ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ কি পরিকল্পনা মতো এগোচ্ছে

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৪, ০৭:১১

গত মে মাসের মাঝামাঝি রাশিয়া উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ইউক্রেনে আক্রমণ করে। খারকিভ অঞ্চলে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তারা কিছু অঞ্চল নিজেদের দখলে নেয়। এই অঞ্চলগুলো তারা শুরুর দিকে আক্রমণ চালানোর সময়ও একবার দখল করেছিল কিন্তু পরে তারা ঐ অঞ্চল ছেড়ে যায়। কিছু বিশ্লেষক এই পরিস্থিতিকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, যখন বিশ্ব ঘুমচ্ছিল তখন এ ধরনের হামলা চালানো ন্যক্কারজনক ঘটনা।

ঐ আক্রমণের সময় রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্ত থেকে তিন মাইল দূরে ভোভচানস্ক শহরের চারপাশে প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়। এরপরে যা ঘটতে পারে তার পূর্বাভাস ইউক্রেনের জন্য ভয়ংকর। রাশিয়া হয়তো আরো সামনের দিকে এগোতে পারে এবং সম্ভবত ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভও দখল করতে পারে, যেখানে যুদ্ধের আগে ১৪ লাখ মানুষের বসবাস ছিল। ইউক্রেনের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ নেই। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় এক মাস দেরি হওয়ায় পশ্চিমা সামরিক সহায়তা আসতে বেশ সময় নেয়। সব কিছু দেখে মনে হচ্ছে— রাশিয়া তার অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং তারা যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে একটি সফল গ্রীষ্মকালীন আক্রমণ চালাতে পারে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউটের সামরিক বিশ্লেষক জ্যাক ওয়াটলিং বলেছেন যে, আক্রমণের লক্ষ্য শুধু উত্তর-পূর্ব দিক নয়। বরং ইউক্রেনের পূর্বে অবস্থিত ডোনবাস অঞ্চলে রাশিয়ান দখল আরো বিস্তৃত করা। যার কিছু অংশ রাশিয়ার অধীনে ছিল। ২০১৪ সাল থেকে সামরিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে ঐ অঞ্চলটি রাশিয়ার দখলে যায়।

সর্বশেষ রুশ অভিযান সফল হয়েছে?

প্রায় দুই মাস হলো, রাশিয়ান বাহিনী ফ্রন্টলাইনের কিছু অংশে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তারা ভোভচানস্ক এবং চসিভ ইয়ার নামে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহর পুরোপুরি দখল করতে ব্যর্থ হয়েছে। দুটি শহরই গত ছয় সপ্তাহে কয়েক দফা মারাত্মক লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছে। এই দুটি শহর দখল করতে পারলে রাশিয়া সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসবে। এতে ইউক্রেনের সামরিক সরবরাহ আসার পথ বন্ধ হয়ে যাবে এবং রাশিয়াও পরে আরো বিস্তৃত এলাকা নিজেদের দখলে নিতে পারবে।

এখন পর্যন্ত এই অগ্রগতি না হওয়ার পেছনে প্রধান দুটি কারণ হলো, এক. প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করতে রাশিয়ার বড় ধরনের আক্রমণ চালানো জরুরি হলেও, এজন্য তারা সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পর্যাপ্ত রিজার্ভ বা সেনাবাহিনীকে আনতে পারছে না। এটি আপাতদৃষ্টিতে রাশিয়ার এক ধরনের অক্ষমতা। অন্যদিকে, পশ্চিমের দেশগুলো থেকে ইউক্রেনে নতুন সামরিক সরবরাহ আসতে শুরু করেছে, যা তাদের প্রতিরক্ষায় সাহায্য করবে।

ইউক্রেনের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের রিসার্চ ফেলো মাইকোলা বিয়েলেসকভ বলেছেন যে, মার্কিন কংগ্রেস গত এপ্রিলে ইউক্রেনের জন্য ৬ হাজার ১০০ কোটি ডলারের সামরিকসহায়তা প্যাকেজ পাশ করার পরই রাশিয়া আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। সুযোগের জানালা বন্ধ হতে শুরু করেছে। এই নতুন সামরিকসহায়তা প্যাকেজের ফলে ভূমিতে রাশিয়ার শক্তি হ্রাস পাবে। এ কারণেই অনেক স্থান থেকে ইউক্রেনকে সরে যেতে হলেও সেই ব্যবধান এখন কমে আসছে। তবে মে মাসের শেষের দিকে, খারকিভ অঞ্চলে রাশিয়ার আক্রমণের গতি কমে যায়। একজন রাশিয়ান সামরিক ব্লগার আলেকজান্ডার কোটস লিখেছেন যে, ইউক্রেন ভোভচানস্কের দিকে তাদের সামরিক বাহিনী পাঠিয়েছে এবং আমরা রোশিয়ান বাহিনী শিগিগরই বড় পরিসরে এগিয়ে যাব—এমনটা আমাদের আশা করা উচিত নয়। আমাদের অবস্থান আগে শক্তিশালী করতে হবে এবং পালটা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। কিন্তু রাশিয়ার আক্রমণের গতি ধীর হয়ে গেলেও এবং ইউক্রেনীয় বাহিনী পুনরায় সংগঠিত হয়ে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হলেও তার অর্থ এই নয় যে, রাশিয়া হেরে যাচ্ছে।

যুদ্ধ আর কতদিন চলবে?

রাশিয়ার আক্রমণ এখন পর্যন্ত বড় কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি, এমন অবস্থায় পরিস্থিতি ভারসাম্যহীন হয়ে আছে। একজন সিনিয়র ইউক্রেনীয় জেনারেল বলেছেন, কিছু কিছু জায়গায় রাশিয়ার অবস্থান ভালো আবার খারাপ। একই সঙ্গে, রাশিয়া ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিবিসি রাশিয়ার চলমান অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে দেখা যাচ্ছে, যা সাম্প্রতিক হামলার ঘটনারই প্রতিফলন।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুরোদমে আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে অনেক কিছুই পরিকল্পনা মাফিক এগোয়নি। তবে ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমের সমর্থনকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে মস্কোর সংকল্প আগের মতোই শক্তিশালী রয়েছে। ইউক্রেনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে একটি নতুন সামরিকসহায়তা প্যাকেজ গৃহীত হওয়ার পরে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ লিখেছেন, আমরা অবশ্যই জিতব, ৬১ বিলিয়ন রক্তাক্ত মার্কিন ডলার বিনিয়োগ সত্ত্বেও জিতব। শক্তি এবং সত্য আমাদের পক্ষে।

ইউক্রেনের যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হতে পারে সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র টেলিগ্রাফের সম্পাদক ফ্রান্সিস ডিয়ারনলি বলেছেন, পশ্চিম সক্রিয় হওয়ার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়াশীল হয়েছে এবং ওয়াশিংটন-জেলেনস্কির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়েছে এবং এগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। যা কিয়েভের টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট হলেও এর মাধ্যমে তারা নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ জয় করে ফেলবে, সেটা বলা যাবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এবারের ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ। এই যুদ্ধ প্রয়োজন বা পূর্বাভাসের চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে চলছে।

সূত্র: বিবিসি

ইত্তেফাক/এসকে