দুর্ঘটনা ঘটাটা স্বাভাবিক এবং সব দেশেই ঘটে। তবে সব দুর্ঘটনা সমান নয়। এর গুরুত্বতে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কিছু দুর্ঘটনা আছে, যা সত্যিকারের দুর্ঘটনা হলেও তা ‘দুর্ঘটনা’ বলে বিশ্বাস করা কঠিন। ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির হেলিকপটার দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার ব্যাপারটিও তাই। কিছু দুর্ঘটনা এমন যে, তদন্ত যাই হোক না কেন, তা জনগনকে বিশ্বাস করানো কঠিন।
উদাহরণ হিসেবে ১৯৬১ সালে নর্দান রোডেশিয়ায়, ১৯৭১ সালে চীনে, পাকিস্তানে ১৯৮৮ সালে এবং পোল্যান্ডে ২০১০ সালের বিমান দুর্ঘটনার কথা বলা যায়। এসব দুর্ঘটনায় রাজনৈতিক নেতাদের প্রাণ গেছে। এসব দুর্ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট এসেছে। কিন্তু জনসাধারণের একটা বড় অংশের কাছে কখনো বিশ্বাসযোগ্য হয়নি এবং হবেও না। মূলত দেখা হয়, এই দুর্ঘটনা থেকে কে বেশি লাভবান হন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো ব্যক্তি জড়িত না হয়েও ভাগ্যের জোরে লাভবান হতে পারেন। কিন্তু দোষটা জনগন শেষ পর্যন্ত তার ওপরই দেন।
রাইসির মৃত্যুতে কে বেশি লাভবান : দুর্ঘটনার পর থেকেই নানা ধরনের প্রশ্ন উঠছে। ইরানের অনেকেই মনে করছেন রাইসিকে পরিকল্পনামাফিক হত্যা করা হয়েছে। আর এর নেপথ্যে রয়েছে শত্রু দেশ। উত্তর-পশ্চিম ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায় ভেঙে পড়ে রাইসির হেলিকপটার। ইরানের প্রতিবেশি দেশ আজারবাইজানের সীমান্তঘেঁষা এলাকাতেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। এই আজারবাইজান ইরানের প্রতিবেশি রাষ্ট্র হলেও তেহরানের প্রভাব সে দেশে নেই। বরং একদা সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ এই দেশ গোড়া থেকেই পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে এসেছে।
তাছাড়া ইরানের শত্রু দেশের সঙ্গেও আজারবাইজানের খুব ভালো সম্পর্ক। এক সময় উত্তর ইরানে যখন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়েছিল, সেই সময় শত্রু দেশের গুপ্তচর সংস্থা সেখানে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল বলে মনে করেন ইরানের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদেরই একাংশ। যারা রাইসির হেলিকপটার ভেঙে পড়ার ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলতে নারাজ, তাদের প্রশ্ন, রাইসির কপটারের আগে-পরে অন্য কপটারের থাকলেও সেগুলো কেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ল না? যদিও ইরান সরকারের প্রাথমিক তদন্তে দুর্ঘটনার পক্ষেই সিল মারা হয়েছে।
২০২১ সালে ইরানের আধ্যাত্মিক বা শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি রাইসিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কারণ খামেনি তাকে প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করেননি। খামেনি নিজেই চেয়েছিলেন যে রাইসিই তার উত্তরসূরী হোক। দেশটিতে মূল ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট নন, সর্বোচ্চ নেতার হাতেই। ইরানের বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, রাইসি কট্টরপন্থি হলেও খামেনির মতো শক্ত হাতে প্রশাসন চালাতে পারতেন না। তিনি হতেন দুর্বল প্রকৃতির শাসক। রাইসি শীর্ষ নেতা হলে ক্ষমতা মূলত ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ড অথবা অন্য কোনো কেন্দ্রের কাছে চলে যেতো। তাহলে রাইসির স্থলে কে আসলে ভালো হয়, এমন একটা আলোচনা আছে। দেশটিতে কট্টরপন্থিদের মধ্যেও প্রতিযোগিতা আছে। এই যেমন পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কালিবাফ। তার নেতৃত্বে এবারের পার্লামেন্ট নির্বাচনে দল ভাল ফল করেছে। তার বিরুদ্ধে প্রচারণাও কম হয়নি। তবে তিনি কট্টরপন্থি বিশেষ করে আইআরজিসির সমর্থন পেয়েছিলেন। রাইসির মৃত্যুর ফলে কট্টরপন্থিদের মধ্যে হয়তো ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হবে। তার স্থলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের। ৫০ দিনের মধ্যে মোখাবের, কালিবাফ এবং প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি-ইজির সমন্বয়ে গঠিত কাউন্সিল নির্বাচনের আয়োজন করবে।
ধারণা করা হচ্ছে, ড. কালিবাফই ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট হবেন। তিনি ২০০৫ সাল থেকেই প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করছেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি আইআরজিসির কমান্ডার ছিলেন। ফলে আইআরজিসি থেকে তিনি সমর্থন পাবেন বলে মনে করা হয়। তবে ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তেহরানের মেয়র থাকাকালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। এমনকি তার বিরুদ্ধে মামলাও ছিল। তার বিরোধীরা এখন সেগুলোই সামনে আনছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, কালিবাফের সমস্যা হলো তিনি বেশি কিছু চান।
সবাই জানে যে, কালিবাফ ক্ষমতার জন্য যে কোনো কিছু করতে পারেন। কালিবাফ প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলে গার্ডিয়ান কাউন্সিল কর্তৃক তাকে বাদ দেওয়া কঠিন হবে। কারণ ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই ভালো। কিন্তু ইরানের নাগরিকদের ভোটে না জেতা টেকনোক্র্যাট কোটায় আসা কালিবাফকে খামেনি সমর্থন দেবেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়। তাহলে কে আছেন যিনি কালিবাফকে হারাতে পারেন? এর আগে ২০০৫ সালে আহমেদিনাজাদ এবং ২০১৩ সালে রুহানি তাকে হারিয়েছিলেন।
রাইসির মৃত্যুর পর একজনের নাম বেশ জোরেশোরেই আলোচনায় আছে। তিনি খামেনির বড় ছেলে মুজতবা খামেনি। ধারণা করা হচ্ছে, বাবার মৃত্যুর পর এই ছেলেই শীর্ষ নেতা হবেন। যদিও তাকে জনসম্মুখে খুব একটা দেখা যায় না। তবে ক্ষমতার শক্তিশালী কাঠামোর সঙ্গে তার সম্পর্কটা মধুর। তিনি তাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠকও করেন। অনেকেই বলেন যে, ৮৫ বছর বয়সি খামেনির হয়ে দেশ শাসন করেন আসলে মুজতবাই। ফলে ক্ষমতার লড়াইয়ে কালিবাফ এবং মুজতবাকে দেখা যেতে পারে। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি ১৯৮৯ সালে মারা যান। এরপর খামেনি তার ধর্মগুরু আকবর হাশেমি রাফসানজানির সঙ্গে অলিখিত চুক্তি করেন। রাফসানজানি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্টকে আরো ক্ষমতা দেওয়ার জন্য সংবিধান দ্রুত সংশোধন করা হয়। তবে রাফসানজানি চুক্তিটির জন্য অনুশোচনা করেন। কারণ খামেনি তাকে রাজনৈতিকভাবে পাশ কাটিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে রাফসানজানি মারা যান। যদিও তার মৃত্যু নিয়ে নানা সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। ইরানে এখন হয়তো ক্ষমতার লড়াই দেখা যাবে। তবে সবচেয়ে বড় লড়াই হবে খামেনির মৃত্যুর পর।
নীতির পরিবর্তন হবে না : ইউনাইটেড এগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরানের পলিসি ডিরেক্টর জ্যাসন ব্রোডেস্কাইয়ের মতে, ইরানে ক্ষমতার মূল কারিগর মূলত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। কারণ দেশটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা শীর্ষ ধর্মগুরুর। প্রেসিডেন্ট কেবল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। ফলে কট্টরপন্থি রাইসির মৃত্যুতে ইরানে কট্টর পররাষ্ট্র নীতির পরিবর্তন হবে তা বলা যাবে না। রিচম্যান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওরি গোল্ডবার্গের মতে, প্রেসিডেন্ট রাইসি মূলত শীর্ষ নেতার হয়ে কাজ করেছেন। গোল্ডবার্গের মতে, রাইসির মৃত্যুতে কেবল ক্ষমতার হাতবদল হবে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দেখা যাবে। দেশীয় ও পররাষ্ট্র নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাইসি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বি সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার সঙ্গে নিহত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির আব্দুল্লাহিয়ান ছিলেন এক্ষেত্রে দক্ষ। মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টায় ছিলেন। তিনি চীন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছিলেন, বিশেষ করে পরমাণু শক্তির ক্ষেত্রে। রাইসি চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান চীনে প্রতিদিন ৪ লাখ ব্যারেল থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমা বিশ্বের কেউ যদি মনে করেন যে, রাইসির মৃত্যুর পর চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ঘাটতি তৈরি হবে, তাহলে সেটা ভুল হবে। বরং রাইসির মৃত্যুর পর সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন রাইসির মৃত্যুর পর যে ধরনের বার্তা দিয়েছেন, তাতে তাই বোঝা যাচ্ছে। দেশ দুটি রাইসির শেষকৃত্যে যোগ দিতে প্রতিনিধিও পাঠিয়েছে।
-দ্য আটলান্টিক ও টাইমস অব ইসরাইল
