শুক্রবার, ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
The Daily Ittefaq

পরিকল্পনার অভাবে অব্যবস্থাপনায় উড়ালসড়কের নিচের জমি

# অবৈধ থাকার ঘর, কাঁচাবাজার, গাড়ি পার্কিংয়ে দখল # খালি পড়ে আছে ২০৭ একর জমি # বছরে ক্ষতি প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা

আপডেট : ১০ জুন ২০২৪, ০৬:০০

কোথাও থাকার ঘর, কোথাও বিশাল বাজার, দোকান আবার কোথাও পড়ে আছে ময়লা আবর্জনা। রাজধানীর বেশির ভাগ উড়াল সড়কের নিচের চিত্র এটি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে অব্যবহৃত এসব জমিতে গড়ে উঠেছে বেশির ভাগ অবৈধ স্থাপনা। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজমের (সিআইএইউ) গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত মোট ১০৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এসব উড়ালপথের নিচে দখল-বেদখল, ব্যবহার-অব্যবহার ও অপব্যবহারে পড়ে আছে প্রায় ২০৭ একর জমি। যার কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা।

নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব জমিতে জনগণের জন্য পাবলিক টয়লেট, খেলার স্পেস, সবুজায়ন, হাঁটার পথ, জলাধারসহ নানা উপায়ে ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব। অথচ এটি নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। এসব স্থান হয়ে উঠেছে অপরাধী ও মাদকসেবীদের অভয়াশ্রম। সরেজমিনে রাজধানীর কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা, মহাখালী, মালিবাগ, মৌচাক, খিলগাঁও, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মগবাজার, গুলিস্তান, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে উড়াল সড়কগুলোর নিচের জায়গার দখল-দূষণের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে।

মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার ও মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে বেশ কিছু জায়গায় পার্কিং, অস্থায়ী কাঁচাবাজার, ময়লা ফেলার ভাগাড় এবং ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও অন্ধকারে ছিন্নমূল মানুষের থাকার জায়গা চোখে পড়েছে। কিছু কিছু জায়গায় নিম্নবিত্ত ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক সময় অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গাগুলোতে মাদকসেবন ও মাদক কেনাবেচা হয়। পথচারীদের জন্যও এটি নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কিছু কিছু জায়গায় বিক্ষিপ্তভাবে সবুজায়ন করতে দেখা গেছে। তবে সামগ্রিকভাবে এ নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই। ফলে বেশির ভাগ জমির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত হয়নি। হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে দখল করে দোকান ঘর তোলার কারণে সেখানে একবার আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে। যার কারণে ফ্লাইওভারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক জায়গায় আস্তরন খুলে পড়তে দেখা গেছে। এ এলাকা দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী এক পথচারী জানান, ফ্লাইওভারের নিচের কিছু অংশ বর্জ্যে পরিপূর্ণ থাকে আবার কিছু অংশ কাঁদামাটিতে পরিপূর্ণ। এছাড়া অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকান ও স্থাপনা তো আছেই। এ এলাকার সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে অবশ্যই ফ্লাইওভারের নিচেও নজর দিতে হবে সিটি করপোরেশনকে।

সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজমের নির্বাহী পরিচালক স্থপতি অধ্যাপক ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদ জানান, ফ্লাইওভার যেমন নগরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থাকে গতিশীল করছে, তেমনি এর নিচের জায়গাগুলোও গণপরিসর তৈরিতে ও জনকল্যাণমুখী কাজে ব্যবহার করার সুযোগ আছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বর্তমানে ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড স্ট্রাকচারের নিচের অংশে জনবান্ধব, টেকসই ও সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহার উপযোগী  কমিউনিটি জোন তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে থাকছে হাঁটাচলার পথ ও সাইকেলের লেন, নগর-কৃষি, বাগান, বনায়ন ও  খেলাধুলার ব্যবস্থা। কিছু জায়গায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শরীরচর্চা কেন্দ্র, সুইমিং পুল, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পথনাটক ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা নিম্নআয়ের মানুষেরা সম্পৃক্ত হচ্ছেন। উড়ালসড়কের মতো অবকাঠামোর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা। এ বিষয়ে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর খায়রুল আলম বলেন, এসব জমি অবশ্যই খালি পড়ে থাকবে না। এটিকে কীভাবে ব্যবহার উপযোগী করা যায়—সে বিষয়ে আমরা ব্যবস্থা নেব।

ইত্তেফাক/এমএএম