শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত দেওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ

# বাংলাদেশের আবেদন প্রত্যাখ্যান মালয়েশিয়ার
# তালিকার কাজ শুরু করছে বায়রা

আপডেট : ০৬ জুন ২০২৪, ০৬:০০

টাকা দিয়েও যারা মালয়েশিয়া যেতে পারেননি তাদের অর্থ ফেরত দেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হিসেবে প্রায় ১৭ হাজার কর্মী টাকা দিয়েও যেতে পারেনি। ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা করে হলেও এই কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। যদিও বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি। শেষ মুহূর্তে এসে মালয়েশিয়া সরকার চাকরিদাতা ৪৭টি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে।

অন্যদিকে সেখানের বাংলাদেশি দূতাবাস ৫৩টি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। কালো তালিকাভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদাপত্র অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে কয়েক হাজার কর্মী যাওয়ার জন্য টাকা জমা দিয়েছিল। এদের সংখ্যা মন্ত্রণালয়ের তালিকার মধ্যে আসেনি বলে জানা গেছে।

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, ‘যারা টাকা জমা দিয়েও যেতে পারেননি, তাদের টাকা অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। কোন এজেন্সির মাধ্যমে কতজন টাকা জমা দিয়েছেন সেই তালিকা করতে মন্ত্রণালয় থেকে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে কে ক্ষমতাধর, আর কে ক্ষমতাধর না, সেটা দেখা হবে না। অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরত দিতে হবে।’

জনশক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনশক্তি রপ্তানি একমাত্র সেক্টর যেখানে এজেন্সিকে কোনো কর্মী সরকারি টাকা দেয় না। সবাইকে দালালের মাধ্যমে যেতে হয়। ফলে এজেন্সিগুলো অস্বীকার করলে কর্মীদের প্রমাণের সুযোগ নেই। এই কর্মীদের টাকা কীভাবে ফেরত দেবেন? জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) মহাসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বুধবার থেকে একেবারে টেবিল চেয়ার পেতে ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষাত্কার নেব। সবার কথা শুনব। এরপর এগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’

যে এজেন্সিগুলো টাকা নিয়েছে, তারা তো সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী। টাকা ফেরত দিতে না চাইলে আপনারা কি উদ্ধার করে দিতে পারবেন? কারণ কর্মীদের কাছে তো কোনো রসিদ নেই। জবাবে আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘আগে কাজটা শুরু করি। এখনই হতাশ না হই। এখনই যদি ধরে নেই যে টাকা উদ্ধার হবে না, তাহলে তো কিছুই করা যাবে না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য।’

এদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যে ১৭ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারেনি তাদের নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিল বাংলাদেশ। মঙ্গলবার সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটি। সিংগাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশ মালয়েশিয়া সরকারের কাছে আবেদন করেছিল যে, তারা প্রায় ১৭ হাজার কর্মীকে কাজের ভিসায় সে দেশে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এসব শ্রমিক মালয়েশিয়ার নির্ধারিত সময়সীমা ৩১ মের মধ্যে সে দেশে যেতে পারেননি। ফলে তাদের কোটা বাতিল করা হয়। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুসন ইসমাইল দেশটির সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের উত্তরে বলেন, যদি আপনি আমার কাছে জানতে চান, সময় বাড়ানো হবে কি না? উত্তর হবে, না। আমরা অনেক আগেই ৩১ মে সময়সীমা ঘোষণা করেছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেছেন, কোটা অনুমোদন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ ও ফ্লাইটের ব্যবস্থাসহ সমস্ত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া যত্নসহকারে বিবেচনা করে ঐ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন আর বাড়ানোর সুযোগ নেই।

কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে? জানতে চাইলে জনশক্তি রপ্তানি বিশেষজ্ঞ হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ‘বায়রা যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটি আপাতদৃষ্টিতে ভালোই মনে হচ্ছে। কারণ তারা চেয়ার টেবিল পেতে কর্মীদের কথা শুনবে। এরপর তারা ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে তালিকা তৈরি করবে। এখন যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, অবশ্যই তাদের টাকা ফেরত দিতে হবে। এক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থাও হতে পারে। কেউ যদি টাকা ফেরত না নিয়ে অন্য দেশে যেতে চান তাদের সেখানে যাওয়ার সুযোগ থাকলে ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ গরিব মানুষের কাছ থেকে নেওয়া টাকা কেউ যাতে মেরে খেতে না পারে সেদিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বায়রা যৌথভাবে কাজ করলে ভালো ফল মিলতে পারে।’

জানা গেছে, ২০২২ সালের পহেলা জুলাই থেকে গত ৩১ মে পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় যেতে ইচ্ছুক ৫ লাখ ২৬ হাজার ৬৭৩ জনকে অনুমতি দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এদের মধ্যে বিএমইটি ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৬৪২ জনকে। মালয়েশিয়ায় গিয়ে পৌঁছেছেন ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ জন। আর ৩১ মের মধ্যে যেতে পারেনি ১৬ হাজার ৯৭০ জন। একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন, মন্ত্রণালয় অভিবাসন খরচের যে লিমিট বেঁধে দিয়েছিল তা মানেনি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। তাদের কাছ থেকে এসব এজেন্সি ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা করে নিয়েছে।

বায়রা মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী আরও বলেন, ‘একটা মহল বাংলাদেশের এই শ্রমবাজার নষ্ট করার চেষ্টা করছে। মালয়েশিয়ার শেষ মুহূর্তের ভিসা ইস্যুই এই জটিলতা সৃষ্টি করেছে। ৩১ মে মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অথচ ২ জুন তারা ই-ভিসা ইস্যু করেছে। সেই কাগজও আমাদের কাছে আছে। তারা যদি ১৫ দিন আগে ভিসা বন্ধ করত তাহলে এই সংকটের সৃষ্টি হতো না। এই সংকটের জন্য আমাদের মন্ত্রণালয়েরও দায় আছে।’

ইত্তেফাক/এমএএম