আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ‘বিগ ফ্যাট ওয়েডিং’-এর দেশ হিসেবে ভারতের পরিচিতি আছে। দেশটির ধনকুবের ও সেলিব্রিটিরা বিশাল জাঁকজমকে বা বলিউড-মার্কা চোখধাঁধানো আড়ম্বরে পরিবারের বিয়ে আয়োজন করতে ভালবাসেন-এ কথা প্রায় পুরো বিশ্বের জানেন।
গত কয়েক মাস ধরে একের পর এক প্রাক-বিবাহ অনুষ্ঠানমালার শেষে শুক্রবার (১২ জুলাই) চার হাত এক হচ্ছে মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে অনন্ত আম্বানি ও তার দীর্ঘদিনের বান্ধবী রাধিকা মার্চেন্টের।
আজ ‘শুভ বিবাহ’ অনুষ্ঠানের পরও তিনদিন ধরে চলবে মুম্বাইতে সেই আনন্দ আয়োজন, যার শুরু হয়েছিল সেই মার্চ মাসের শুরুতে গুজরাটে আম্বানিদের পৈতৃক ভিটেতে। খরচের বহরে, ধূমধামের মাত্রায় কিংবা অতিথি তারকাদের দ্যুতিতে উজ্জ্বল এমন অবিস্মরণীয় বিয়ের আসর ভারতেও কেউ কস্মিনকালে দেখেনি!
সিএনএন লিখেছে, গোটা ভারত যেন ‘ট্রান্সফিক্সড’ হয়ে গেছে– মানে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে হাত-পা নাড়াতেও ভুলে গেছে!
বিয়েতে অতিথির তালিকায় রয়েছেনম ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী থেকে শুরু করে দেশের সব নামি-দামি রাজনীতিবিদ। শাহরুখ-আমির-সালমানের মতো বলিউডের ‘খান ত্রয়ী’ থেকে শুরু করে হালের রণবীর কাপুর-আলিয়া ভাটের মতো তারকারাও থাকছেন।
আবার ক্রিকেট তারকাদের বাদ দিয়ে ভারতে যেকোনো উৎসবই অসম্পূর্ণ, তা ছাড়া আম্বানি পরিবার নিজেরাই আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি মুম্বাই ইন্ডিয়ানসেরও মালিক। একারণে রোহিত শর্মা ও তার বহু সতীর্থও থাকবেন আসর আলো করে!
মাস চারেক আগে এই বিয়েরই প্রাক-বিবাহ অনুষ্ঠানে গেয়েছেন পপ তারকা রিয়ানা, গত সপ্তাহে ‘সঙ্গীত’ অনুষ্ঠানে গাইতে দেখা গেছে জাস্টিন বিবারকে। গত মাসে বিয়ে উপলক্ষে আম্বানিরা তাদের খাস অতিথিদের নিয়ে ভূমধ্যসাগরে এক লাক্সারি ক্রুজে বেরিয়েছিলেন, সেখানেও পারফর্ম করেছেন গায়িকা কেটি পেরি, ব্যান্ড ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ বা আন্দ্রিয়া বচেলির মতো তারকারা!
গত মার্চে প্রাক-বিবাহ আসরে দেখা যায় মেটা-র কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গ বা মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের মতো বিশ্ববিখ্যাত অতিথিদের। আগামী ৭২ ঘণ্টায় দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে মুম্বাই বা কাছের কয়েকটি বিমানবন্দরে এসে নামছে অন্তত ১০০ প্রাইভেট জেট।
কিন্তু এমন রূপকথার মতো বিয়ে নিয়েও কিন্তু ভারতে তর্কবিতর্কের শেষ নেই!
গরিব একটা দেশে ছোট ছেলের বিয়েতে এভাবে নদীর মতো টাকা খরচ করে মুকেশ আম্বানি একটা কুরুচিকর কাজ করলেন– না কি দেশের অর্থনীতিতে একটা নতুন পথের দিশা দেখালেন, তা নিয়েও কিন্তু ভারতের সমাজ পুরোপুরি দ্বিধাবিভক্ত!
অনন্ত আম্বানি আর রাধিকা মার্চেন্টের বিয়ে নিয়ে দেশে এই বিতর্কগুলো ঠিক কী নিয়ে, তাতে নানা পক্ষের লোকজনই বা কী বলছেন এবং দেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাবই বা কী হতে পারে– এই প্রতিবেদনে থাকছে তারই খোঁজখবর।
অর্থের কদর্য প্রদর্শনী?
মার্চ মাসের গোড়ায় যখন মহাসমারোহে আম্বানি পরিবারের ছোট ছেলের বিয়ের প্রাক-বিবাহ অনুষ্ঠানমালা চলছে, তখন দেশটির সুপরিচিত আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট প্রশান্ত ভূষণ একটি বিতর্কিত টুইট করেছিলেন।
তিনি তাতে লেখেন, এই প্রি-নাপ এক্সট্রাভ্যাগেনজার নামে অর্থ ও ক্ষমতার যে কদর্য ও অশ্লীল প্রদর্শনী চলছে তা রীতিমতো বমির উদ্রেক করে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের তারকারা যে নিজেদের এভাবে ছোট করে সেই জোয়ারে গা ভাসাতে পারেন, সেটাও চরম লজ্জার একটা অসুখ। আর দেশের মূল ধারার মিডিয়া যে এই ইভেন্ট নিয়ে আবেগে থরথর, সেটাও তাদের দেউলিয়াপনারই পরিচয়!
এই মন্তব্যের পর দেশে বহু মানুষ সামাজিত যোগাযোগমাধ্যমে প্রশান্ত ভূষণকে যেমন সমর্থন করেছেন, তেমনি অনেকে আবার গালিগালাজেও ভাসিয়ে দিয়েছেন।
প্রবাসী ভারতীয়দের একটি প্ল্যাটফর্ম ‘ইন্ডিয়াফোরামস’-এ নরওয়ে-প্রবাসী একজন নারীও লিখেছেন, যেভাবে আম্বানি এখানে টাকা ওড়াচ্ছেন তা শুধু দৃষ্টিকটু ও ‘ভালগার’ই নয়, গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয়দের জন্য চরম অমর্যাদাকরও বটে!
ভারতেও অনেকে এভাবে ‘টাকা ওড়ানো’র নিন্দা করেছেন, তাদের সুরে সুরে মিলিয়েছেন পাকিস্তানের সিনেমা অভিনেত্রী ও তারকা জোয়া নাসিরও!
অনেক ভারতীয়র মতো জোয়া নাসিরও লিখেছেন, যে দেশে বহু মানুষের দুবেলা আজও ভরপেট খাবার জোটে না, সেখানে এরকম আচরণ মেনে নেওয়া যায় না!
এই বিয়ের জন্য গুজরাটের ছোট শহর জামনগরের ততোধিক ছোট এয়ারপোর্টকে যেভাবে সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল, তারও তীব্র সমালোচনা করেছেন অনেকে।
দেশটির প্রবীণ সাংবাদিক হরিশ খারে পাত্র অনন্ত আম্বানির মা নীতা আম্বানিকে খোলা চিঠি লিখে বিদ্রূপ করেছেন, আপনাদের অনুরোধে জামনগরকে রাতারাতি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট বানানোর সময় সরকার জাতীয় নিরাপত্তার যে সংজ্ঞা দেয়, উমর খালিদের জামিনের শুনানির সময়ও তারা যদি সেই একই সংজ্ঞা মেনে নিত!
‘নীতা বেন’-কে লেখা ওই চিঠিতে তিনি অবশ্য তাকে ধন্যবাদও দিয়েছেন একটা কারণে– মোদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই সব ডেস্টিনেশন ভারতের বাইরে না-করে দেশের মাটিতে করার জন্য।
তবে গত মধ্যরাত থেকে এই বিয়ের মঞ্চ, মুম্বাইয়ের ‘জিও কনভেনশন সেন্টার’ অভিমুখী সমস্ত রাস্তা যে শহরের পুলিশ তিন দিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে সেটাও মানতে পারছেন না বহু মুম্বাইবাসী।
মুম্বাই পুলিশ যুক্তি দিয়েছে, একটা ‘পাবলিক ইভেন্টে’র জন্যই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু শহরের নাগরিকদের প্রশ্ন, একজন শিল্পপতির ছেলের বিয়ে বা প্রাইভেট ইভেন্টকে কি কতৃর্পক্ষ কীভাবে সরকারি অনুষ্ঠানের তকমা দিতে পারে?
ভারতের সুপরিচিত সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার স্বাতী মুকুন্দের একটি ইনস্টা পোস্ট গত কয়েকদিনে রীতিমতো ভাইরাল হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি বলেছেন, যারা বলছেন না এই খরচ দিয়ে দুটো দেশের গরিব লোকদের দু’বছরের রেশন হয়ে যেত, তারা প্লিজ এসব ফালতু কথাবার্তা বন্ধ করুন!
তিনি বলেছেন, যিনি এই খরচ করছেন তিনি হাজার হাজার লোকের রুটিরুজি দিচ্ছেন, আপনি কী করেছেন? আর তিনি নিজের পয়সা নিজের বাচ্চার বিয়েতে খরচ করেছেন, আমি বলব বেশ করেছেন। তাতেও অনেক লোকের হাতে দুটো পয়সা আসছে।
তার চেয়ে বরং এই সমালোচকরা নিজের চড়কায় তেল দিন, পরামর্শ দিয়েছেন স্বাতী মুকুন্দ।
এদিকে প্রশান্ত ভূষণের টুইটের জবাবেই যেমন লেখক রোহিত ভাট মন্তব্য করেছেন, যেটাকে আপনি এক্সট্রাভ্যাগেনজা বা খরচের আতিশয্য বলছেন তাতে কিন্তু শত শত ভেন্ডর, সাবভেন্ডর (পরিষেবা প্রদানকারী) ও ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপার্জন হয়েছে।
তার পরেই তার পাল্টা আক্রমণ, আপনার মতো গর্দভদের সারা জীবনভর দেশের অর্থনীতিতে যে অবদান, তার চেয়ে এই একটা ইভেন্ট জাতীয় অর্থনীতিতে বহুগুণ বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে!
‘দ্য নট ওয়ার্ল্ডওয়াইড’ নামে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ওয়েডিং প্ল্যানিং কোম্পানির সিইও টিম চি-ও কিন্তু বিশ্বাস করেন, খরচখরচা বা আড়ম্বর নিয়ে যাই বিতর্ক হোক– এই বিয়ের অনুষ্ঠান অনেকগুলো খাতেই ভারতের জন্য লাভদায়ক হতে পারে।
তিনি বলেছেন, এতে নিশ্চিতভাবেই ভারতের ওয়েডিং ইন্ডাস্ট্রির রমরমা হবে, নতুন নতুন ট্রেন্ড তৈরি হবে, ওয়েডিং ভেন্ডরদের চাহিদা বাড়বে, ভারতের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসার ঘটবে এবং এগুলো সার্বিকভাবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ঘটাবে। তথ্যসূত্র: বিবিসি
