পুলিশের ঈদ আনন্দ

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৪, ০৫:৩০

পুলিশ সদস্য মেহেদী হাসান। গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। ঈদগাহে সকাল সাতটা থেকেই ডিউটি। তাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে ইউনিফরম পরেই তৈরি হতে হয়েছে। তবে নামাজ পড়তে নয়। সবাই যখন নামাজ পড়েন, তখন ঈদগাহে সশস্ত্র অবস্থায় দায়িত্ব পালন করেন মেহেদী। এবারের ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া হবে না তার। বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান আছেন বাড়িতে। অভিমানী সন্তানদের কীভাবে মানাবেন, তা জানেন না তিনি। কিন্তু পেশাটাই এমন যে, এখানে দেশের জন্য দায়িত্ব পালনে আবেগের কোনো সুযোগ নেই।

শাহাদাত হোসেন। নিজ জেলা মুন্সীগঞ্জ জেলায়। প্রথম সন্তান হয়েছে মাস খানেক হলো। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে যেতে পারছেন না। কারণ, কোরবানির পশুর হাটকেন্দ্রিক নিরাপত্তায় শুরু থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন। নিজ ইউনিটে জরুরি দায়িত্ব ব্যতীত যারা হাজির ছিলেন, তাদের কারো কারো ছুটি হলেও শাহাদাতের ছুটি হয়নি। শিশু সন্তানের প্রিয়মুখ মোবাইলে দেখে দেখেই প্রাণ জুড়ায়।

জেলা বিশেষ শাখা (ডিএসবি)-তে কাজ করেন নুরুল ইসলাম। স্থায়ী ঠিকানা মাগুরা জেলা। বাড়িতে বয়োবৃদ্ধ বাবা-মা রয়েছেন। নিজের বয়সও কম হয়নি। ঈদের দিন সাদা পোশাকে নজরদারির দায়িত্ব পড়েছে এলাকায়। তাই ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না নুরুলের। কিন্তু সবার মতো তারও পরিবারের জন্য মায়া আছে, আছে কাছে যাওয়ার ব্যাকুলতা!

মূলত সারা দেশ যখন উত্সবমুখর ঈদের আনন্দে ভাসছে, পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে ছুটছে নাড়ির টানে; ঠিক তখনই মেহেদী, শাহাদাত, নুরুলের মতো দিনে ও রাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বাংলাদেশ পুলিশের প্রতিটি অপারেশনাল ইউনিটের সদস্যগণ। নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন ঘরমুখো সাধারণ মানুষের যাতায়াত অবাধ ও নিরাপদ করার প্রয়াসে। সবাই যখন ঈদ আনন্দে ব্যাকুল, আপনজনের কাছে ফেরার জন্য করছে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা; একই সময়ে তাদের আনন্দকে নির্বিঘ্ন করতে নিজেদের পরিবার-পরিজনকে দূরে রেখে সেবা প্রদানে সচেষ্ট বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা।

স্ব স্ব অপারেশনাল ইউনিটে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের কেউ সড়ক, নৌ ও রেলপথে, কেউ ঈদগাহ-মসজিদে, কেউ মার্কেট-শপিংমলে, কেউ গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনায়, কেউ অপরাধী ধরতে কিংবা অপরাধ ঠেকাতে দায়িত্ব পালন করেন। মূলত এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের নিরাপত্তা দেওয়াটাই তাদের মুখ্য বিষয়। নিজের ও পরিবারের আনন্দ অনেকটাই গৌণ। তখনই ভালোলাগার অনুভূতি জাগে, যখন জনগণ সন্তুষ্ট হন। তখনই নিজেকে সার্থক মনে হয়। চাকরির শুরুতে পরিবারের জন্য মন খারাপ হয়, কিন্তু ধীরে ধীরে একসময় সব সয়ে যায়।

এরকম গল্প বাংলাদেশ পুলিশের প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার ৭২৪ জন সদস্যের প্রত্যেকেরই। কারণ প্রতি বছরই এ ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় উত্সব, বিশেষ করে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহায় বাংলাদেশ পুলিশের অপারেশনাল ইউনিটের মোট জনবলের ২০ ভাগ-২৫ ভাগ সদস্য ঈদ অনুমতি ছুটির সুযোগ পান। অবশিষ্ট ৭৫ ভাগ থেকে ৮০ ভাগ জনবল অসুস্থতা, প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন এবং নিয়মিত ডিউটির পাশাপাশি বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। আবার চাইলেও এর বেশি ছুটি দেওয়ার সুযোগ থাকে না। কারণ বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা অপ্রতুল। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিপরীতে পুলিশ সদস্যের অনুপাত ১ঃ৮০০। এতে সহজেই অনুমেয় যে, জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা কতটা কষ্টের!

বাংলাদেশ পুলিশ বাংলাদেশের অন্যতম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। তাই তো শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, প্রগতির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ পুলিশের সেবাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধযোদ্ধা এবং করোনাকালীন সম্মুখ-যোদ্ধা বাংলাদেশ পুলিশের অকুতোভয় সদস্যদের চব্বিশ ঘণ্টার সতর্ক দৃষ্টি আর আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই জনসাধারণের স্বাভাবিক এবং নিরাপদ জীবনযাপন সম্ভব। আর এ কারণেই সবার মতো ঈদ আনন্দ আসে না পুলিশের জীবনে।

সড়ক ও মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশ; বাস স্টেশন, রেল স্টেশন ও নৌঘাটে পুলিশ; বাসস্থান, শপিংমল, মার্কেট, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, টুরিস্ট স্পটের নিরাপত্তায় পুলিশ; চুরি, ডাকাতি, দস্যুতা, অজ্ঞানপার্টি, মলমপার্টি, জালটাকা, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ; গার্মেন্টস, শিল্পকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বয় সাধনে পুলিশ; বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিঘ্নকারী তথ্য, গুজব, পোস্ট, মন্তব্যের আলোকে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ; জঙ্গি, সন্ত্রাসী, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রোধে পুলিশ; রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, স্থাপনা, আদালত প্রাঙ্গণ, গার্ড/কেপিআই নিরাপত্তায় পুলিশ; বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন, অর্থ পরিবহন, রাষ্ট্রীয় আয়োজনের নিরাপত্তায় পুলিশ। এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও গুরুদায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ পুলিশ।

বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যগণ চব্বিশ ঘণ্টাই মাঠে থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। কারণ, পুলিশ আইন, ১৮৬১ (১৮৬১ সালের ৫ নম্বর আইন)-এর ২২ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘এই আইনের উদ্দেশ্য, প্রত্যেক পুলিশ কর্মচারী সর্বদা কার্যরত (on duty) বলিয়া বিবেচিত হইবে এবং যে কোনো সময় জেলার যে কোনো স্থানে তাহাকে পুলিশ অফিসার হিসাবে নিযুক্ত করা যাইবে।’ সংবিধানের ২১(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ কিন্তু, কখনো কি অনুভব হয়েছে যে, নীলাভ পোশাকের আড়ালেও রয়েছে একটি রক্তমাংসে গড়া শরীর। সেখানে সাধারণ মানুষের মতোই রক্তের ধারা প্রবাহিত হয়। সে রক্তেও আবেগ আছে, ভালোবাসা আছে, আছে সীমাহীন দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার। জীবনের সোনালি দিনগুলো এভাবেই চলে যায়। 

পুলিশ ভুলে যায় প্রিয়জনদের ঘিরে বিভিন্ন উত্সবমুখর দিনগুলোর কথা। একগুচ্ছ মান-অভিমান সামলে প্রতিশ্রুতি দেয় পরবর্তী আয়োজনে শামিল হওয়ার। মানুষের নিরাপত্তাই মূলত তাদের কাছে আনন্দের। সবাই যখন ঈদের জামাতে, পাশেই দাঁড়িয়ে তারা সতর্ক অবস্থায়। সবাই যখন ঈদের আনন্দে মত্ত, তখন তারা মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার কাজে ব্যস্ত। ঈদের নতুন পাঞ্জাবি বা জামাটাও হয়তো রয়ে গেছে ব্যারাকের লকারে। সেদিকে তাকানোর ফুরসত কোথায়! জনগণের নিরাপত্তাই সবার আগে। উত্সবকালে মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, ছেলে-মেয়ে কিংবা পরিবার-পরিজনের স্নেহ-মায়া-মমতা আর ভালোবাসাবঞ্চিত পুলিশ সদস্যরা ঈদ আনন্দ উপভোগ করেন সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দের মধ্যেই।

লেখক: পুলিশ সুপার, নৌ-পুলিশ, সিলেট অঞ্চল

ইত্তেফাক/জেডএইচ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন