রাজধানীজুড়ে সহিংসতার ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ১ হাজার ৩৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ গ্র্রেফতার করেছে ১ হাজার ১৭২ জনকে। এর বাইরে র্যাব গ্রেপ্তার করেছে ১৭৬ জনকে। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ৪৩টি মামলায় ৫১৯ জন গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। তবে সারা দেশে এখন পর্যন্ত কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে বা কতটি মামলা হয়েছে সে ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তর নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি। ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের করা মামলায় নামসহ ও অজ্ঞাত হিসেবে ৯০ হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল হৃদয় চন্দ্র তড়ুয়া (২১) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। তার বাবার নাম রতন চন্দ্র তড়ুয়া। গত ২১ জুলাই সন্ধ্যার পর গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চট্টগ্রাম থেকে তাকে এনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
গতকাল সারা দেশের কোথাও কোনো সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি। অন্যান্য দিনের চেয়ে গতকাল রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে সিএনজি, ইজিবাইক, রিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করেছে। বিভিন্ন অলিগলির কাঁচাবাজার ও অন্যান্য দোকানপাট খোলা ছিল। দুপুরে কারফিউ শিথিল করার পর সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল বেড়ে যায়। অনেক এলাকায় যানজট লেগে যায়। তবে সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় যানবাহন চলাচল কমেছে। রাজধানীর রমনা, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, পল্টন, মতিঝিল, ডেমরা, মিরপুর, রামপুরা, বাড্ডা, উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, বনানী, গুলশান, ধানমন্ডি, কলাবাগান, নিউমার্কেট, ওয়ারী, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর থানায় এসব মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া, পুলিশের ওপর হামলা, নাশকতা, হত্যাসহ নানা ধরনের অপরাধের কথা এসব মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত গ্র্রেফতার ব্যক্তিদের এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
ডিএমপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর যেসব এলাকায় দুর্বৃত্তরা নাশকতা চালিয়েছে সেসব এলাকার বিভিন্ন ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ ইতিমধ্যে সংগ্রহ করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। এছাড়া ঘটনাস্থলে অনেকেই মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছেন, তাদের কাছ থেকে ভিডিও সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজের পাশাপাশি নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল কললিস্ট সংগ্রহ করা চেষ্টা চলছে। কললিস্টে থেকে সন্দেহজনক কল রেকর্ড রয়েছে কি না যাচাই করা হবে।
গত কয়েক দিনের সহিংসতায় রাজধানীর সবচেয়ে বেশি আলোচিত স্পট ছিল যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, রায়েরবাগ ও সাইনবোর্ড এলাকা। যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক ঘিরেই নাশকতাকারীদের সহিংসতা ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এই এলাকায় সহিংসতা প্রতিরোধ করতে গিয়ে তিন পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ-বিজিবি লক্ষ্য করে নাশকতাকারীরা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে। অনেক পুলিশ সদস্য নাশকতাকারীদের গুলিতে আহত হয়।
ঢাকার বাইরে গ্র্রেফতার ৬৯৮
কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় রাজধানীর বাইরে ৫১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী। প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর :
ভাঙ্গা (ফরিদপুর): গত শুক্রবার ভাঙ্গার সোয়াদি বাসস্ট্যান্ডে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনায় গত শনিবার পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। মামলায় ৪৮ জনের নামে ও অজ্ঞাত ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় গতকাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীসহ ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঈশ্বরদী (পাবনা): ঈশ্বরদীতে গত দুই দিনে বিএনপি-জামায়াতের ২০ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এদের মধ্যে পৌর-বিএনপির সহসভাপতি জসিম শেখ, উপজেলা কৃষকদলের সদস্যসচিব হাজী মাঈনুল সরদার রয়েছেন। থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, আটক কয়েক জনের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ রয়েছে।
ময়মনসিংহ: কোটাবিরোধী আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় ময়মনসিংহ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এ কে এম শফিকুল ইসলাম ও জামায়াতের অঙ্গসংগঠন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের মহানগর নেতা আনোয়ার হোসেন সুজনসহ ৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে কোতোয়ালি, ফুলপুর ও গৌরীপুর থানায় শতাধিক লোকের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত ৩ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে সাতটি মামলা হয়েছে। আন্দোলনে গৌরীপুরের তিন ছাত্র, ফুলপুরে এক কৃষক ও ময়মনসিংহ শহরে এক ছাত্র নিহত হন। ২০ জন গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক বিক্ষোভকারী আহত হন। গুরুদাসপুর (নাটোর): জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহিম নেওয়াজসহ বিএনপির ২১ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এছাড়া চট্টগ্রামে ১১ মামলায় বিএনপি-জামায়াতের তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে গতকাল পাঁচ জনকে, বরিশালে ৭৯ জনকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে তিন জনকে ও কাচপুরে সহিংসতার ঘটনায় সোনারগাঁওয়ে বিএনপির ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজশাহী জেলা ও মহানগরীতে ১৬ মামলায় গ্র্রেফতার ১৭৯
রাজশাহী: কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতা ও নাশকতার ঘটনায় রাজশাহী জেলা ও মহানগরীতে ১৬টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত মোট ১৭৯ জনকে পুলিশ গ্র্রেফতার করেছে। রাজশাহী মেট্টোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) এবং জেলা পুলিশের মুখপাত্রদ্বয় এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. রফিকুল আলম জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে নাশকতা ও সহিংসতার ঘটনায় জেলার বিভিন্ন থানায় সোমবার পর্যন্ত ৯টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৮৬ জনকে পুলিশ গ্র্রেফতার করেছে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্র্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গ্র্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. জামিরুল ইসলাম জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে নাশকতা ও সহিংসতার ঘটনায় রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া, মতিহার ও চন্দ্রিমা থানায় সোমবার পর্যন্ত মোট সাতটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গতকাল দুপুর পর্যন্ত পুলিশ ৯৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
