্টের পাশে আসতেই ওপর থেকে একটা ইট পড়ে তার মাথায়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান তিনি। ওপর থেকে ইট পড়ে মৃত্যু এই প্রথম নয়। ২০২২ সালের ৩০ মে মিরপুর সাড়ে ১১ নম্বরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে মেট্রোরেল স্টেশনের ওপর থেকে ইট পড়ে সোহেল তালুকদার নামে এক জুয়েলারি কর্মীর মৃত্যুর খবরও সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

এমন মৃত্যু সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন জায়গায় অযোগ্য, অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজদের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা শহরের ব্যবস্থাপনা বলতে গেলে ধ্বংস হয়ে গেছে। একটা শহরে কত ধরনের কর্তৃপক্ষ আছে। কেউ দায়িত্ব নিয়ে কাজটা করছে না। তিতাস, রাজউক, ওয়াসা, পুলিশ, বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর—যাদের যা দায়িত্ব তারা তা পালন করছে না। সবাই ব্যস্ত নতুন নতুন প্রকল্প নিতে। কারণ সেখানে আছে টাকা। দরদ দিয়ে যে বিষয়গুলো দেখভাল করার কথা, সেটা কেউ করছে না।’

রাজধানীর উত্তরায় বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের গার্ডার চাপায় পাঁচ জনের মৃত্যু হয় ২০২২ সালের আগস্টে। বউভাত খেয়ে প্রাইভেট কারে নবদম্পতিকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন স্বজনরা। উত্তরার জসীমউদ্দীন মোড় সংলগ্ন সড়কে বিআরটি প্রকল্পের গার্ডার পড়ে তাদের মৃত্যু হয়। গত বছর পুরান ঢাকার সিদ্দিকবাজারে মার্কেটে অবৈধ গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে জীবন যায় ২৪ জনের। সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় ভবনে বিস্ফোরণ হয়েছে স্যুয়ারেজ লাইনের গ্যাস থেকে। সেখানেও নিহত হন পাঁচ জন। মগবাজারে ভবন বিস্ফোরণে মারা যান কয়েক জন। দুই মাস আগে বেইলী রোডে রেস্টুরেন্টে আগুনে মারা যান ৪৪ জন।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে মিরপুরে ঢাকা কমার্স কলেজ সংলগ্ন ঝিলপাড় বস্তি এলাকার বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পানিতে পড়ে। হেঁটে রাস্তা পার হওয়ার সময় বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হয়ে চার জন মারা যান। তাদের মধ্যে এক জন শিশু, এক জন নারী ও দুই জন পুরুষ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে সারা দেশে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৭০৯ জন। এদের মধ্যে পরিবহন সেক্টরে ২৪৬ জন, নির্মাণশ্রমিক ১১৩ জন, কৃষিশ্রমিক ৯৭ জন, রিকশাশ্রমিক ৪৪ জন এবং দিনমজুর মারা যান ২৯ জন। কিন্তু নিহতদের পরিবারগুলো আজও কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি।

ইত্তেফাক/এমএএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন