যেই দৃষ্টান্ত তৈরি হইল, তাহার ক্ষতি সুদূরপ্রসারি

আপডেট : ২১ জুন ২০২৪, ০৩:৫৭

এই সভ্য পৃথিবী আমাদের কিছু সুন্দর শব্দ শিখাইয়াছে। যেমন—গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, গুড গভর্নেন্স ইত্যাদি। এই শব্দগুলি শুনিতে ভীষণ ভালো; কিন্তু বিশ্ব জুড়িয়া এই শব্দগুলির নামে যাহা চলিতেছে, তাহাকে প্রহসন ছাড়া আর কী বলা যাইতে পারে? সেই ‘কতিপয়’ শব্দের মতো এই শব্দগুলি শুনিতে ভালো লাগে; কিন্তু ভালো লাগিলেও সকল জায়গায় যদি ‘কতিপয়’ বসাইয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে বিপন্ন হয় নিজের পরিচয়। তখন ‘পিতা’ হইয়া যাইতে পারে ‘কতিপয় পিতা’—যেমনটি এক অর্ধশিক্ষিত ছাত্র তাহার পিতাকে লিখিয়াছিল, ‘কতিপয়’ শব্দের মোহে পড়িয়া।

যথার্থ অর্থে, প্রকৃত গণতন্ত্র এখন সোনার পাথরবাটি, অধিকাংশ দেশেই নির্বাচন কমবেশি ম্যানুপুলেট হয়। তবে নির্বাচনে কে কীভাবে ক্ষমতায় আসীন হইলেন বা রহিলেন, সেই প্রশ্ন তুলিবার ধৃষ্টতা দেখাইবার পূর্বে সচেতন পর্যবেক্ষকরা বরং চিন্তিত নির্বাচন-পরবর্তী পুলিশের ভূমিকা লইয়া। কোথাও কোথাও ক্ষমতার দাপট-প্রভাব-প্রতাপ এবং প্রতিপত্তির উত্তাপ বিপজ্জনকভাবে প্রকাশ পাইতেছে ক্ষমতাসীনদের নীতি-কৌশলে। তাহারা মাস্তান রাখে। তবে মাস্তান তো চাহিলেই মাস্তানি করিতে পারে না। যদি পুলিশ পাশে থাকে, তাহা হইলে মাস্তানের ইশারাই হইয়া যায় পুলিশের জন্য নির্দেশনা। পুলিশ এখন কাহার বিরুদ্ধে মামলা দিবে, কাহাদের শাসাইবে, তাহা ঠিক হইতেছে মাস্তারদের অঙ্গুলিহেলনে। দেখা যাইতেছে, তৃতীয় বিশ্বের কোথাও কোথাও প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ লইয়া দলীয় কর্মীর মতো ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ যাহা দলীয় ক্ষমতায় করা সম্ভব নহে, তাহা প্রশাসনের মাধ্যমে করিয়া নেওয়া হইতেছে। এইভাবে অনেক জনপদে নষ্ট হইতেছে ‘দ্য বিউটি অব দ্য ইলেকশন’ এবং ‘দ্য বিউটি অব ডেমোক্রেসি’। প্রশ্ন হইল, ব্যুরোক্রেসির একটি বৃহৎ অংশ যদি দলীয় কর্মিবাহিনীর মতো কাজ করে, তাহা হইলে ব্যুরোক্রেসি কেন সৃষ্টি হইল? ব্যুরোক্রেসির কাজই তো নিরপেক্ষ থাকা। নচেৎ গণতন্ত্র হইয়া উঠে যন্ত্রণা। কারণ গণতন্ত্রের মূল্যবোধ, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, সততা, আইনানুগতা এবং দক্ষতা—এই সকল কিছু মিলিয়া ‘গুড গভর্নেন্স’ তৈরি হয়।

কিন্তু ক্ষমতার মদমত্ত সাংঘাতিক জিনিস। তৃতীয় বিশ্বের কোনো কোনো দেশে জনগণের জন্য বিভিন্ন জনহিতৈষী প্রকল্প আর অর্থের নহর বহিয়া যাইতেছে! কিন্তু বাস্তবে দেখা যাইতেছে—সেই অর্থ চলিয়া যাইতেছে গুটিকয়েক গোষ্ঠীর হাতে। সরকারের তথা জনগণের অর্থের যত লুটপাট হইতেছে, তাহা কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যেই ঘুরাফেরা করিতেছে, জনগণের নিকট এই অর্থের সুফল পৌঁছাইতেছে না। স্বনামধন্য ফরাসি পণ্ডিত মন্টেস্কু তাহার ‘দ্য স্পিরিট অব দ্য লজ’ গ্রন্থে স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন—‘অভিজ্ঞতা আমাদের অনবরত দেখাইতেছে যে—প্রত্যেক ব্যক্তি, যাহার হাতে ক্ষমতা রহিয়াছে, তিনি তাহা সুকৌশলে অপব্যবহার করিয়া চলেন এবং তাহাকে রুখিয়া না দেওয়া পর্যন্ত তিনি তাহার কর্তৃত্বপরায়ণতা বজায় রাখিয়া চলেন।’ 

বস্তুত, ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করিবার আকাঙ্ক্ষায় আইন ও নিয়মনীতি এবং জনহিতৈষীকে বিসর্জন দিয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশকে কাজে লাগাইয়া যাহা করা হইতেছে, তাহা গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্য, বিশেষ করিয়া তৃতীয় বিশ্বের গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত বহন করিতেছে। কারণ, ইহার ফল ভোগ করিতে হইবে সকলকে। এইভাবে এক বার দুই বার তিন বার কিংবা আরও অনেক বার হয়তো ক্ষমতা ধরিয়া রাখা যায়; কিন্তু গণতন্ত্রের খাল কাটিয়া যেই কুমির প্রবেশ করানো হইতেছে, তাহার অপূরণীয় ক্ষতি কোটি কোটি মানুষকে যুগ যুগ ধরিয়া বহন করিতে হইবে। সামান্য কয়েকটি জমানায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করিতে যেই বিষবৃক্ষের চাষ করিতে হয় তাহাতে যেই লোকক্ষয়, রক্তক্ষয়, সম্পদ ক্ষয় হইবে—তাহার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। যেই দৃষ্টান্ত তৈরি হইল, তাহার ক্ষতি সুদূরপ্রসারী। ক্ষমতায় আসা-যাওয়া তো মহান আল্লাহ তাআলার হাতে। তিনি যাহাকে ইচ্ছা তাহা দান করেন। তিনি বলিয়াছেন—ধৈর্য অবলম্বন করিতে, দৃঢ়তা প্রদর্শন করিতে, নিজেদের প্রতিরক্ষাকল্পে পারস্পরিক বন্ধন মজবুত করিতে। তৃতীয় বিশ্বের জনগণের জন্য ইহাই প্রধান দিশা।

 

ইত্তেফাক/জেডএইচ