দুই আওয়ামী লীগ নেতা খুন, নেপথ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তার

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৪, ২০:৩৩

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে গুলি, বোমা ও দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে আওয়ামী লীগের দুই নেতা আবদুস সালাম (৪৮) ও আবদুল মতিনকে (৪২) হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বের জেরে এর আগেও শিবগঞ্জ পৌরসভার মর্দানা ও নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নে চলেছে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম। ফলে আতঙ্কে বাস করছেন এসব এলাকার জনসাধারণ।

সর্বশেষ গত ২৭ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার রাণীহাটি ডিগ্রি কলেজের সামনে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন জেলা পরিষদ সদস্য ও নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম এবং নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও হরিনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুল মতিন। গত ১৪ মাস আগে নয়ালাভাঙ্গা ইউপি সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আলম ঝাপড়া খুন হন। ওই হত্যা মামলার আসামি ছিলেন নিহত আবদুস সালাম। ধারণা করা হচ্ছে এই ঘটনার জেরে হত্যা করা হয়েছে আবদুস সালামকে। এর আগেও আলম হত্যা মামলার আরেক আসামি দুরুল হোদাকেও একই কায়দায় হত্যা করা হয়। 

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করতে ক্ষমতাসীন দলের একটি গ্রুপের ছত্রছায়ায় আশরাফুল হকের মদদে এসব খুনের ঘটনা ঘটছে। 

আবদুস সালাম ও আবদুল মতিনের হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী আবদুর রহিম বাদশা জানান, নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আশরাফুল হকের হুকুমেই তার বাহিনী এ সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছেন। 

নিহত আবদুস সালামের স্ত্রী ফেরদৌসি বেগম বলেন, গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি নেতা আশরাফুলের বিপক্ষে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তাকুল ইসলাম পিন্টু। তার প্রচারণা ও সহযোগিতায় ছিলেন আবদুস সালাম। মূলত ওই নির্বাচনসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও বিরোধের জেরেই আমার স্বামী ও আবদুল মতিনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। 

সালামের ভাইয়ের মেয়ে রুনা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান আশরাফুল হকের নেতৃত্বে তার চাচার ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এর আগেও দুই দফা তারা ওপর হামলা চালানো হয়। কিন্তু প্রাণে বেঁচে গেছেন তখন। 

এদিকে আব্দুল মতিনের ছেলে মশিউর রহমান (১৯) বলেন, আমার বাবা কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পাওনা টাকা শোধ দেওয়ার জন্য সালাম ডেকেছিলেন। সেখানে গিয়ে খুন হন।  

স্থানীয়রা বলছেন, আশরাফুল হক একটি আতঙ্কের নাম। গত ৩ দশকে অসংখ্য হত্যার মূল নায়ক হলেও তিনি থেকে যাচ্ছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরেই। এখন আওয়ামী লীগ নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আশরাফুল সখ্যতা করে চলছে। তাদের সুপারিশে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বড় বড় ঠিকাদারি কাজও পান তিনি। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, আওয়ামী লীগের দুটি গ্রুপের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করায়, সুবিধাবাদী বিএনপি নেতা আশরাফুল হক ও তার বাহিনী কৌশলে একটি গ্রুপের আশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশের পিসিপিআরে আশরাফুলের বিরুদ্ধে ২১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১২টি বিস্ফোরক আইনে, ২টি হত্যা, ৩টি ছিনতাই, ২টি প্রতারণা, ১টি মাদক মামলা।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, গত ১০-১২ বছরে ওই এলাকায় প্রায় ১০ জন খুন হয়েছে এবং হাজার হাজার বোমা ও ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। এসব ঘটনায় মদদ রয়েছে আশরাফুলের। 

শিবগঞ্জ থানার ওসি সাজ্জাদ হোসেন বলেন, নয়লাভাঙ্গা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দু’গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। আবদুস সালাম একপক্ষের নেতৃত্ব দিতেন। এ বিরোধের জেরে তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় প্রধান আসামি আশরাফুল হকের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম আম্বিয়া (৪৮) ও ঘোড়াপাখিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হককে (৫২) গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ সুপার ছাইদুল হাসান জানান, আশরাফুলের গ্রুপ সম্পর্কে জেনেছি। সব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছি।

 

ইত্তেফাক/এসএ/পিও