রেলওয়ের কর্মকর্তা বাবা তার চেয়েছিলেন ষোলো সন্তানের এক ছেলে ব্যারিস্টার হবেন। ছেলেটিও মনে মনে তাই ভেবে স্থির করে নিয়েছিলেন তিনি হবেন দেশের নাম করা একজন আইনজ্ঞ। শৈশবে কৈশোরের পাঠ্যপুস্তকের ছড়া সেই ছেলেকে মন্ত্রের মত টেনেছিল। কিছু না বুঝেই অনেকটা মনের আনন্দে শব্দের সঙ্গে শব্দ মিলিয়ে শুরু করলেন ছড়া লেখা।
তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর গণ্ডি পেরোনো মা তার সময় পেলেই শরৎচন্দ্র আর রবীন্দ্রনাথের গল্প উপন্যাস পড়তেন। তার অগ্রজ দুই একজন ইতোমধ্যে লেখালেখি আর বিদ্যাবুদ্ধিতে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত। এরকম একটা পারিবারিক আবহে উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনাকালীন দেশের নানা পত্রপত্রিকায় তাঁর ছড়া ছাপা হতে থাকল।
সবকিছু তার অগ্রজের পর্যবেক্ষণে ছিল। একদিন তার অগ্রজ তাকে বললেন, কবিতা লেখার চেষ্টা কর। একবার ছড়াকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলে কবি হিসেবে দাঁড়ানো বড় কঠিন। অগ্রজ অনুজকে ছন্দের একটি বইও দিলেন। সেই থেকে অনুজ কবিতায় মনোনিবেশ করলেন। সেই থেকে তিনি কবিতা পাঠ থেকে শুরু করে বিবিধ সময়ের কবিতা নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করলেন। তারুণ্যে কবিতা নিয়ে ঘাটাঘাটি করা অনুজের নাম মাকিদ হায়দার (১৯৪৭-২০২৪)। অগ্রজের নাম জিয়া হায়দার (১৯৩৬-২০০৮)।
মাকিদ হায়দার ছড়ার সঙ্গে লিখতেন গল্প, কবিতা, গান এবং প্রবন্ধ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন কবি হিসেবে। গোটা জীবন তিনি কবিতার পেছনে ব্যয় করে গেলেন নিভৃতে এবং নির্মোহে। তিনি কবিদের মেলে এবং মেলায় আসতেন। অনুষ্ঠানেও যেতেন। সংগঠনের ধারেকাছেও ভিড়তেন। কিন্তু কোথাও যেন এসবের লোভ এবং মোহ থেকে চেতনে-অবচেতনে নিজেকে রক্ষা করতে পারতেন। এখানে সময়ের মঞ্চের আসন, পদ ও পদবীর কাঙাল কবি গোষ্ঠী থেকে মাকিদ হায়দার আলাদা ছিলেন। এরকম ব্যক্তিত্বের অধিকারী কবিকে কাছে থেকে, দূরে থেকে অনেকবার দেখেছি ঢাকার কবিতা উৎসব আর বইমেলায়।
মাকিদ হায়দার সারাজীবন নিরন্তর লিখে গিয়েছেন। এর বিপরীতে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা এক ডজনের মত। এর কারণ তিনি বাতলে দিয়ে গেছেন। তিনি সচেতনভাবে প্রকাশক বরাবর ধর্ণা দিতে পছন্দ করতেন না। তিনি মনে করতেন লেখক হিসেবে তার কাজ লিখে যাওয়া। প্রকাশকরা প্রয়োজন মনে করলে তার পাণ্ডুলিপি প্রকাশের আগ্রহ দেখাবেন। প্রয়োজন মনে করলে দেখাবেন না। এটা তাদের এখতিয়ার।
লেখক হিসেবে তিনি তো খ্যাতি পদ পদবি পুরস্কার আর স্বীকৃতির জন্য লিখছেন না। তিনি লিখছেন মনের আমুদে। কারো লেখালেখির মূল্যায়ন করার যদি কিছু থাকে তা করবে সময়। এভাবেই কবি মাকিদ হায়দার নিজেকে এবং তার তাবৎ লেখালেখিকে সময়ের হাতে সঁপে দিয়েছিলেন। এখানে উল্লেখ করতে চাই ২০১১ সালে কবিতায় নোবেলপুরস্কার গ্রহণকারী সুইডেনের কবি টমাস ট্রান্সট্রয়মার (১৯৩১-২০১৫) সারাজীবনে সাকুল্যে ১২টির মত গ্রন্থ প্রকাশ করে গেছেন। বাকি সব লেখালেখি বাক্সবন্দি করে অপ্রকাশিত রেখে গেছেন। দুই প্রান্তের দুই কবির মননের অনন্যতার চমৎকার এক সাদৃশ্য এখানে।
লেখালেখির নিরন্তর যাত্রায় তিনি নিজস্বতার খোঁজ করে গেছেন। সেই নিজস্বতা তিনি পেয়েও গিয়েছিলেন। তার কবিতা আদতে ছিল এক একটি গল্প। তিনি বলে যেতেন মনের সেই সব অনুভূতি গল্প আর কথায়। তা হয়ে উঠত কবিতা। তিনি সহজ কথা সহজে বলতে চাইতেন। বোধ করি গল্পের এই টান পেয়েছিলেন তিনি শরৎচন্দ্র এবং সৈয়দ মুজতবা আলী থেকে। তিনি এই দুই লেখককে সার্বক্ষণিক পঠনের মধ্যে রাখতেন। তিনি রবীন্দ্রনাথকেও চর্চায় এবং গবেষণায় রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নদী-ঘনিষ্ঠতা নিয়ে তিনি লিখেছিলেন 'রবীন্দ্রনাথ: নদীগুলো' শিরোনামের এক গ্রন্থ।
তিনি পুরো জীবনকে দেখেছেন প্রেমের কাঠামোয়। তিনি শতাধিকবার প্রেমের অনুরাগে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন। যদিও শৈশবে জন্মজনপদ পাবনার ধনী পরিবারের এক কন্যাকে পছন্দের কথা সাহস করে মাকে বলতে পারেন নি। তেমনি তারুণ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার সময়ে চট্টগ্রাম শহরে প্রতিষ্ঠিত বাড়ির এক মেয়ের সঙ্গে পরিচয়ের কথাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অগ্রজ জিয়া হায়দারকে সাহস করে বলতে পারেন নি। অনুরাগ তার পেছন ছাড়েনি। যার স্বাক্ষর তার কবিতার পরতে পরতে।
সেই কবি আদতে সময়ের স্বীকৃত কবি যার কোনো না কোনো কবিতা পাঠকের মুখে মুখে, হৃদয় ও মনে অনুরণন তুলে, কানে বার বার বাজে। এরকম অসংখ্য উদাহরণ টানা যাবে মাকিদ হায়দারের কবিতা থেকে। একবার একটি কলেজের প্রিয়দর্শিনী তরুণ শিক্ষক মাকিদ হায়দারের সঙ্গে দেখা করতে এসে পা ছুঁয়ে সালাম করতে চেয়েছেন। মাকিদ হায়দার সায় দেন নি, সেই শিক্ষিকার সম্মানার্থে পা সরিয়ে নিয়েছেন। এরপর প্রিয়দর্শিনী শিক্ষকটি মাকিদ হায়দারের দীর্ঘ একটি কবিতা গড় গড় করে মুখস্থ বলে গেছেন। সেই কবিতার কয়েকটি পঙক্তি এরকম:
তাইতো বলি সবার কাছে
যে আমাকে দুঃখ দিলো
সে যেন আজ সবার চেয়ে
সুখেই থাকে
যে আমাকে প্রেম শেখালো
প্রেম শিখিয়ে বুকের মাঝে
অনল দিলো
সে যেন আজ সবার চেয়ে
সুখেই থাকে
সুখেই থাকে
----
এখানে 'সে' যে কেবল তার কোনো অনুরাগধন্য অনুপ্রেরণাদায়ী কোনো নারী তা কিন্তু নয়। তার তাবৎ কথামালা আর কবিতার অক্ষরে বলা হৃদয়ের ক্ষরণগুলো, গল্পগুলো জীবনকে তাকে করে বলা। পাঠক হিসেবে আমার এমনটাই মনে হয়।
জীবনের কথা ও গল্প বলার এ কবি জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালে। বাবার ইচ্ছায় একসময় ভেবেছিলেন ব্যারিস্টার হবার স্বপ্ন থেকে সওয়ার হয়েছিলেন কবিতায়। যিনি পরে স্বীকার করেছিলেন কবি না হলে হতেন তিনি 'খেজুর গাছের গাছি ' , গাছ কাটতেন আর ইচ্ছেমত খেজুরের রস খেতেন।
সেই রস তিনি জীবনে খুঁজেছেন আর শব্দকল্প গল্পে ধরতে চেয়েছেন। ব্যারিস্টার বা 'খেজুর গাছের গাছি' হতে চাওয়া এই কবি রুটিরুজির পথ বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থায় কর্মজীবনের মাধ্যমে।
তিনি সবকিছুকে প্রেমের নিরিখে দেখতে চাইতেন। পক্ষপাত ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতি। তার প্রতীকী খোঁচা তিনি দিয়ে গেছেন শেষতক কাব্যগ্রন্থ 'প্রিয় রোকোনালী'তে। সম্পাদনা করেছেন 'বাংলাদেশের প্রেমের কবিতা' শিরোনামের তাৎপর্যপূর্ণ একটি বই। যেখানে স্থান পেয়েছেন জসীম উদদীন থেকে শুরু করে এই সময়ের নতুন প্রজন্মের কবিরা।
১৯৭৭ সালে মুক্তধারা থেকে 'রোদে বাড়ি ফেরা' শীর্ষক প্রথম কাব্যগ্রন্থের কবি মাকিদ হায়দার ফেসবুককে কবি তৈরি হওয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করতেন। এরকমটা তিনি মুখে উচ্চারণ না করলেও তার জীবনধারা আর আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের আলোকচ্ছটায় তা বোঝা যেত।
যিনি লেখালেখির ভাগ্যকে সময়ের হাতে সমর্পণ করেছিলেন, সেই তিনি সময়কে তার কবিতায় তুলে এনেছিলেন। তা তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'রোদে বাড়ি ফেরা থেকে' শুরু করে ২০১৬ সালে প্রকাশিত শেষতক কাব্যগ্রন্থ 'প্রিয় রোকোনালী'তে নজর বুলাইলে তার যাপিত সময়ের একটি রূপরেখা পাওয়া যায়। সেই সঙ্গে মিলে কবিতার অক্ষরে তুলে ধরা সময়ের কত গল্প। সময়কে চিহ্নিত করা তার শেষতক কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন তুলে ধরে লেখাটি শেষ করছি:
"বুদ্ধিদীপ্ত চেহারার রোকোনালী মামা বললেন,
তুইতো সেদিনের ছেলে,
এখন থেকে তুই নিয়মিত ফুটবল খেলবি হাজির মাঠে,
তাহলে তোর মাথায় থাকবে ভবিষ্যতে
কাকে কী ভাবে নিচে ফেলে দেয়া যায়
তারই একটি সুন্দর পরিকল্পনা," ।
লেখক: কবি ও নাট্যকার, সুইডিশ রাইটার্স ইউনিয়নের পরিচালনা বোর্ডের সদস্য।
