সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে যাত্রীর মৃত্যু

জলবায়ু পরিবর্তন কি এয়ার টার্বুলেন্সের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

আপডেট : ২৪ মে ২০২৪, ১৩:২২

গত মঙ্গলবার (২১ মে) লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুরগামী একটি ফ্লাইট তীব্র ঝাঁকুনির (টার্বুলেন্স) কবলে পড়ে অন্তত একজন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৭৭ বিমানের #এসকিউ৩২১ ফ্লাইটটি হঠাৎ করেই প্রায় ৬ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। তীব্র ঝাঁকুনির কবলে পড়ায় থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের সুবর্ণভূনি বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে ফ্লাইটটি। ওই ফ্লাইটে ২১১ যাত্রী এবং ১৮ ক্রু ছিলেন। 

তার পর থেকে আলোচনায় ফ্লাইট টার্বুলেন্স। কী এই টার্বুলেন্স? টার্বুলেন্সের ফলে কি এমন হতাহতের ঘটনা ঘটে? জলবায়ু পরিবর্তন কি টার্বুলেন্সের জন্য দায়ী?

টার্বুলেন্স কী?
অস্থির বায়ুকেই টার্বুলেন্স বলা হয়। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়, এটি বাতাসের অনিয়মিত এবং অপ্রত্যাশিত গতির প্রবাহ। এমন বাতাসে উড়োজাহাজ চলাচল করলে তা অনেক সময় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। টার্বুলেন্স প্রায়শই উড়োজাহাজে অস্থিরতা এবং কম্পন সৃষ্টি করে। কখনও কখনও এটি যাত্রীদের অসুবিধার কারণ হতে পারে। তবে উড়োজাহাজগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে এটি টার্বুলেন্স মোকাবেলা করতে পারে।

টার্বুলেন্স কেন হয়?
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ রিডিং আবহাওয়াবিদ্যা বিভাগের একজন টার্বুলেন্স গবেষক বলেছেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ফলে, মেরু অঞ্চলের তুলনায় ক্রান্তীয় অঞ্চলের বায়ুমণ্ডল দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। তাপমাত্রার এই পার্থক্য বায়ুর স্রোত বৃদ্ধি করে, ফলে বায়ু আরও অশান্ত হয়ে ওঠে।

যদিও শীতকাল আকাশ পথে বাহন চলাচলের জন্য সবচেয়ে উত্তাল ঋতু হলেও জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রীষ্মকালেও আকাশ পথে চলাচল কঠিন হয়ে উঠবে।

The interior of Singapore Airline flight SQ321 is pictured after an emergency landing at Bangkok's Suvarnabhumi International Airport

টার্বুলেন্সের ফলে কি এমন হতাহতের ঘটনা ঘটে?

প্রতি বছর কয়েক কোটি ফ্লাইট আকাশপথে যাতায়াত করে। তবে আকাশপথে এমন দুর্ঘটনা বিরল। 

ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অনুসারে, বিশ্বের বৃহত্তম বিমান ভ্রমণের বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এমন দুর্ঘটনায় ১৬৩টি আহতের ঘটনা ঘটেছে, যার জন্য হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন ছিল৷ তবে এর জন্য মৃত্যুর কোনো ঘটনা এর আগে ঘটেনি।

A Singapore Airlines aircraft is seen on tarmac after requesting an emergency landing at Bangkok's Suvarnabhumi International airport, Thailand

২০০১ সালে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৫৮৭ বিধ্বস্তের ঘটনা ঘটে। তবে সেটি টার্বুলেন্সের কারণে নয়, বরং যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে বিমানের স্ট্যাবলাইজার বিকল হয়ে বিধ্বস্ত হয়। টার্বুলেন্সের কবলে পড়ে ৬ হাজার ফিট নিচে বিমান নেমে আসার ঘটনাও বিরল।

বিমানের আসনে সটিক নিয়ম মেনে বসলে এসব বিরল দুর্ঘটনাও এড়ানো সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তন কি টার্বুলেন্সের জন্য দায়ী?

গত বছর প্রকাশিত ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অফ রিডিং-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ১৯৭৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ফ্লাইট রুট উত্তর আটলান্টিকের ওপর ৫৫ শতাংশ বেড়েছে ক্লিয়ার-এয়ার টার্বুলেন্স। ফ্লাইট সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট এবং সিইও হাসান শাহিদির মত্র, ক্লিয়ার-এয়ার টার্বুলেন্স একটি হলো এমন ঘটনা যা সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩ থেকে ৩৯ হাজার ফুট ঘটে। এটি খুব বিপজ্জন ঘটনা।  

উষ্ণ তাপমাত্রা বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। ওই প্রতিবেদনে এর জন্য মূলত গ্রিনহাউজ গ্যাসকে দায়ী করে হয়েছে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও বলেছেন যে, বিমান যখন তার সর্বোচ্চ গতিতে থাকে, ওই অবস্থাতে উষ্ণ তাপমাত্রা বিমানের গতিবিধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে বিমানের গতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাস একই মাত্রায় বাড়তে থাকলে বিশ্ব উষ্ণতার প্রতি ডিগ্রি সেলসিয়াসের জন্য গতি ২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে এবং চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলেছেন, টার্বুলেন্স-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা এড়াতে এয়ারলাইন্সগুলোকে তাদের বিমানের গতি সীমিত করতে হবে। 

উত্তর আমেরিকা-ইউরোপের মূল রুট উত্তর আটলান্টিকের ওপর এরকম টার্বুলেন্স সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব চীন, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং উত্তর ভারতেও এর ঝুঁকি কম নয়। চীনের নানজিং ইউনিভার্সিটির ২০২১ সালের একটি সমীক্ষায় ২০৫৯ সালের মধ্যে ক্লিয়ার-এয়ার টার্বুলেন্সের ঘটনা ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন