ছাগলকাণ্ডে আলোচনায় আসার পর থেকেই ব্যাপক অর্থ-সম্পদ ও দুর্নীতিতে অভিযুক্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদ্যসাবেক সদস্য মতিউর রহমানকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন বাসভবনে খোঁজ নিয়েও সন্ধান মেলেনি তার। এমনকি ঈদের ছুটির পর অফিস খুললেও আর অফিসে আসেননি। যাচ্ছেন না নতুন অফিসেও।
প্রভাবশালী সিন্ডিকেট 'ম্যানেজ করে' তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে গুঞ্জন উঠেছে। সম্প্রতি আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে তার দেশ ছাড়ার খবর সূত্রের বরাতে জানিয়েছে একটি জাতীয় গণমাধ্যম।
খবরে জানানো হয়েছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী মতিউর রহমান ভারত থেকে সরাসরি দুবাইয়ের উদ্দেশে রওনা দিতে পারেন। প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট তাকে দেশত্যাগে সহযোগিতা করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অল্প সময়ে ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় আতঙ্কে ছিলেন মতিউর রহমান। তবে ওই সিন্ডিকেটের পরামর্শেই তিনি মাথার চুল ফেলে টাক হয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যান। মূলত সবার কাছ থেকে চেহারা আড়াল করতে এই কৌশল।
এর আগে ধানমণ্ডি, কাকরাইল, গুলশানসহ মতিউরের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের ঠিকানায় বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে গণমাধ্যমটি।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি এই কর্মকর্তা দুর্নীতির মাধ্যমে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। এরই মধ্যে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য জানতে মাঠে নেমেছে। প্রাথমিকভাবে অনেক সম্পদের তথ্যও পাওয়া গেছে।
পূবাইলের খিলগাঁও মৌজায় ৫৫ বিঘা জমিতে মতিউর রহমানের রয়েছে আপন ভুবন পিকনিক অ্যান্ড শুটিং স্পট। এই রিসোর্টে ১০০ টাকার টিকিট কেটে যে কেউ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরতে পারেন। নাটক, সিনেমার শুটিংয়ের জন্য ভাড়া দেওয়ার বাইরেও এখানে আছে অবকাশ যাপনের সুযোগ।
মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকির নামে নরসিংদীর রায়পুরার মরজালে শতবিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে লাকি পার্ক নামে আলিশান রিসোর্ট, যার বর্তমান নাম ওয়ান্ডার পার্ক। এই পার্ক তৈরি করতে গিয়ে জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শাশুড়িকেও করে দিয়েছেন বিশাল বাড়ি।
এমন সব তথ্য সামনে আসতে থাকলে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের সভাপতি পদ থেকে মতিউরকে সরিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়। তিনি হারিয়েছেন সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদও।
মতিউর রহমানের উত্থান মূলত ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার থাকাকালে। পরে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জায়গায় পদায়ন হয়েছে তার। এছাড়া দায়িত্ব পালন করেছেন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ভ্যাটের কমিশনার হিসেবে। সেই সময় বিভিন্ন কম্পানিতে ভ্যাট ডিমান্ড করে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমন একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মতিউরের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের জন্য এনবিআর ও দুদককে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তবে রহস্যজনক কারণে বিষয়টি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংস্থা দুটি।
প্রসঙ্গত, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের খবর প্রকাশের পর পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদসহ অনেকেই ইতোমধ্যে দেশ ছেড়েছেন। অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর সামনে আসলেই কর্মকর্তারা চলে যাচ্ছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কেউ আগেই চলে যাচ্ছেন বিদেশে, কেউ খবর পেয়ে যাচ্ছেন পালিয়ে।
