চক্ষু খুলিয়া দেখিতে হইবে

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৪, ০৮:১৫

উন্নয়নশীল বিশ্বে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে ‘বাহিরের লোক’ কখন কীভাবে ঢুকিয়া পড়ে, তাহার হদিস রাখাটাই দুষ্কর। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে অনুপ্রবেশ করিয়া তাহারা সেই রাজনৈতিক দল এবং পাশাপাশি দেশ ও জাতির কী মহাসর্বনাশ করে, সেই দৃষ্টান্তের অভাব নাই। আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে হরহামেশা বলিতে দেখা যায়, সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র চলিতেছে, সরকার পতনের নীলনকশা চলিতেছে। সরকারপ্রধানের মুখে এই ধরনের কথা দেশ ও জনগণের জন্য অশনিসংকেত নিঃসন্দেহে। কারণ, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, গোপন আঁতাঁত, নীলনকশা—এই সকল বিষয় কোনো দেশের জন্যই শুভ সংবাদ নহে। তবে কাহারা করিতেছে এই ষড়যন্ত্র, পিছন হইতে কলকাঠিই-বা নাড়িতেছে কাহারা—এই সকল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয় না কেন? কেন একটি বা দুইটি কেস স্টাডি করিয়া দেখা হয় না? স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিহত করিবার কথা বলা হইতেছে, কিন্তু দলের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতার অথবা আমলার ছত্রছায়া ও মদতেই যে দলে অনুপ্রবেশ ঘটিতেছে না, তাহা কে গ্যারান্টি দিয়া বলিতে পারিবে? পত্রপত্রিকা খুলিলেই বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানির খবর পাওয়া যাইতেছে। ইহাকে ‘অভ্যন্তরীণ কোন্দল’ বলা হইতেছে বটে, কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই কি ইহা সত্য? একসময় রাজাকার, আলবদর, আলশামস নির্মূলে কমিটি গঠন এবং আইন করা হইয়াছিল, যদিও দেশের প্রচলিত আইনেই তাহাদের বিচার নিশ্চিত করা যাইত। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীদের চিহ্নিত করা কিংবা তাহাদের বিচার নিশ্চিত করা গিয়াছে কি? বরং এমনও দেখা গিয়াছে, সেই স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীরাই বিভিন্ন সময়ে সরকারের কোলে চড়িয়া বসিয়াছে।

যাহারা বা যাহাদের পূর্বপুরুষ দেশের স্বাধীনতার পথে চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র করিয়াছিল, তাহারা নিশ্চয়ই এখন হাত গুটাইয়া বসিয়া নাই! ষড়যন্ত্রের জাল কোথা হইতে এবং কোথায় বসিয়া বিস্তার করা হইতেছে, তাহা স্টাডি করিয়া দেখিতে হইবে। ব্যস্ততার ভিড়ে ইহা অতি কঠিন ও সময়সাপেক্ষ বটে, তথাপি স্বাধীনতার দীর্ঘসময় পরও যেই হেতু স্বাধীনতাবিরোধী বা চক্রান্তকারীদের প্রতিহতের কথা উঠে বারবার, তাই খুঁজিয়া দেখা দরকার—স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচরণ ঠিক কোথায়।

দীর্ঘদিন ধরিয়া আমরা লক্ষ করিয়া আসিতেছি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একশ্রেণির নেতার উদয় ঘটিয়াছে, যাহাদের বিরুদ্ধে রহিয়াছে হাজারো অবৈধ ব্যবসায়-বাণিজ্যের অভিযোগ। রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙাইয়া রাতারাতি কোটিপতি বনিয়া যাওয়া এই সকল উঠতি নেতা, পাতি নেতা রাজনীতির খাতায় নাম লিখিয়াছে। কেহ কেহ ক্ষমতার চেয়ারও বাগাইয়া নিয়াছে। স্থানীয় পুলিশ, প্রশাসন হইতে শুরু করিয়া সরকারের বিভিন্ন স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানও তাহাদের সঙ্গে হাত মিলাইয়া এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করিতেছে। এই সকল ‘বাইরের লোকের’ একমাত্র টার্গেট হইল টাকাপয়সা, তথা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ। ফলে একটি সময়ে স্বার্থে আঘাত লাগিলেই তাহারা বড় অপরাধ-অপকর্মে জড়াইয়া পড়িবে—ইহাই স্বাভাবিক। দেশব্যাপী যেইভাবে ‘রাজনৈতিক অন্তঃকোন্দলে’ নেতাকর্মী শিকার হইতেছেন, তাহার পরিপ্রেক্ষিতে খুঁজিয়া দেখার সময় হইয়াছে— এই সকল কর্মকাণ্ড যে বা যাহারা ঘটাইতেছেন, তাহাদের শিকড় আসলে কোথায়? ইহাদের মধ্যে বহু স্বাধীনতাবিরোধী ঘাপটি মারিয়া বসিয়া নাই তো? বস্তুত, ইহারা অবৈধ টাকা কামাইয়া দলের লোকজনকে খরিদ করিয়া নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করিয়াছে। এখন সুযোগ বুঝিয়া কোপ দিতেছে। মাস্তান বাহিনী, পেটোয়া বাহিনী তৈরি করিয়া তাহারা একসময় অন্য দল এবং সাধারণ জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালাইয়াছে; এখন দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা পাকাইতেছে। তাহাদের থামাইতে না পারিলে অদূর ভবিষ্যতে আরো কী কী দেখিতে হইবে, তাহাই বড় প্রশ্ন!

খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীসহ তাবত্ বিশ্ববাসীর নিকট ‘জুডাস’ নামটি খুবই ঘৃণিত। পৃথিবীর সবচাইতে জঘন্য বিশ্বাসঘাতক হলো যিশুর সহচর এই জুডাস, যিনি মাত্র ৩০ রৌপ্যমুদ্রার বিনিময়ে যিশুকে রোমান সৈন্যদের হাতে ধরাইয়া দিয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী, লাস্ট সাপারের পরে ভিড়ের মধ্যে যিশুর গালে চুমো খাইবে জুডাস, আর সেই চুমোর মাধ্যমেই শনাক্ত করা হইবে যিশুকে। বলা বাহুল্য, এমনটিই ঘটিয়াছিল। ‘অর্থের বিনিময়ে’ কাছের মানুষের সর্বনাশ করার এই রকম বহু নজির ইতিহাসে আছে। অর্থাত্, অর্থের নিকট বিক্রি হওয়া লোকেরা সর্বদাই বিপজ্জনক। অতএব, আজ রাজনৈতিক দলের যেই সকল লোক অর্থের নিকট বিক্রি হইয়া স্বাধীনতাবিরোধীদের শক্তিশালী করিতেছেন, তাহাদের জুডাসের চুমোর বিষয় স্মরণে রাখিতে হইবে। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থে এই সকল ব্যক্তি কখন কাহার হইবে, তাহার গ্যারান্টি নাই।

ইত্তেফাক/এসটিএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন