মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ আঘাত হানবে কাল

  • অভিমুখ পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়া
  • চার সমুদ্রবন্দরে সতর্কসংকেত
আপডেট : ২৬ মে ২০২৪, ১৪:৪৪

’ঘূর্ণিঝড় প্রবণ’ এই মাসে বঙ্গোপসাগরে অতিদ্রুত তৈরী হয়েছে একটি ঘূর্নাবর্ত। গতকাল শুক্রবার রাতে গভীর নিম্নচাপে পরিনত হওয়ার পর শক্তি সঞ্চয় করে আজ শনিবার ঘূর্ণিঝড় ’রেমাল’-এ রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। অত:পর সাগরের জলরাশি থেকে জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করে ক্রমাগত শক্তি বাড়িয়ে আগামীকাল রবিবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মাঝখান দিয়ে স্থলভাগে প্রবল গতিতে আছড়ে পড়তে পারে। 

উপকূলে আঘাত হানার সময় এটির কেন্দ্রের গতিবেগ উঠতে পারে ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত। গতকাল রাত ১০ টায় নিম্নচাপ কেন্দ্রে ৪৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার। যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সাগর।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এর অভিমুখ এখন বাংলাদেশের দিকে। গতকাল বাংলাদেশ আবহাওয়া দফতর দেশের চার সমুদ্র বন্দরে সতর্কতা জারি করেছে। আবহাওয়াবিদগণ মডেল বিশ্লেষণ করে বলছেন,আঘাত হানার সময় সাত-আট ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলভাগ প্লাবিত হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমুহকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থাকতে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে তাদের গভীর সাগরে বিচরণ না করতে বলা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গভীর সঞ্চারণশীল মেঘমালায় সারা দেশের আকাশ ছেয়ে যেতে পারে। 

গতকাল রাত থেকে উপকূলভাগে হালকা বৃস্টি হচ্ছে। কোস্ট গার্ডের সদস্যরা উপকূলে মাইকিং করে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে যেতে বলছেন। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড গতকাল রেমাল বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানার আশঙ্কা পরিপ্রেক্ষিতে পানিভবনে কন্ট্রোলরুম খুলেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আজিজুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় জানান,আগামীকাল রোববার সন্ধ্যায় এ ঘূর্ণিঝড় রেমল বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। আর এ সময় উপকূলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। আজিজুর রহমান বলেন, প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’ খুলনা থেকে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মাঝামাঝি স্থানে এটি আঘাত হানতে পারে। অপেক্ষাকৃত বেশি এলাকা ধরে ঘূর্ণিঝড়টির বিস্তৃতি থাকতে পারে। সমুদ্র উপকূলের সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি বলেন,আজ শনিবার রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি হতে পারে। এটিই যতই অগ্রসর হবে ততই ভারী বর্ষণ দেখা দেবে। আজিজুর রহমান বলেন,যে আবহাওয়া মডেলগুলি আমরা চালাচ্ছি, তাতে দেখতে পাচ্ছি সিভিয়ার সাইক্লোনের সম্ভাবনা আছে উপকূলের কাছাকাছি এলে। ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলে এর গতিপথ এবং ব্যাপকতা সম্পর্কে আরো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে

ভারতীয় আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে,নিম্নচাপটি উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং আজ শনিবার সকালের মধ্যে তা ঘনীভূত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হবে। সন্ধ্যার মধ্যে এটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের আকার নিতে পারে। আরও উত্তরে অগ্রসর হয়ে আগামীকাল রবিবার মধ্যরাতে তা আঘাত হানার আশংকা স্থলভাগে। বাংলাদেশের খেপুপাড?া এবং সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপের উপকূলে সর্বশক্তি নিয়ে আছড়ে পড়তে পারে।

ভারতের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ড. ডিএ পত্তানায়েক টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছেন,আগামীকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাত হানবে। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার মাঝ দিয়ে উপকূলে ওঠে আসবে। উপকূলে আঘাত হানার সময় এটির কেন্দ্রের গতিবেগ ওঠে যাবে ১৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত।

ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ নিয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক শামীম হাসান জানান, বাংলাদেশের উপকূলের দিকেই আসতে পারে। এর গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার হতে পারে। তবে ‘সুপারসাইক্লোন’ হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।

আবহাওয়াবিদ ড.আবুল কালাম মল্লিক জানান,ক্রমাগত শক্তি সঞ্চয় করে গতকাল শুক্রবার রাতে এটির গভীর নিম্নচাপে রূপ নিচ্ছে। বর্তমানে পূর্ব মধ্য বঙ্গোপসাগর এবং এর কাছাকাছি পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগরের অংশ জুড়ে অবস্থান নিম্নচাপটির। এটি আরও উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর ও ঘনীভূত হতে পারে। বাংলাদেশ উপকূলের সুন্দরবন ও খেপুপাড়ার দিকে এর গতিপথ। তিনি বলেন,মনসুন বা বর্ষা মৌসুম শুরুর ঠিক আগে আগে আর্দ্রতা অনেক বেশি থাকে। ফলে এই সময় কোনো ঘূর্ণিঝড় দেখা দিলে তার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অনেক বেশি হয়। ফলে,নিম্নচাপ যদি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়, বায়ু তাড়িত জলোচ্ছাস, দমকা ও ঝোড়ো হাওয়ার পাশাপাশি বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাস মডেলগুলো বিশ্লেষন করে জানান,পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিন চব্বিশ পরগনা জেলা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম জেলার মধ্যবর্তী উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে স্থলভাগে আঘাত করার প্রবল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে আগামীকাল সকাল ৬ টার পর থেকে সোমবার ২৭ মে দুপুর ১২ টার মধ্যে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর সম্ভাব্য গতিপথ প্রকাশ করেছে। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুসারে রেমালের বাম দিকের সামান্য কিছু অংশ পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিন চব্বিশ পরগনা জেলান উপর দিয়ে ও বেশীরভাগ অংশ খুলনা ও বরিশালের উপর দিয়ে স্থলভাগে প্রবেশ করতে পারে। অধিকিন্তু, ঘূর্ণিঝড় রেমাল স্থল ভাগে আঘাত করার সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ থাকতে পারে ঘন্টায় ১১১ কিলোমিটার।

ইত্তেফাক/এএইচপি