সড়কে শৃঙ্খলা আছে কোথায়?

আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ০৮:৩০

রাজধানীতে ভাঙাচোরা ও লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়ি চলিতে পারিবে না—এই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ আমরা বহুদিন ধরিয়া শুনিয়া আসিতেছি; কিন্তু কথায় আছে, ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’। বাস্তবে আমরা এমনটিই দেখিতে পাইতেছি। একসময় বলা হইয়াছিল, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন রাজধানীতে চলিতে পারিবে না, তবে ঢাকার বাহিরে চলিতে পারিবে। ইহা লইয়া কম প্রতিবাদ হয় নাই। কেননা যাহা রাজধানীতে চলিতে পারিবে না, তাহা গ্রামগঞ্জ বা মফস্সল শহরে চলে কীভাবে? তাহাদের জীবনেরও কি কোনো মূল্য নাই? এখন বলা হইতেছে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইতে কোনো অটোরিকশা চলিতে পারিবে না। অটোরিকশার বিরুদ্ধে এখন পরিচালিত হইতেছে সাঁড়াশি অভিযান। খুবই ভালো কথা; কিন্তু কথা হইল—সড়কে শৃঙ্খলা আছে কোথায়? আবার ইহার সহিত কি শুধু যানবাহন চলিবার বিষয়টি জড়িত? সড়কে সাইন-সিম্বল না থাকা, রোড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তোয়াক্কা না করা, ট্রাফিক আইন মানিয়া চলিবার ব্যাপারে উদাসীনতা প্রদর্শন করা ইত্যাদির সমাধান ছাড়া কি সার্বিকভাবে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়া আসিবে?

সড়কে বা তাহার চারিপার্শ্বে নানা অবৈধ স্থাপনা আমরা এত দিনেও উচ্ছেদ করিতে পারি নাই। ইহা সড়ক-মহাসড়কে যানজটের অন্যতম কারণ। ইহার পাশাপাশি বিভিন্ন সড়কে যে খানাখন্দ রহিয়াছে, তাহার নিয়মিত সংস্কারেও আমরা অমনোযোগী। নূতন রাস্তাঘাটের ব্যাপারে যতটা আগ্রহ, সংস্কারে ততটা আগ্রহ কোথায়? ইহা যেন এক গৌণ ব্যাপার। ইহার পাশাপাশি সড়ক-মহাসড়কগুলির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে আমরা কতটা সচেতন? এই ব্যাপারে রহিয়াছে আমাদের সীমাহীন অবহেলা ও গাফিলতি। ঢাকা শহর যেমন, তেমনি ইহার বাহিরে গেলেও দেখিতে পাই, রাস্তাঘাট পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন ইত্যাদিতে সয়লাব হইয়া গিয়াছে। যত্রযত্র ব্যবহার করা হইতেছে জাতীয় নেতাদের ছবি। ঝড়বৃষ্টিতে সেই পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়িয়া পড়িয়া নেতাদের ছবি রাস্তায় গড়াগড়ি খাইতেছে। ইহা কি দেখিবার কেহ আছেন? ইহাতে কি নেতাদের মর্যাদাহানি হইতেছে না? রাস্তার দুই পার্শ্বে নিয়মকানুন লঙ্ঘন করিয়া যেইভাবে দেওয়াল লিখনের প্রতিযোগিতা চলিতেছে, তাহাতেও তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। সৌন্দর্যহানি হয় তো বটেই। বাসস্ট্যান্ড, বিমানবন্দরসহ সড়কের বিভিন্ন স্থানে যে যাহার খুশি মতো এমন কাজ করিতে পারেন না।

আমাদের দেশে দেওয়াল লিখন ও পোস্টার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ রহিয়াছে; কিন্তু অনেক আইনের মতো ইহারও তেমন বাস্তবায়ন নাই বলিলেই চলে। নিয়ম অনুযায়ী যিনি বা যাহারা পোস্টার লাগাইবেন কিংবা মালিকের অনুমতি সাপেক্ষে দেওয়াল লিখনের কাজ করিবেন, নির্দিষ্ট মেয়াদ বা প্রোগ্রাম শেষে তাহারা নিজ দায়িত্বে তাহা অপসারণ করিতে বাধ্য; কিন্তু ইহা কি কখনো মানা হয়? আর এত লেখালেখির পরও লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা গাড়ি কি আমরা সড়ক হইতে তুলিয়া দিতে পারিয়াছি? ইহা লইয়া কি বিচার-বিশ্লেষণ ও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন নাই?

দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নছিমন-করিমন, ভটভটি ইত্যাদি না চলিবার ব্যাপারে কতবার যে নির্দেশ দেওয়া হইল তাহার ইয়ত্তা নাই; কিন্তু তাহা কতটা বাস্তবায়িত হইয়াছে, সড়কে চলিতে গিয়াই তাহা বোঝা যায়। জনসমাজে এইরূপ যানবাহনের চাহিদা কেন দিন দিন বাড়িতেছে—তাহাও চিন্তার বিষয়। অলিগলিতে ইহা ছাড়া সাধারণ মানুষের চলাচলের উপায় কী? অর্থাত্ ইহা কোথায় চলিতে পারিবে আর কোথায় পারিবে না, তাহা সুনির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া যাইতে পারে। তবে মাথাব্যথার জন্য মাথা কর্তন করা বোকামি ও অপরিণামদর্শিতার নামান্তর। অনেকে প্রশ্ন করেন, এই সকল অবৈধ যানবাহনের বিভিন্ন পার্টস দেশে আসিতেছে কীভাবে? তাহা ছাড়া একদিকে আমরা ঘরে ঘরে চাকুরি দিবার কথা বলিতেছি, অন্যদিকে মানুষের কর্মসংস্থানের পথ সংকুচিত করিতেছি—ইহা কি সুবিবেচনাপ্রসূত? অবশ্য এখন ঘরে ঘরে চাকুরি দেওয়ার কথা আর বলা হয় না। উলটা উদ্যোক্তা হইয়া অন্যকে চাকুরি দেওয়ার প্রতি উত্সাহিত করা হয়। তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হইলে সাধারণ মানুষ এমনিতেই নানাভাবে উপকৃত হইবেন।

মোদ্দা কথা, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরাইয়া আনিতে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির অপসারণ ও কম গতিসম্পন্ন যানবাহনের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইহার পাশাপাশি সড়কের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত মেরামত ইত্যাদির ব্যাপারেও আমাদের সুদৃষ্টি দিতে হইবে।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন