বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

দখল ও ভরাটে শীর্ণকায় ভৈরব

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪, ০৩:০৬

যশোরের শিল্প, বাণিজ্য ও বন্দরনগরী নওয়াপাড়ার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। খুব কাছাকাছি থাকা স্থল ও রেলপথের সঙ্গে ভৈরব নদ যোগ হওয়ায় দেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য মোকাম আজ নওয়াপাড়া। কিন্তু যে নদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এত বড় মোকাম, সেই ভৈরব কিন্তু ধুঁকছে। দখল ও পলি ভরাটের কারণে শীর্ণ আকার ধারণ করেছে ভৈরব। দিনে দিনে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে নদটি।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, খুলনা থেকে নওয়াপাড়া পর্যন্ত ভৈরবের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪ কিলোমিটার। খুলনার মজুদখালী থেকে যশোর সদরের আফরা পর্যন্ত নওয়াপাড়া নৌবন্দরের দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার করে দুপাশে মোট প্রায় ৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে খুলনা থেকে শিরোমণি পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার ভৈরবের অবস্থা মোটামুটি ভালো। ভৈরবের সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নওয়াপাড়া নদীবন্দরের অভয়নগরের ভাটপাড়া থেকে মহাকাল শ্মশানঘাট পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা। ঐ এলাকায় নদের তীর জুড়ে গড়ে উঠেছে কয়েক শ ঘাট ও গোডাউন। ঐ এলাকায় সব সময় চলে নদ দখলের প্রতিযোগিতা। জাহাজ থেকে পণ্য নামানোর জন্য মটি, বালু, ইট ও সিমেন্ট দিয়ে গড়ে উঠেছে জেটিসহ শত শত কাঁচা, পাকা, আধা পাকা অবৈধ স্থাপনা। এদের মধ্যে আঞ্চলিক কর কমিশনারের ভাড়া করা কার্যালয়, নওয়াপাড়া হাইওয়ে থানার সীমানাপ্রাচীর, একটি অটো রাইসমিলসহ কয়েক জন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর গুদাম রয়েছে। নওয়াপাড়া মাছবাজার থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত এক কিলোমিটার ওয়াকওয়েটি নদের ভেতরে করা হয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষের দাবি। নদের গভীরতা না থাকায় পণ্যবাহী কার্গো জাহাজগুলো ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না। প্রায়ই সেগুলো ডুবে যায়। সূত্রমতে, গত এক বছরে ভৈরব নদে আট বার জাহাজডুবির ঘটনা ঘটেছে।

জানা গেছে, ২০০৬ সালে নওয়াপাড়াকে নদীবন্দর ঘোষণা দেওয়ার পর নদীবন্দরের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) হিসাব অনুযায়ী উপজেলায় ভৈরব নদের তীরে অবৈধ স্থাপনা ছিল ৮৬টি। ২০১৬ সালের অক্টোবরের মধ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ও বিআইডব্লিউটিএর সহযোগিতায় দুই ধাপে ৫৯টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর ২৫টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু উচ্ছেদের কিছুদিন পর নদের জায়গা দখল করে পুনরায় স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়। ফলে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা আবার ৮৬তে দাঁড়ায়। নদীবন্দর কর্তৃপক্ষ এরপর ২৯ ডিসেম্বর ২৬টি স্থাপনা উচ্ছেদ করে। এরপর ২০২২ সালের ১০, ১১, ১৬ ও ১৭ আগস্ট চার দিনে প্রথম দফায় ৬৩টি অবৈধ জেটি এবং ১৩ ডিসেম্বর দ্বিতীয় মেয়াদে ১২টি জেটি উচ্ছেদ করা হয়। চলতি বছরের ১৪ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি ২৪টি জেটি উচ্ছেদ করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউটিএর গত ৭ মার্চের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে ভৈরব নদে ৩৫টি অবৈধ জেটি এবং রড, সিমেন্ট, বালু দিয়ে নির্মিত একটি গাইড ওয়াল রয়েছে।

অভয়নগর নওয়াপাড়া পৌর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফাল্গুন মণ্ডল বলেন, পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য নদে নির্মিত জেটি এবং অবৈধ স্থাপনা করে নদ দখলে একদিকে ভৈরবের নব্যতা কমেছে, অন্যদিকে পলি পড়ে নদ ভরাট হচ্ছে। নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহজালাল হোসেন বলেন, নওয়াপাড়ায় প্রায় ৪০০ ব্যবসায়ী আছেন। তবে নদের অবস্থা ভালো নয়। নদ বাঁচাতে না পারলে এখানে ব্যবসা থাকবে না। ইতিমধ্যে এখানে গম আসছে না, চাল আসছে না, কয়লা আসা কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।

নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মো. মাসুদ পারভেজ বলেন, নওয়াপাড়া নদীবন্দরে ভৈরবের মূল চ্যানেল ঠিক রাখতে প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার এলাকায় মেইনটেনেন্স ড্রেজিং চলমান আছে। প্রতি বছর নদের দুপাশের অবৈধ জেটিসহ স্থাপনা উচ্ছেদ করার পরপরই ফের তা নির্মাণ করা হয়। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বাকিগুলো ম্যাজিস্ট্রেটের অভাবে হচ্ছে না। নির্বাচন শেষ হলে নদের মধ্যে থাকা সব স্থাপনা উচ্ছেদে পুনরায় অভিযান শুরু করা হবে। তিনি বলেন, সিএস রেকর্ড অনুযায়ী নৌবন্দর এলাকায় ভৈরব নদের সীমানা নির্ধারণ অতিব জরুরি। এ ব্যাপারে যশোর জেলা প্রশাসন ও নওয়াপাড়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। দ্রুত সিএস জরিপ মেনে যৌথভাবে নদের সীমানা নির্ধরণ করে নদ দখলমুক্ত করা হবে।

ইত্তেফাক/এনএন