প্রত্যয় পেনশন স্কিম: যা বলছেন শিক্ষকরা

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৪, ১৩:২৬

চালু হচ্ছে নতুন পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’। এদিকে এই প্রত্যয় স্কিম ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পহেলা জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। শিক্ষকদের সঙ্গে এই আন্দোলনে আছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।

এদিকে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, এটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অংশ। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা পক্ষে-বিপক্ষে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিষয়টি আবারও পর্যালোচনা করা যায় কী না, সেটি নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা হতে পারে।

বিদ্যমান পেনশন ও প্রত্যয় স্কিমের মধ্যে পার্থক্য কি?  
বিদ্যমান পেনশন স্কিমে বেতন থেকে টাকা না কাটা হলেও প্রত্যয় স্কিমে কাটা হবে বেতনের দশ শতাংশ টাকা। আগে অধ্যাপক গ্র্যাচুইটি বাবদ শিক্ষকরা এককালীন ৮০ লাখ ৭৩ হাজার টাকা করে পেলেও বর্তমান নিয়মে পাবেন না সেটিও। আবার আগে পেনশনের ওপর বছর প্রতি ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট থাকলেও নতুন স্কিমে থাকছে না এই সুবিধা। এছাড়াও নতুন স্কিমে মাসিক চিকিৎসা ভাতা, দুটি উৎসব ভাতা ও একটি বৈশাখী ভাতার উল্লেখ না থাকাসহ কমছে আরো কয়েকটি সুবিধা। 

প্রত্যয় যাদের জন্য প্রযোজ্য
বাংলাদেশের সকল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ (আইসিবি) সব রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও সরকারি ব্যাংক ও পেট্রোবাংলাসহ প্রায় চার শতাধিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রত্যয় প্রযোজ্য হবে।

সেশনজটের আশঙ্কায় শিক্ষার্থীরা 
এদিকে শিক্ষকদের কর্মবিরতিতে নতুন করে দেখা দিয়েছে সেশনজটের আশঙ্কা। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হওয়ায় হতাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোনোমি বিভাগের মাস্টার্স প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মো. লাবলু ইসলাম বলেন, এমনিতেই সারাবছর সেশনজট লেগেই থাকে। তার ওপর এমন কর্মবিরতিতে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হলে আমাদের জন্য সেটা হবে 'মরার ওপর খাঁড়ার ঘা' এর মতো অবস্থা। অতিদ্রুত এই অচলাবস্থার সমাপ্তি ঘটবে এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার। সর্বোপরি, একসকল বিষয়ের সুনিস্পত্তির পাশাপাশি চাকরিপ্রার্থী শিক্ষার্থীদের নিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকেও শিক্ষক, সরকার ও  সংশ্লিষ্ট সকলের যথাযথ পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি। 

আন্দোলনে অনড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা 
কর্মবিরতির বিষয়ে ইত্তেফাককে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, আমরা চাই সরকার অতিদ্রুত এই বিষয়টার সমাধান করুক। নতুন প্রত্যয় স্কিমে অনেকগুলো সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। আবার, সেবক স্কিমে কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে সেটাও আমরা জানি না। প্রত্যয় স্কিম প্রত্যাহার, প্রতিশ্রুত সুপারগ্রেডের বাস্তবায়ন ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবিতে আমাদের এই কর্মবিরতি চলছে। 

দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা এই কর্মবিরতিতে অংশ নিচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। 

কেন এই স্কিমকে বৈষম্যমূলক বলা হচ্ছে? এমন প্রশ্নে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. সাদেকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, সরকারি ক্যাডারদের জন্য 'সেবক' এবং আমাদের জন্য আলাদা করে 'প্রত্যয়' স্কিম চালুর মাধ্যমে একটি বৈষম্যের সূচনা হচ্ছে। দেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে, মেডিকেল থেকে পাশ করে একজন শিক্ষার্থী এডমিন, পুলিশ ক্যাডার হচ্ছে। কেন হচ্ছে? একই পর্যায়ের সকল সরকারি চাকরিজীবীদের সমান সুযোগ না দেওয়ায় এমনটি হচ্ছে। প্রত্যয় স্কিম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর হলেও শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই এর প্রতিবাদ করছেন। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই হলেন জাতির বিবেক। 

অধ্যাপক ড. সাদেকুর রহমান আরও বলেন, এই স্কিমে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে যারা নিয়োগ পাবে তারা নতুন এই পেনশন স্কিমের আওতায় আসবে। এইদিকে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু প্রতিটি শূন্য পদের জন্য উন্মুক্ত বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুনভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এজন্য প্রতিটি প্রমোশনই নতুন করে নিয়োগ। সুতরাং চাকরিরত শিক্ষকদের ওপরও এই নিয়ম বর্তাবে কি-না না নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। 

তিনি যোগ করেন, এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা কম বিধায় অনেক শিক্ষক বিদেশে গিয়ে  আর দেশে ফিরছেন না। উদাহরণস্বরূপ, হাবিপ্রবির ৬-১০ জন শিক্ষক একেবারেই ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন। তার ওপর এই নতুন স্কিমের প্রভাবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে শিক্ষকতা পেশায় আসতে চাইবে না। এতে করে ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান আকস্মিকভাবে কমবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, ১৯২১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেক বেতন ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতনের চেয়েও বেশি ছিল। তখন ৪ টাকায় ১ মন চাল পাওয়া যেত। একজন অধ্যাপক তখন বেতন পেতেন ১৮০০ রুপি। অর্থাৎ, তখন একজন অধ্যাপক তার বেতন দিয়ে ৪৫০ মন চাল কিনতে পারতেন। আর এইদিকে বর্তমানে আমার পূর্ণ বেতন দিয়ে বড়জোর ৪০ মন চাল কিনতে পারি।

১৯৮০ সালের দিকেও একজন কলেজ শিক্ষকের বেতন তৎকালীন সাবডিভিশনাল অফিসার বা এসডিও (বর্তমান বিসিএস ক্যাডার) এর চেয়েও বেশ বেশি ছিল।

তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর আগেও পিএইচডির জন্য কয়েকটা ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হতো। এমনকি অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাসের জন্যও ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হতো। এর অর্থ, তখন মেধাকে কিছুটা হলেও মূল্যায়ন করা হতো। সেইসব মূল্যায়নও এখন নেই। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একটা পেনশন পেত। সেই পেনশনটাও এখন কেড়ে নিচ্ছে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি পারত পক্ষে কোনো মেধাবীরা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাইবে না। এটাই হলো কফিনের শেষ পেরেক।

কর্মবিরতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারাও 

বাংলাদেশ আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার্স ফেডারেশনের সভাপতি মীর মো. মোর্শেদুর রহমান বলেন, এই স্কিমের মূল প্রভাব পড়বে নতুন করে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর। সুযোগ-সুবিধা কমায় ভবিষ্যতে  মেধাবীরা এসব পদে আসার আগ্রহ হারাবে। 
সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা ১-৪ জুলাই অর্ধদিবস এবং ৭ জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি পালন করবে বলে জানিয়েছেন তিনি। 

যা বলেছেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য  
শিক্ষকদের প্রত্যয় স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে ইত্তেফাককে জাতীয়‌ পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৩-এর ১৪ (২) ধারায় বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপন জারির পর সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতিতে সরকারি বা আধা সরকারি অথবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরাও এর আওতাভুক্ত হবেন। সে অনুযায়ীই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এ স্কিমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।

এবং সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পর এই স্কিমে অনলাইনে রেজিস্ট্রেশনের যে কার্যক্রম নেওয়ার, সেটি ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে এবং এখন প্রত্যয় স্কিমে পেনশন অথরিটির ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ আছে। 

যা বলছে ইউজিসি
ইত্তেফাককে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে কিছু না বলা হলে আমাদের পক্ষে থেকে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়।

কর্মবিরতির ফলে সেশনজটের আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এবিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের মতো দেশে যেকোনো কারণেই সেশনজট তৈরি হয়। সেশনজটের সমাধান আগেই করা উচিত ছিল। খুব দ্রুত এই অচলাবস্থার নিরসন হবে এই প্রত্যাশা করি।

ইত্তেফাক/এআই