ন্যাটোর ব্যর্থতায় ইউক্রেন নিয়ে প্রশ্ন উঠে এসেছে

আপডেট : ২০ মে ২০২৪, ০৩:৩০

খারকিভে নতুন করে আক্রমণ বাড়িয়েছে রুশ বাহিনী। পশ্চিমের ধীরগতিতে অস্ত্রসহায়তার সুযোগ নিতেই যে এমন পরিকল্পনা পুতিনের, সে কথা সবাই বলবে। কিয়েভের হাতে দূরপাল্লার তথা সক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রশস্ত্র তুলে দিতে ন্যাটো নেতাদের কীসের এত ভয়? অনেক বিশ্লেষক বলে আসছেন, ইউক্রেন বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত সমর্থন পাচ্ছে বটে, কিন্তু যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য যে মাত্রার সহায়তা প্রয়োজন, তা পাচ্ছে না। এভাবে ইউক্রেনকে ‘খালি হাতে’ বাঁচিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে ঠিক কী কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে—এসব প্রশ্ন সন্দেহের উদ্রেক করে স্বভাবতই।

আগামী ৯ থেকে ১১ জুলাই ন্যাটোর ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক জমকালো অনুষ্ঠান উদ্যাপনে ওয়াশিংটনে জড়ো হবেন সমমনা অনেক বিশ্বনেতা। ঠিক এমন একটি আয়োজন সামনে রেখে প্রশ্ন উঠছে, সুদীর্ঘ পথচলায় ন্যাটো জোটকে কতটা সফল বলা যায়?

২০২২ সাল থেকে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটো কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পেরেছে বা পারছে, তা এক জটিল প্রশ্ন। বস্তুত, শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন ন্যাটো জোট। ইউক্রেন যুদ্ধে এই সংগঠন অত্যন্ত বাজেভাবে ব্যর্থ হয়েছে বলে মত অনেক বিশ্লেষকের!

ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আর মস্কো ও কিয়েভের মধ্যকার কোনো লড়াই নয়; বরং এই যুদ্ধ এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে গোটা ইউরোপের লড়াই হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধকে বৈশ্বিক স্বাধীনতার লড়াই, গণতন্ত্রের লড়াই ইত্যাদি নামে অবিহিত করে বলেছেন, ‘ইউক্রেনের প্রতি আমাদের সমর্থন কোনো অবস্থাতেই বন্ধ হবে না।’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে ঘোষণা করেছেন, ‘এই যুদ্ধে বিজয় লাভে যত দিন লাগবে, তত দিন কিয়েভের পাশে থাকবে ব্রিটেন।’ এ ধরনের নানা কথা বিশ্বনেতারা বলে আসছেন বটে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করে টিকে থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে একা ইউক্রেনকেই।

রুশ আগ্রাসন ঠেকাতে শুরু থেকেই দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত ছিল ন্যাটোর—এ কথা এখনো বলা হচ্ছে, আগেও বহু বার বলা হয়েছে। ন্যাটো যদি এতে কর্ণপাত করত, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো যেত অনেকখানি। নো ফ্লাই জোনগুলোতে হাজার হাজার বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটত না। রুশ সেনাদের আক্রমণের শিকার হতো না ইউক্রেনের অনেক শহর।

পশ্চিমা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার অভ্যন্তরে সামরিক ঘাঁটি ও তেল শোধনাগারগুলোতে আক্রমণ না চালানোর জন্য কিয়েভকে নির্দেশনা দেওয়া আছে। একইভাবে ন্যাটো নৌবাহিনীর উচিত ছিল খাদ্যপণ্য রপ্তানির অন্যতম রুট কৃষ্ণসাগরের (ব্ল্যাক সি) বন্দরগুলোর চারপাশে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে করে বিশ্বব্যাপী পণ্য আমদানি-রপ্তানি বিঘ্নিত না হয়। একই সঙ্গে এ-ও উচিত ছিল, পুতিনকে কড়াভাবে বলা যে, পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘৃণ্য রাস্তা পরিহার করতে হবে। এসব প্রচেষ্টা এখনো কাজে দিতে পারে। অবশ্য এক্ষেত্রে ‘সদিচ্ছা’ থাকাটাই আসল কথা।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের প্রচলিত কলাকৌশলে ‘মৌলিক পরিবর্তন’ আনার আহ্বান জানিয়েছেন ন্যাটোর সাবেক শীর্ষ কমান্ডার জেনারেল রিচার্ড শিরেফ। তিনি দারুণ সব পরামর্শ দিয়েছেন। তবে রাজনীতিবিদেরা তার কথা আদৌ কানে তুলছেন বলে মনে হয় না।

বাইডেন ও জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ স্কোলজ সামরিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা নিয়েই পড়ে আছেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ আত্মতুষ্টির রাস্তা থেকে সরে এসেছেন। তিনি এখন বলছেন, ‘কেবল রাশিয়ার পরাজয়ের মধ্য দিয়েই ইউরোপ বাঁচতে পারবে।’ এ ধরনের চিন্তা মূলত আরো আগেই করা উচিত ছিল।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে যুক্তরাজ্য, সর্বোপরি ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে ঘনঘন উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এভাবে তিনি হয়তো যুক্তরাজ্যের ভোটারদের ভয় দেখাতে বা আকৃষ্ট করতে পারবেন, কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পুতিন যে সীমাহীন বন্ধুত্বের কথা বলে আসছেন, সে বিষয়ে তার মুখে কথা নেই কেন? ঋষি সুনাককে একা দোষ দেওয়াটা ঠিক হবে না। সুনাকের সঙ্গে আছেন ডেভিড ক্যামেরনের মতো তুখোড় রাজনীতিবিদ। প্রশ্ন হলো, ইউক্রেনকে জয়ী করার প্রশ্নে সরাসরি পদক্ষেপ নিতে তারা কি সেভাবে প্রস্তুত? ঝানু ঝানু রাজনীতিবিদ থাকা সত্ত্বেও দুঃখজনকভাবে ইউক্রেনের পরাজয় দিনে দিনে যেন অবধারতি হয়ে উঠছে।

জুলাইয়ের ঐ অনুষ্ঠানে ন্যাটোর উচিত হবে ইউক্রেনকে পূর্ণ সদস্যপদ প্রদান করা। যদিও তা হওয়ার নয়। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে। কিয়েভকে বলে দেওয়া হয়েছে, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত’ অপেক্ষা করতে হবে। ওয়াশিংটনের এমন যুক্তির পেছনে আসলে কী কারণ থাকতে পারে? স্নায়ুযুদ্ধ যুগের ভয়? সেক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যায়, ন্যাটোর ৩২ সদস্য দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করবেন পুতিন?

ন্যাটোর সাবেক মহাসচিব অ্যান্ডার্স ফগ রাসমুসেনের চিন্তাই সঠিক। তার বক্তব্য, ‘ন্যাটোতে ইউক্রেনের যোগদানের আলোচনা অবিলম্বে শুরু হোক। দূরপাল্লার টরাস মিসাইলের সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুক জার্মানি।’ রাসমুসেন অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ‘যদি আপনি যুক্তি দেন যে, যত দিন যুদ্ধ চলছে তত দিন আপনি ইউক্রেনকে সদস্যপদ দিতে পারবেন না, তাহলে তো এর মধ্য দিয়ে পুতিনকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রণোদনা-প্ররোচনা দেওয়া হলো!’

অনেক কিছু করার আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও। ইইউর উচিত আসছে শীর্ষ সম্মেলনে কিয়েভের ন্যাটো সদস্যপদের আবেদন গুরুত্ব দিয়ে দেখা। কারণ ইউক্রেনের জন্য যুদ্ধের পরিস্থিতি কঠিনতর হয়ে উঠছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মিত্রদের দ্বারা সৃষ্ট বিলম্বকে কাজে লাগাতে চাইছেন পুতিন—এ কথা ভুলে গেলে চলবে না। তাছাড়া ইউক্রেন সেনা অভাবে ধুঁকছে। এমতাবস্থায় বিশ্লেষকদের অভিমত, ইউক্রেনকে অবশ্যই জরুরি ভিত্তিতে লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে হবে। এর পাশাপাশি ইউক্রেনীয় সীমান্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষার স্বার্থে ইউক্রেনে সেনা মোতায়েন করার বিষয়ে গুরুত্বসহকারে চিন্তা করতে হবে। সেনা প্রশিক্ষণ প্রদানও অনেক জরুরি হয়ে পড়েছে। সর্বোপরি স্পষ্ট করতে হবে যে, ইউক্রেনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে ইউরোপ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

এই যুদ্ধে ইউক্রেন পরাজিত হলে ক্ষতি কেবল কিয়েভের একার হবে না; বরং পুতিনের সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রচেষ্টা সফল হলে বিপদে পড়বে সোভিয়েত জমানার অনেক দেশ; যেমন—জর্জিয়া। উপরন্তু, কঠিন অবস্থার মুখে পড়বে ইইউ ও ইউরোপের নিরাপত্তা। ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিতে ন্যাটোর অবস্থা কী হবে, তা সহজেই অনুমেয়।

আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের কাছে বাইডেন যদি পরাজিত হন, তাহলে নিশ্চিতভাবে ইউক্রেনের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাবে। ট্রাম্পের শাসনামলে ন্যাটোর অবস্থা কী হবে, তা-ও বড় প্রশ্ন! সুতরাং, ধরে নিতে হবে, জুলাইয়ে ওয়াশিংটনের ঐ পার্টিই হতে পারে ন্যাটোর জন্য শেষ সুযোগ। রাশিয়া ও ন্যাটোতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার ভার্শবো লিখেছেন, ‘যদি ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হন এবং ন্যাটোবিরোধী মনোভাবে ফিরে আসেন, তাহলে বড় ধরনের হতাহতের প্রথম শিকার হবে ইউক্রেন। ইউরোপের বিপর্যয়কর পরিণতির শুরু হবে সেখান থেকেই।’

পশ্চিমা রাজনীতিবিদদের রাশিয়ান হুমকির প্রতি আরো মনোযোগী হয়ে ওঠা কেন উচিত? অসংখ্য কারণ আছে। রুশ গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা, গুপ্তহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও সাইবার-হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনাগুলো দেখে খুব সহজেই বোঝা যায়, ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে রীতিমতো বাজি ধরে যুদ্ধে নেমেছেন পুতিন।

ইউক্রেনের বিপর্যয় মোকাবিলায় ন্যাটো বাস্তবিক অর্থেই সেভাবে অবদান রাখতে পারছে না। এ কারণে প্রশ্ন জাগে, ন্যাটোর কাজ আদতে কী? কেবল ট্রাম্প নন, অনেকের মনেই উঁকি মারে এই প্রশ্ন!

 

লেখক :আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ :সুমৃত্ খান সুজন

ইত্তেফাক/এমএএম