আমাদের দেশে শুধু মানুষ নয়, ছাগলও মাঝেমধ্যে আলোচনার খোরাকে পরিণত হয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলছে ঢাকার সাদিক এগ্রোর একটি ছাগল নিয়ে। কোরবানির পশুর হাটে ভাইরাল হওয়া অনেক পশুর মধ্যে আলোচনায় রয়েছে ১৫ লাখ টাকার একটি খাসি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঐ খাসি ও তার ক্রেতা ইফাত নামের এক তরুণকে নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা। অনেকের মতে, ইফাত নামে এক যুবক ঐ ছাগলটি ১২ লাখ টাকায় কিনেছে। ঐ যুবকের পিতার নাম মতিউর রহমান, যে রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা।
ওদিকে মতিউর রহমান বলছেন, এই ইফাত তার ছেলে না। তাকে তিনি চেনেনও না।
সাদিক এগ্রোর মালিক বলছেন, ছাগল এখনো বিক্রিই হয়নি। ইফাত নামের এক তরুণ ১ লাখ টাকা বায়না দিছে মাত্র, বাকি টাকা পরিশোধ করেনি, ছাগলও নেয়নি। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো তোলপাড় চলছে। অনেকে ছাগলটির পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা মতিউর রহমান যদি ঐ ছাগল ক্রেতা ইফাতের পিতা না হন, তাহলে তার পিতা আসলে কে? কেউ কেউ এমনও প্রশ্ন করছেন, ছেলে তুমি কার?
এনবিআরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের সভাপতি মতিউরকে ‘বাবা’ সম্বোধন করে ইফাতের পোস্ট এবং মতিউর রহমানের সঙ্গে তার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসছিল কয়েক দিন ধরে। তবে এখন তার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন দাবি করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও রিফাতের কথিত পিতা দিয়েছেন মতিউর রহমান। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচরণকারী মানুষ বড়ই পেরেশানিতে আছে!
এ রহস্যের জট কবে খুলবে, আদৌ খুলবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
ছাগল অবশ্য যুগ যুগ ধরেই আমাদের সমাজে আলোচিত। ছাগল নিয়ে আমাদের দেশে অনেক গল্প ও কৌতুক চালু আছে। প্রথমেই একটি কৌতুক শোনা যাক।
শিক্ষক :সুমন, বলো তো কী খেলে আমাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি বেড়ে যায়?
সুমন :এর তো সহজ উত্তর আছে স্যার। ঘাস এবং লতাপাতা।
শিক্ষক :আমার সঙ্গে ফাজলামো করা হচ্ছে, তাই না! জোর বকা খাবে এই বার।
সুমন (কাঁদো কাঁদো হয়ে) : স্যার, ফাজলামো করব কেন! ছাগলের চোখের দিকে একটু খেয়াল করে দেখুন, ওরা কি চোখে চশমা পরে!
ছাগল নিয়ে এমনিতেই আমাদের দেশের মানুষের এক ধরনের নেতিবাচক মানসিকতা আছে। ‘ছাগলে কী না খায়’—বলে এই নিরীহ প্রাণীর ওপর মানুষ কলঙ্কও আরোপ করেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ছাগল অনেক অখাদ্য, কুখাদ্য খেলেও অনেক কিছুই খায় না। যেমন কোনো দিন কোনো ছাগলকে মাংস খেতে দেখা যায়নি। বরং ছাগলের মাংস তো আমরা খাই। ছাগল কখনো ঘুষ খায় না, যা আমরা খাই। ছাগল কখনো ছয় ইঞ্চি কাঁটাওয়ালা ক্যাকটাস খায় না। এই ‘স্পেশাল ডিশ’টি খাওয়ার মতো হিম্মত এই পৃথিবীতে এক জনেরই আছে। তার নাম উট। যা হোক, জগত্-সংসারে এমন কিছু লোক আছেন, যারা এতটাই নিরীহ প্রকৃতির যে তাদের আপনজন তাদের স্নেহবশত ‘ছাগল’ আর স্নেহের আধিক্য হলে ‘রামছাগল’ বলে অভিহিত করতে কার্পণ্য করেন না।
হ্যাঁ, ছাগল আমাদের দেশের অতিপরিচিত গৃহপালিত পশু। পরিসংখ্যান অনুসারে, পৃথিবীতে ছাগল উত্পাদনের দিক থেকে আমরা চতুর্থ এবং এই উত্পাদনের সিংহভাগ কিন্তু আসে গ্রামের গরিব জনসাধারণ, বিশেষত যেসব নারীকে আমরা ‘বেওয়া’ বলে অভিহিত করে থাকি, তাদের থেকে। তাই এদের সাহায্যার্থে এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছাগল প্রদান প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু এ দেশে নিন্দুকের অভাব নেই। প্রকল্পটিও আর বেশি দূর এগোয়নি।
ছাগলের চামড়া অধিক মূল্যবান আর দুধও খুব উপকারী। মহাত্মা গান্ধী সব সময় ছাগদুগ্ধ খেতেন এবং এতদুদ্দেশ্যে তার দুটি ছাগল সদা সঙ্গী থাকত। লেখক আতাউর রহমানের মতে, ’৪৭-এর দেশ বিভাগের পর সাম্প্রদায়িক বিবাদের কারণে তিনি ছাগল দুইটি সমেত আমাদের নোয়াখালীতে এসেছিলেন। দুষ্ট লোক সব জায়গায়ই আছে, কিছু দুষ্ট লোক তার ছাগলগুলো চুরি করে নিয়ে খেয়ে ফেলেছিল।
তা নোয়াখালী বলতে মনে পড়ে গেল, ওখানে দুটি জায়গার নাম ছাগলনাইয়া ও পরশুরাম। একবার হয়েছে কি, ঐ দুই জায়গায় আমাদের ডাকঘরের দুই কর্মচারী একটি পত্রের বিলি প্রসঙ্গে অনেক চিঠি চালাচালির পর একজন অন্যজনের উদ্দেশে নাকি লিখেছিল, ‘আমি ছাগলনাইয়ার ছাগল আর তুমি পরশুরামের পশু, এবারে ক্ষান্ত দেই।’
আর পাঁঠা বলতেও মনে পড়ে গেল, পাঁঠার গায়ে কিন্তু অনেক গন্ধ। কিন্তু পাঠানেরা কদাচিত্ গোসল করে বিধায় তাদের গায়ের গন্ধ নাকি পাঁঠার গায়ের গন্ধকেও ছাড়িয়ে যায়। পাকিস্তান আমলে গল্প শোনা যেত : একজন বাঙালি, একজন পাঞ্জাবি ও একজন পাঠান বাজি রেখে পাঁঠার সঙ্গে পরপর ঘুমাতে গিয়ে বাঙালি ১০ মিনিট ও পাঞ্জাবি ১৫ মিনিট পরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিল, কিন্তু পাঠানের প্রবেশের পর আধা ঘণ্টার মাথায় পাঁঠাই বেরিয়ে এলো!
আমরা কথায় কথায় ছাগলকে অপমান-অবজ্ঞা করলেও ছাগলকে আসলে ভালোবাসি। আর ভালোবাসি বলেই আমরা আমাদের জাতীয় ফল হিসেবে কাঁঠালকে বেছে নিয়েছি। কাঁঠালগাছে দেশটা ভরে গেলে এই দেশ ভরে যাবে ছাগলে—এ রকম একটা ভাবনা কি আমাদের মনে সঙ্গোপনে ছিল? হতেও পারে। তা না হলে দেশ স্বাধীন হওয়ার এত বছর পর ছাগল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে কেন?
তবে আমাদের দেশি জাতের ছাগল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট বা কালো ছাগলের মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু। এই ছাগল নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে, তার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ে সফলতা এসেছে, দেশে-বিদেশে এই ছাগলের বাণিজ্যিক খামার রয়েছে। এখন যেটা সবচেয়ে বেশি দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, তা হলো—দেশি ছাগলের জাত সংরক্ষণ করতে হবে। সেটা করতে হলে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার মিলন ঘটাতে হবে।
পরিশেষে ছাগল নিয়ে একটি পুরোনো গল্প।
ব্রাহ্মণ তার এক শিষ্যের কাছ থেকে একটি ছাগল উপহার পেলেন। তিনি ছাগলটিকে তার কাঁধে চড়িয়ে বাড়ি নিয়ে আসছিলেন।
পথে তিন শঠ লোকের দৃষ্টি পড়ল ব্রাহ্মণের কাঁধের ছাগলটার ওপর। তারা ছাগলটি দিয়ে ভোজের আয়োজন করবে বলে ফন্দি আঁটল। এক শঠ মিহি স্বরে বলল, ‘পণ্ডিতজি, আপনি কুকুরটিকে কাঁধে চড়িয়ে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?’ ব্রাহ্মণ চেঁচিয়ে বললেন, ‘কী সব বাজে বকছ? এটা কুকুর কেন হবে? আমার কাঁধে তো আস্ত একটা ছাগল। তুমি কি অন্ধ?’ শঠ লোকটি যেতে যেতে বলল, ‘আপনার মতো জ্ঞানীজন যদি কুকুরকে ছাগল বলেন তাহলে আমার কিছু বলার থাকে না।’
ব্রাহ্মণ শঠ লোকটিকে বকতে বকতে বাড়ির পথে এগোতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় শঠ ব্রাহ্মণের মুখোমুখি হলো। সে বলল, ‘মহাশয়, আপনি একজন সম্মানীয় পুরোহিত। কেন আপনি একটি কুিসত কুকুরকে কাঁধে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন? এটা আপনার মর্যাদার সঙ্গে মানানসই নয়।’ এবারে ব্রাহ্মণ রেগে আগুন হয়ে গেলেন। রাগত স্বরে বললেন, ‘কে বলেছে এটা কুকুর? তোমার যদি চোখ থাকে তবে ভালো করে দেখো। এটা একটা ছাগল।’ শঠ লোকটি কণ্ঠে ঝাঁজ মিশিয়ে বলল, ‘আপনি ওটাকে ছাগল, গরু কিংবা হরিণ—যা-ই বলুন না কেন, আসলে ওটা একটা কুকুর বই কিছু নয়।’ এ কথা বলে সে হনহন করে হেঁটে চলে গেল।
এবারে ব্রাহ্মণ কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, একে অপরের কাছে অপরিচিত দুই ব্যক্তি কি একই রকম ভুল করতে পারে? তবে তা সত্ত্বেও তিনি সেটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেন। ওটাকে বাড়িতে নিয়ে ভালোভাবে পরখ করা যাবে।
সহসা তৃতীয় শঠ দেখা দিল। সেও ব্রাহ্মণকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কুকুরটিকে কাঁধে নিয়েছেন কেন পুরুত মশাই? লোকে আপনার সম্পর্কে কী ভাবছে বলুন দেখি?’
এবারে ব্রাহ্মণের মনে সন্দেহ রইল না যে কোথাও কোনো গলদ রয়েছে। ঐ তিন ব্যক্তির সবাই মিথ্যাবাদী হতে পারে না। তিনি নিশ্চয়ই একটি কুকুরই বহন করে চলেছেন।
অবশেষে তিনি চরম বিরক্তির সঙ্গে ছাগলটিকে কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে ছেড়ে দিয়ে শূন্য হাতে বাড়ির পথ ধরলেন। আড়াল থেকে বিষয়টি দেখে শঠেরা আনন্দে আত্মহারা।
এদিকে ছাগলটি ছাড়া পেয়ে মাঠে সবুজ ঘাস খেতে লেগে গেল। ব্রাহ্মণ চোখের আড়াল হতেই তিন শঠ একসঙ্গে ছাগলের কাছে ছুটে এলো। তারা ছাগলের মাংসে ভূরিভোজন করবে বলে আনন্দে ডগমগ!
ছাগল নিয়ে এই শঠতা আমাদের দেশে যুগ যুগ ধরেই চলছে!
লেখক: রম্যরচয়িতা
