সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
The Daily Ittefaq

সুপেয় পানির খোঁজে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসার আশঙ্কা

আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ০৪:০০

ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় অস্বাভাবিক জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের মিঠা পানির আধার শতাধিক পুকুর ও জলাশয় লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হওয়ায় সুপেয় পানির খোঁজে বনের হরিণ ও বাঘসহ বন্যপ্রাণীদের লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী মানুষের হাতে বন্যপ্রাণীদের জীবনহানির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী জুন-জুলাইয়ে (বর্ষা মৌসুম) পর্যাপ্ত বৃষ্টি হওয়ার পর সুন্দরবনের লবণাক্ততা কমে যাবে। সেই ক্ষেত্রে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের লোকালয়ে প্রবেশের খুব একটা আশঙ্কা থাকবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের পানি ও মাটিতে লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। কমে গেছে মিঠা পানির প্রবাহ। অতিরিক্ত লবণাক্ততা বদলে দিচ্ছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে পুরো সুন্দরবন লবণ পানিতে প্লাবিত হওয়া। বিশেষ করে ১০-১২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের অভ্যন্তরের মিঠা পানির আধার শতাধিক পুকুর ও জলাশয় লবণাক্ত পানিতে ডুবে গেছে। যার কারণে বন্যপ্রাণীদের জন্য চরমভাবে সুপেয় পানির অভাব দেখা দিয়েছে। ফলে মিঠা পানির খোঁজে হরিণ ও বাঘসহ সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের পার্শ্ববর্তী লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিপূর্বে বেশ কয়েকটি বাঘ ও হরিণ লোকালয়ে প্রবেশ করে মানুষের নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে।

বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ খুলনার কর্মকর্তা মফিজুর রহমান চৌধুরী জানান, এবারের ঘূর্ণিঝড় রেমালের সময় জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের গাছপালার চেয়ে পশুপাখির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বেশি। সুন্দরবনের যেসব জায়গা উঁচু তা সর্ব্বোচ্চ ৮ ফুট। অথচ সেখানে পানি উঠেছে ১০-১২ ফিট। টানা ৩৬-৩৭ ঘণ্টা পুরো সুন্দরবন লবণপানির নিচে ছিল। ফলে এবার বন্যপ্রাণীর মৃতের সংখ্যা অন্য যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, জলোচ্ছ্বাসের কারণে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের সব মিঠা পানির আধার লবণাক্ত হয়ে গেছে। এটা বন্যপ্রাণীদের জন্য মারাত্মক একটি ক্ষতি। সুন্দরবনে এবার যে  বন্যপ্রাণীগুলো মারা গেছে, তা ঝড়ের তাণ্ডবে মারা গেছে। কিন্তু এর পরের প্রতিক্রিয়া আরও বেশি মারাত্মক হবে। লবণ পানি পান করে আরও বহু বন্যপ্রাণী মারা যাবে। আবার অনেক প্রাণী সুপেয় পানির জন্য লোকালয়ে প্রবেশ করে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়বে।

তিনি বলেন, জরুরিভাবে সুন্দরবনের একটি সার্বিক জরিপ করা দরকার। সেখানে কী পরিমাণ বন্যপ্রাণী আছে—শুধু বাঘ, হরিণ নয়, অন্যান্য বন্যপ্রাণী কী আছে—তারও জরিপ করা দরকার। শুধু সুন্দরবন সুরক্ষাই নয়, জরিপ করে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদেরও সুরক্ষা করতে হবে। আর এই জন্য সরকারিভাবে বড় ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর জন্য আলাদাভাবে মন্ত্রণালয় করা দরকার। যারা শুধু সুন্দরবন, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করবে। এটা করা গেলে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মোহাম্মদ রকিবুল হাসান সিদ্দিকী বলেন, এবারের জলোচ্ছ্বাসের কারণে সুন্দরবনে বেশি মাত্রায় লবণাক্ত বেড়ে গেছে। যার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর। সুন্দরবনের যে জলাধারগুলোতে বন্যপ্রাণীরা মিঠা পানি খেতে আসত—এখন সেই জলাধারে আর তারা মিঠা পানি পাবে না। এটা বন্যপ্রাণীদের জন্য বড় ধরনের একটি ঝুঁকি তৈরি করবে।

তিনি আরও বলেন, ফলে মিঠা পানির জন্য বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীরা লোকালয়ের পাশের মানুষের হামলার শিকার হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, জলোচ্ছ্বাসের জন্য যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে হরিণ বা বন্যশূকর মারা গেছে। তবে বাঘ হচ্ছে—বিড়াল প্রজাতির।  ফলে জলোচ্ছ্বাসের সময় তারা হয়তো গাছে আশ্রয় নিতে পারে; অথবা তারা কোনো নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে ছিল। যে কারণে বাঘ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা কম। এর আগের ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময়ও বাঘ মারা গেছে কম। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে বেশি। তবে সামনে একটি সুবিধা আছে, তা হচ্ছে, আগামী জুন-জুলাইয়ে (বর্ষা মৌসুম) বৃষ্টির পানি পাওয়া যাবে। তখন লবণাক্ত পানি কমে যাবে। ফলে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের খুব একটা সুপেয় পানির সমস্যা থাকবে না।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, যেহেতু বন্যপ্রাণীরা মিঠা পানি খায়, স্বাভাবিকভাবেই সেই লবণ পানি মানুষের ক্ষেত্রে যে ধরনের ক্ষতিকর ঘটনা ঘটায়, মিঠা পানির অভাবে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের সেই একই অবস্থা হবে। মূলত মিঠা পানির অভাবে পানি শূন্যতাসহ যে শারীরিক সমস্যাগুলো তৈরি হওয়ার কথা তাদের ক্ষেত্রেও তা-ই হবে। তবে বন্যপ্রাণীরা তো প্রকৃতির জীব—ফলে কোনো না কোনোভাবে তারা প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবে। আর কিছু প্রাণী খাপ খাওয়াতে না পারলে তাদের শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা তৈরি হবে। এমনকি তারা মারাও যাবে।

ইত্তেফাক/এমএএম