শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

এমপি আজীম হত্যা

দক্ষিণ-পশ্চিমের জনপ্রতিনিধিরা সতর্ক চলাফেরায়

আপডেট : ২৬ মে ২০২৪, ০৩:০০

গত এক দশকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থি দলের তৎপরতা থিঁতিয়ে গেলেও আবারও আলোচনায় এসেছে তাদের তৎপরতা। নানা পেশার আড়ালে এরা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। ভারতে বাংলাদেশের চরমপন্থি দলের এক শীর্ষনেতার নেতৃত্বে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর এই তৎপরতার প্রমাণ মিলেছে।

এদিকে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের পর এ অঞ্চলের জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ফের আতঙ্ক শুরু হয়েছে। সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য হামলা এড়াতে তারা সতর্কাবস্থায় চলাফেরা শুরু করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শুরু স্বাধীনতার পর থেকেই। তবে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে জনপ্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়ে যায়। এ সময় চরমপন্থি দলের সন্ত্রাসীদের হাতে বহু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধি নিহত হয়। ১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে প্রখ্যাত বামপন্থি রাজনীতিবিদ কমরেড রতন সেনকে হত্যা করা হয়। ১৯৯৫ সালের ২৫ এপ্রিল খুলনা মহানগর জাতীয় পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ আবুল কাশেমকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয়। ২০০০ সালের ১১ আগস্ট জুমার নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও জাতীয় পার্টি থেকে সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদানকারী এস এম এ রবকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তিনি খুলনা সিটি কর্পোরেশনের আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ছিলেন। ২০০৩ সালের ২৫ আগস্ট নিজবাড়ির অনতিদূরে খুন হন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম। ২০০৯ সালে হত্যা করা হয় যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও খুলনা মহানগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহীদ ইকবাল বিথারকে। বিথারের স্ত্রী বর্তমানে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়াও এ দীর্ঘ সময়ে এ অঞ্চলে অসংখ্য জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী সন্ত্রাসীদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। নিহত উল্লেখযোগ্য জনপ্রতিনিধিরা হলেন খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউপি চেয়ারম্যান সরদার আবু সাঈদ বাদল, ফুলতলা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও খুলনা জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ বাদলের ভাই সরদার আলাউদ্দিন মিঠু, দিঘলিয়া উপজেলার বারাকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা গাজী আব্দুল হালিম, নড়াইল জেলার বিছালী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান, লোহাগড়া উপজেলার মল্লিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম, বাগেরহাটের বুড়ীরডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান পিন্টু, ডেমা ইউপি চেয়ারম্যান আক্তার হোসেন, মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার মহাজনপুর ইউপি চেয়ারম্যান বাগবুল ইসলাম বাবলু, গাংনী পৌর চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম, গাংনী উপজেলার কাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল বাকী, চুয়াডাঙ্গা জেলার কালীদাসপুর ইউপি চেয়ারম্যান মেহের আলী, জেহালা ইউপি চেয়ারম্যান কচি, আন্দুলবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান বাহারুল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলার ঝাউদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ, কয়া ইউপি চেয়ারম্যান আমির হোসেন, ঝিনাইদহের মহেশপুরে ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, সাতক্ষীরার গহর আলী ও মিজানুর রহমান। 

এছাড়া সাংবাদিক শামসুর রহমান কেবল, আর এম সাইফুল আলম মুকুল, হুমায়ুন কবির বালু, মানিক চন্দ্র সাহা, হারুনুর রশিদ খোকন, শেখ বেলাল উদ্দিন। সর্বশেষ ভারতের কলকাতায় সুকৌশলে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয় ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে। নিহত আনার কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছে খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামের মাহমুদুল হাসান ভুঁইয়া ওরফে শিমুল ভুঁইয়া। বিভিন্ন অঞ্চলে সে সৈয়দ আমানুল্লাহ, আমানুল্লাহ সাঈদ, শিহাব, আবুল ফজল,  ফজল মোল্লা ও ফজলসহ বিভিন্ন ছদ্মনামে পরিচিত। ভয়ংকর এই সন্ত্রাসী নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি দল পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) সামরিক শাখার প্রধান। সংসদ সদস্য আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের সবাই শিমুলের পরিচিত ঘনিষ্ঠ। শিমুলের নিয়ন্ত্রণে এখনো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক সশস্ত্র সদস্য সক্রিয়। যাদের বেশির ভাগই হচ্ছে খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলায়।

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থি দলের নেতা শিমুলের সম্পৃক্ততা থাকার কথা বেরিয়ে আসার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ফের আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য হামলা এড়াতে তারা সতর্কাবস্থায় চেলাফেরা শুরু  করছেন।

এ ব্যাপারে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক বাবুল বলেন, সব সময়তো নিরাপত্তায় থাকা যায় না। তবে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের পর কিছুটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করছে। কিছুটা আতঙ্কেও আছি।

সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফিরোজ আহমেদ স্বপন বলেন, একজন সংসদ সদস্য নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়। তবে  এক জন সংসদ সদস্য হত্যাকাণ্ডের পর কিছুটা হলেও সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করতে হচ্ছে।

মাগুরা জেলা বিএনপি নেতা ও শালিখা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মোজাফফর হোসেন টুকু বলেন, এ সরকারের আমলে সাধারণ মানুষ সব সময়ই আতঙ্কের মধ্যে আছে। নৃশংসভাবে একজন এমপিকে পাশের দেশে নিয়ে গিয়ে সুকৌশলে হত্যার পর মানুষ আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ কেউ বর্তমানে নিরাপদ নেই।

জাতীয় পার্টির (জাপা) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম মধু বলেন, কলকাতায় সংসদ সদস্যের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনি শুনে সবাই হতবাক হয়ে পড়েছে। আমরা চরমপন্থিদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আলামত দেখছি। সরকারের দায়িত্ব এ হত্যাকালের বিচার ত্বরান্বিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।

খুলনা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, এই সরকারের আমলে কেউই নিরাপদ নেই। আর বিরোধী দল হিসেবে আমাদের তো নিরাপত্তা নেই বলা চলে। আর হত্যাকাণ্ড নিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের যে কাহিনী পত্রপত্রিকায় ও টিভিতে দেখছি তা দুঃখজনক।

খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম ডি এ বাবুল রানা বলেন, আমরা স্বচ্ছ রাজনীতি করি কাজেই আতঙ্কবোধ করছি না। মাঝেমধ্যে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। এতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

ইত্তেফাক/এমএএম