চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ব্যবসায়বঞ্চিত কেন?

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৪, ০৪:৫২

দুনিয়ার বহু দেশের বড় বড় এয়ারপোর্ট থেকে উড্ডয়ন এবং সেখানে অবতরণের অভিজ্ঞতা আছে আমার। আজকাল আমরা সবাই এদেশ-ওদেশ ঘুরে বেড়াই। ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য দুনিয়া এখন অবারিত। ছোট-বড় যে কোনো বিমানবন্দরের চেয়ে আমার প্রিয় এয়ারপোর্ট চট্টগ্রামের শাহ আমানত (র.) বিমানবন্দর। ছোট হলেও এর বুকে আমার অনেক স্মৃতি জমা আছে।

জীবনের প্রথম বিমানভ্রমণ, স্বাধীনতার পরপর  কলকাতা থেকে আগরতলায় যাওয়া। স্বাধীন দেশে ফেরত আসার সূচনালগ্নে এটাই ছিল প্রথম আকাশভ্রমণ। এরপর কলকাতা, যশোর, ঢাকা—সব ভ্রমণের উত্স ছিল চট্টগ্রাম বিমানবন্দর। একসময় পতেঙ্গার ছোট এয়ারপোর্টটি স্থানান্তরিত হয়ে আকারে বড় হয়েছে। বিমান চলাচলও বেড়েছে। এখন এর কার্যক্রমে গতি এসেছে। আমাদের সময় বড়জোর দুটি বিমান সকাল-সন্ধ্যা ঢাকা দৌড়াত। সপ্তাহে এক বার যেত কলকাতা। এখন সেসব সংখ্যায় অনেক বেশি। নান্দনিক গাছপালাশোভিত ঢোকার রাস্তাটিও ভালো লাগে। ঢুকে পড়লে হয়রানি নেই। আগের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বিলম্বিত যাত্রাও নেই। মাঝেমধ্যে সেসব হলেও সাধারণত যাত্রা সহজ ও নির্বিঘ্ন।

আমার স্বপ্ন ও স্মৃতিতে মিশে থাকা এই বিমানবন্দরের জায়গা হূদয়ে। কিন্তু আজ আমি একটি সমস্যার কথা বলতে চাই। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, আমরা ব্যাংকক থেকে চেংমাই হয়ে চট্টগ্রাম এসে নামতে পারতাম। মধ্যে এমনও হলো, থাই এয়ারের পাশাপাশি সিংগাপুর এয়ারলাইনসের সিস্টার্স কনসার্ন সিল্ক এয়ারের চমত্কার ফ্লাইটগুলো চলত চট্টগ্রাম থেকে। আমেরিকা ইউরোপ অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ডসহ নানা দেশের প্রবাসীরা অনায়াসে চট্টগ্রাম পৌঁছে যেতেন। হঠাত্ করেই এগুলো বন্ধ হয়ে গেল। কিছু বছর আগে রিজেন্ট এয়ার নামে একটি বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থার বিমান চলত থাইল্যান্ড থেকে। তারা এখন ব্যবসায়ে নেই। সব মিলিয়ে আমরা যারা দূরদেশ থেকে চট্টগ্রাম যাই, আমাদের কপালে জোটে দুর্ভোগ আর সময়ের অপচয়।

প্রবাসীরা দেশে যান একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এবং ছুটিও সেভাবেই নেওয়া থাকে। কষ্টার্জিত দুই-তিন সপ্তাহের ছুটির দুই-তিন দিন যদি অকারণে যাত্রাপথে চলে যায়, এর চেয়ে দুঃখের আর কিছু হতেই পারে না। আমাদের এবারের যাত্রায়ও তেমন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। তড়িঘড়ি ছুটি ম্যানেজ করে ঢাকা পৌঁছানোর পর তিন দিন আটকে থাকতে হয়েছিল; রাস্তায় পানিবদ্ধতা আর ঝড়ের কারণে। জানি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ওপর কারো হাত নেই। কিন্তু যাত্রা যদি চট্টগ্রাম পর্যন্ত হতে পারত, আমরা অনায়াসে বাড়ি পৌঁছে যেতে পারতাম।

শুধু তা-ই নয়, প্রবাসীদেরও দুর্ভোগে পড়তে হয় সঙ্গে থাকার মালপত্রের কারণে। প্রিয়জনদের জন্য তারা আনেন না কিংবা বয়ে নিয়ে যান না, এমন বস্তু বিরল। বড় বড় সব সুটকেস আর ব্যাগ দেখলেই আপনি হাঁপিয়ে মরবেন। এসব বড়সড় ব্যাগ আর ট্রলি ব্যাগ নিয়ে ঢাকায় কারো বাড়িতে অতিথি হওয়াটা লজ্জার মনে হতেই পারে। সবার তো ঢাকায় নিকটাত্মীয়ও থাকে না। বলবেন, হোটেলে নয় কেন? দেশে গিয়ে বাড়ি পৌঁছানোর আগে হোটেলে অতিথি হতে চাইবে কোন বেকুব? আর একটা বিষয় হচ্ছে, সময়। এখন দেখছি মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, হংকং থেকে আসা সব উড়োজাহাজ মধ্যরাতে ঢাকায় অবতরণ করে। আপনি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, মধ্যরাতের ঢাকা প্রবাসীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ?

এবারের যাত্রায় আমাদের বেলায় আরো জটিল ছিল পরিস্থিতি। আমাদের আসার এক সপ্তাহ পর আমার ছেলে এসেছিল হংকং হয়ে। তার বিমান ঢাকা শাহ্জালাল (র.) বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করেছিল রাত ১টায়। সবকিছু শেষ করে বের হতে হতে রাত ২টার বেশি। এই শেষ হয়ে আসা রাতে সে কোথায় যাবে? বিশেষ করে, দীর্ঘ সময় পর দেশে যাওয়া ইয়াংম্যানদের কথা ভাবুন। তাদের বাংলা বলা ও বোঝার ঝামেলা আছে। তারা আমাদের দেশের বিলম্ব বা দেরি করানোর কানুনগুলো বোঝে না। বাধ্য হয়ে আমাকে আরো একবার ঢাকা দৌড়াতে হয়েছিল তাকে রিসিভ করার জন্য।

আমার মতো এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা চট্টগ্রাম পৌঁছাতে পারলে এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। একটা সময় তো সে ব্যবস্থা ছিল। আমি নিজে একাধিক বার থাই এয়ার ও সিংগাপুর এয়ারলাইনসে চেপে চট্টগ্রাম যাতায়াত করেছি। যতটুকু জানি, সার্ভিস বা সেবা বন্ধ করার কারণ নাকি ‘রাজনীতি’। কোন রাজনীতি বা রাজনৈতিক টানাপড়েনে এসব চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, ঠিক জানি না। আচ্ছা, এই সমস্যাগুলোর কথা কি চট্টগ্রামের মেয়র বা সিভিল এভিয়েশনের কর্তারা জানেন না?

চট্টগ্রাম একটি প্রাচীন নগরী। চট্টগ্রামের বহুজাতিকতা আর বন্দরনগরীর কারণে বহুমাত্রিকতার কথা কে না জানে? পর্তুগিজ শিখ, ইউরোপিয়ান, আর্মেনিয়ান—কে আসেনি এখানে? শৈশবে দেখেছি—আফগানিস্তানের মানুষজন, যাদের নাম ছিল কাবুলিওয়ালা, তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে হিং-বাদাম-পেশতা ফেরি করতেন। ইরানি মানুষজন খুলতেন হোটেল। চৈনিক দাঁতের ডাক্তার আর চীনাদের জুতা ছিল চট্টগ্রামবিখ্যাত। আরব, ভারত ও এশিয়ার নানা দেশের মানুষের তীর্থ ছিল চট্টগ্রাম।

এই শহরে বিত্তবান মানুষের অভাব নেই। চিরকালই চট্টগ্রাম ও সিলেট হচ্ছে দেশের বিত্তশালীদের এলাকা। দেশের মানুষের আয়-উন্নতি আর সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চট্টগ্রামের মানুষ এখন দুনিয়ার সব দেশে ডানা মেলেছে। এসব মানুষের মধ্যে যারা বছরে একবার এবং প্রয়োজনে একাধিক বার চট্টগ্রামে উড়াল দেয়। তাদের প্রত্যেকের কপালে থাকে একই ধরনের দুর্ভোগ।

কে এর জন্য দায়ী কিংবা কার কারণে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হলো, সে প্রশ্ন তুলে লাভ নেই। আমাদের প্রশ্ন, কবে ও কীভাবে এই চলাচল আবার শুরু করা সম্ভব? আমি এ কথা হলফ করে বলতে পারি, এটা শুরু হলে বিশ্বের বহু দেশের, বিশেষত এশিয়ান দেশের বিমান সংস্থাগুলো এগিয়ে আসবে। সিভিল এভিয়েশন এখন ভালো ব্যবসা। কোভিডের ধকল কাটিয়ে আবার জেগে উঠেছে আকাশপথ। আমি গত দুই-তিন বারের ভ্রমণে দেখেছি, মানুষে মানুষে সয়লাব। এমন সুবর্ণ সময়ে চট্টগ্রামের বিমানবন্দর কেন আয়-উপার্জন ও ব্যবসায় থেকে বঞ্চিত হবে?

সংশ্লিষ্টরা নজর দিলে এই সমস্যার সমাধান হবে। এর ফলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর যেমন ফুলেফেঁপে উঠবে, তেমনি আমরা প্রবাসীরা সহজে ফিরতে পারব চট্টগ্রাম। কেউ কি আমাদের কথা শুনবেন আদৌ?

লেখক: সিডনি প্রবাসী

ইত্তেফাক/জেডএইচ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন