শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

নজরুলের কাব্য ও গানে প্রেম ও দ্রোহী সত্তা

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ০৫:৩২

‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রর্ণ-তূর্য্য’—এমনই দুর্দান্ত লাইন রচনার স্রষ্টা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রেম ও দ্রোহের এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি তার কাব্য ও গানে যেমন বিদ্রোহের ঝঙ্কার তুলেছিলেন, তেমনি প্রেমের মায়াজালে সবাইকে আকৃষ্টও করেছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি স্বাধীনতার কথা বলার পাশাপাশি প্রেমেও পড়েছিলেন বারবার। ভালোবেসে প্রিয় মানুষের সঙ্গে ঘরও বেঁধেছিলেন বহু বাধা উপেক্ষা করে। মহান এই কবিকে শুধু ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে আখ্যা দিলে নিঃসন্দেহে তার মানসকে খণ্ডিত করে দেখা হবে। কারণ তিনি দ্রোহের কবি যেমন সত্য, প্রেমের কবি হিসেবেও ততটা সত্য। তার কাব্য ও গানে দ্রোহের চেতনা এসেছে নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষদের জাগানোর জন্য আর চিরন্তন প্রেমের বাণীতে এসেছে শাশ্বত কালের মানবহূদয়ের আবেদন।

নজরুলের সমগ্র জীবন ছিল দুঃখে ভরা কিন্তু সুখ যখন এসে তার কুটিরে ধরা দিয়েছে তখন তিনি নির্বাক, নির্বিকার। ছোট থেকে নিজ জীবনের জন্য, পরিবারের জন্য এমনকি দেশের জন্য তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। কৈশোরে যুদ্ধে গিয়েছেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে কলম হাতে লিখেছেন দ্রোহী গান ও কবিতা। সারা বাংলার মানুষকে ব্রিটিশ রোষানল, অত্যাচারীর খড়্গহস্ত থেকে মুক্ত করতে এবং নির্যাতিত মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার থেকে কলম চালিয়েছেন। সমাজের অনিয়ম-উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লিখেছেন অবিরত। বলা চলে, বিরূপ পরিবেশের মধ্যেও তিনি শক্ত হাতে হাল ধরে সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি আপনার কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, যতদিন তিনি নির্যাতিত মানুষের প্রাপ্য অধিকার আদায় করতে না পারবেন, ততদিন তিনি শান্ত হবেন না। তাই তিনি লিখেছেন—‘যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোল, আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ, ভীম রণ-ভূমে রণিবে না—বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হবো শান্ত!’

এই দ্রোহী চেতনার জন্য তাকেও যে কম নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, এমন নয়! ব্রিটিশ রোষানলে পড়ে তাকে বারবার কারাবরণ করতে হয়েছে শুধু তার লেখনীর জন্য। সে সময় তার রচিত অনেক সৃষ্টি ও বই বাজেয়াপ্তও করেছিল ব্রিটিশ সরকার। মানসিক কষ্ট নিয়ে নজরুল জেলে বসেই আবার রচনা করতে থাকেন বিদ্রোহী কবিতা ও সংগীত। যার মননে ও কর্মে ছিল বিদ্রোহ, তাকে কীভাবে বিদ্রোহী রচনা থেকে বিরত রাখা যায়! তিনি লিখেছেন—‘কারার ঐ লৌহকপাট /ভেঙে ফেল কর রে লোপাট /রক্ত জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদী /কারার ঐ লৌহকপাট...’

নজরুলের কাব্যে রোমান্টিক কবিসত্তার সঙ্গে বিরহ-বেদনা একাত্ম হয়ে গেছে। প্রেমবিষয়ক কাব্যেও তার বিক্ষুব্ধ মনের পরিচয় পাওয়া যায়। তাই প্রেমের বেদনায় তিনি মানবিক হয়ে উঠেছেন। প্রিয়াকে হারানোর স্মৃতির মধ্যে খুঁজে ফিরেছেন হারানো প্রেমকে। তার প্রিয়া হয়েছে নিত্যকালের সঙ্গী। হূদয়ের গভীর আর্তি তার প্রেমিক-কবিসত্তাকে চিরজাগ্রত করে তুলেছে। বলগাহারা নজরুল প্রিয়াবিরহকে একটা সময় গিয়ে মেনে নিয়েছিলেন এবং পরজনমে আবার মিলিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় লিখেছিলেন—‘পরজনমে দেখা হবে প্রিয় ভুলিও মোরে হেতা ভুলিও...’

নজরুল চেয়েছিলেন তার প্রিয়ার খোঁপার বাঁধনকে উন্মুক্ত করতে। যে উন্মুক্ততায় প্রেমের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকবে না। প্রেম হবে চিরন্তন, সার্বজনীন। প্রত্যেকে যে প্রেমের আকাঙ্ক্ষায় উন্মত্ত থাকে, সে উপলব্ধিও নজরুল করেছিলেন। তাই তিনি লিখেছেন, ‘আমরা এই পৃথিবীতে প্রেমের পূজারী হয়ে থাকি।’

যিনি ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী, খোঁপায় দেব তারার ফুল’-এর মতো অসাধারণ রোমান্টিক গান রচনা করতে পারেন, সেই তিনিই আবার সময়ের প্রয়োজনে বিদ্রোহী চেতনায় লিখেছেন, ‘আমি দুর্বার, আমি ভেঙে করি সব চুরমার’। এই যে এক দ্বৈধ চিন্তাধারার সম্মোহনী শক্তি তিনি অর্জন করেছিলেন, তা সাহিত্যাকাশে সত্যিই বিরল প্রতিভা হিসেবে পরিগণিত। বিদ্রোহ ও প্রেম—উভয় ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন রোমান্টিক। কারণ বিদ্রোহের ক্ষেত্রে তিনি যেমন মারমুখী ও আপসহীন ছিলেন, তেমনি প্রেমের ক্ষেত্রেও ছিলেন অবুঝ শিশুর মতো অসহায়।

মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন, তাই মানুষের মহত্তম বৃত্তি প্রেমকে তিনি আত্ম-অনুভবে দীপ্ত করে তুলেছিলেন তার কাব্য ও গানে। মূলত আপন জীবনের গভীর বঞ্চনাবোধ থেকে হয়েছিলেন বিদ্রোহী আর প্রেমের ক্ষেত্রে হয়েছিলেন চিরবিরহী। তাই তার কাব্য ও গানে প্রেম ও দ্রোহী সত্তা একীভূত হয়ে গেছে। তিনি হয়ে উঠেছেন সবার প্রিয় কবি।

লেখক: প্রভাষক, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি

ইত্তেফাক/এএইচপি

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন