চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকহীন ৬ মাস!

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪, ১০:৩১

ভালো গল্প-নির্মাণের সিনেমা নেই। নেই দর্শক টানার মতো নায়ক-নায়িকা। প্রতিনিয়ত সিনেমা হল কমছে। ব্যবসায়িক শঙ্কায় প্রযোজকরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। অনেক বছর ধরে দেশের চলচ্চিত্রের চিত্রটা এমনই। মুখে অনেকে ধুঁকতে থাকা ইন্ডাস্ট্রিকে বাঁচানোর পথ বাতলে দিলেও উত্তরণের কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।

আবার অনেক হিরো-হিরোই সাড়া জাগিয়ে এলেও ক’দিন যেতে না যেতেই টর্চলাইট জ্বালিয়ে তাদের খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। তবে এমন অবস্থার মাঝে দুই বছর আগে নতুন আলোচনার জন্ম দেয় দেশের চলচ্চিত্র। ‘পরাণ’ সিনেমাটি চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে আলোর পথ দেখায়। দারুণ ব্যবসাসফলতার পাশাপাশি প্রশংসিত হয় বিভিন্ন মাধ্যমে। ভালো সিনেমা দর্শকদের হতাশ করে না—এমন বিশ্বাস তৈরি হয়।

এরপর গত বছর ঈদে মুক্তি পায় ‘প্রিয়তমা’। এই সিনেমাও সুড়ঙ্গের মতোই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। যার প্রভাবও সিনেমা মুক্তির তালিকা দেখলে বোঝা যায়। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ২৫টির বেশি সিনেমা মুক্তি পেলেও আলোচনায় ছিল কেবল দুই ঈদে মুক্তি পাওয়া কয়েকটি সিনেমা। সেই তালিকা ছিল খুব ছোট।

দুই ঈদে দেশের প্রেক্ষাগৃহে এসেছে ১৬টি সিনেমা। অথচ ব্যবসা করেছে শাকিব খানের দুই সিনেমা। আর প্রশংসার পাওয়ার দলে ছিল দু-চারটি সিনেমা। সিনেমাগুলো মুখ থুবড়ে পড়ার কারণ হিসেবে অনেকেই বলছেন, বাংলা সিনেমার পুরোনো রোগ মানহীন গল্প-নির্মাণের কথা। তাদের মতে, মুখে নানা কথা বললেও গুণমানের বিচারে এতটুকুও বদলায়নি দেশের সিনেমা। উল্টো তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোনোরকম প্রস্তুতি-প্রচারণা ছাড়াই চলচ্চিত্র মুক্তির চর্চা। ইদানীং ববি, রাশেদ মামুন অপুসহ অনেকেই এমন অভিযোগ করেছেন। শুধু তাই নয়, গত ঈদেও হঠাত্ করে মুক্তির মিছিলে যুক্ত হয় একাধিক সিনেমা। যা সিনেমাগুলো ব্যর্থতার পেছনের অন্যতম কারণ বলেই মনে করছেন অনেকে।

ঈদে সিনেমা মুক্তি দিলে ব্যবসায়িক শঙ্কা কম থাকে—এ ধারণা থেকেই গত ঈদুল ফিতরে নির্মাতা-প্রযোজকরা মুক্তি দেন ১১টি সিনেমা! এরমধ্যে ‘রাজকুমার’, ‘কাজলরেখা’, ‘ওমর’ ও ‘দেয়ালের দেশ’ ছাড়া কোনো সিনেমাই সেভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি। ফলে গত কোরবানির ঈদে মুক্তির প্রতিযোগিতা থেকে অনেকটাই সরে আসেন তারা। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ৫টি সিনেমা। শাকিব খান-মিমি চক্রবর্তীর ‘তুফান’ সিনেমার সঙ্গে পর্দায় আসে বুবলী-রোশানের ‘রিভেঞ্জ’, ববির ‘ময়ূরাক্ষী’, কৌশানির ‘ডার্ক ওয়ার্ল্ড’ ও পূজা চেরীর ‘আগন্তুক। মুক্তির ঘোষণা দিয়ে সরে দাঁড়ায় ‘এশা মার্ডার’, ‘জংলি’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমা।

তবে মুক্তি পাওয়া ৫টি সিনেমার ভেতর শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল শাকিব খানের ‘তুফান’। সিনেমাটি মুক্তির মাধ্যমে নতুন করে জেগে উঠেছে চলচ্চিত্রাঙ্গন। গত দুই সপ্তাহ ধরে সারাদেশের দর্শকরা দল বেঁধে হলে যাচ্ছেন, মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে টিকেট পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, সিনেমাটিতে দুই বাংলার তারকাদের অভিনয়ও নজর কেড়েছে। এরইমধ্যে সিনেমাটি দেশের বাইরেও একাধিক দেশে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিক্যুয়েল নির্মাণের ঘোষণাও দিয়েছে নির্মাতা রায়হান রাফী। তবে বাকি ৪ সিনেমা বরাবরের মতোই হতাশ করেছে। কারণ হিসেবে সিনেমাটির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা দুর্বল নির্মাণ, প্রচারণার অভাবকেই দায়ী করেছেন।

এদিকে ঈদের সিনেমার হিসেব কিছুটা আলোচনার জন্ম দিলেও শেষ ৬ মাসে মুক্তি পাওয়া অন্য সিনেমাগুলোও ফ্লপের তালিকা লম্বা করেছে। ঈদ ছাড়া চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে যে সিনেমাগুলো মুক্তি পেয়েছে সেগুলোর মধ্যে আলোচিত হয়েছে শৈল্পিক ঘরানার কয়েকটি সিনেমা। এর মধ্যে নূরুল আলম আতিকের ‘পেয়ারার সুবাস’ ও ধ্রুব হাসানের ‘ফাতিমা’ উল্লেখযোগ্য।

দুটি সিনেমাই বিদেশি বিভিন্ন উত্সবে পুরস্কৃত হয়েছে। তবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর খুব বেশি দর্শক পায়নি। শুধু তাই নয়, বিগত ৬ মাসে তারকা সংকট সমাধানে নতুন কোনো তারকার দেখাও মেলেনি। নির্মাতা প্রযোজকরা পুরোনোতেই আস্থা খুঁজেছেন।

ঈদুল আজহায় 'জংলি' হয়ে আসছেন সিয়াম! | চ্যানেল আই অনলাইন

সেই জায়গা থেকে প্রশ্ন উঠেছে, আগামী ৬ মাস দেশের সিনেমা হলে তুফানের মতো কোনো সিনেমা ঝড় তুলবে, নাকি আবারও নিষ্প্রভ সময় পার করবে? যদিও এমন প্রশ্নের উত্তর দেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা দিতে পারবেন কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে অনেকেই ধারণা করছেন আগামী ৬ মাসে একাধিক সিনেমা দর্শকদের হলে আসতে বাধ্য করবে।

সেই তালিকায় রয়েছে শাকিব খানের আলোচিত সিনেমা ‘দরদ’, আরিফিন শুভর ‘নূর’, ‘নীলচক্র’, জনপ্রিয় অভিনেত্রী বাঁধনের ‘এশা মার্ডার’ ও সিয়াম আহমেদের ‘জংলি’। নির্মাণের সময় থেকে এ ছবিগুলোতে দর্শকরা আগ্রহী।

তাদের প্রত্যাশা, একে একে মুক্তি পেলে এগুলোর মধ্যে একাধিক ছবি সিনেমা হলে উন্মাদনা তৈরি করতে পারে! এরইমধ্যে অনন্য মামুন পরিচালিত দরদ সিনেমার টিজার প্রকাশিত হয়েছে। দর্শকরাও বেশ পছন্দ করেছেন। অন্যদিকে জংলি সিনেমায় সিয়ামের লুকও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এছাড়া সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ‘এশা’ সিনেমার নাম ভূমিকায় আছেন পূজা। এই অভিনেত্রীর সিনেমা ঘিরে বরাবরই দর্শক আগ্রহ থাকে। এরইমধ্যে বাঁধনের লুকও দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছে।

অন্যদিকে গত বছর মুজিব: একটি জাতির রূপকার সিনেমার পর পর্দায় দেখা যায়নি আরিফিন শুভকে। তাই এই নায়কের নতুন সিনেমা ‘নূর’ও বেশ সাড়া ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে আলোচনা-সমালোচনা যা-ই হোক, সিনেমাগুলো মান ধরে রাখতে না পারলে, প্রচারণার ডামাডোলে না থাকলে যে মুখ থুবড়ে পড়বে তা হলফ করেই বলা যায়।

ইত্তেফাক/এএম