কারফিউর মধ্যেও প্রবাসী ভোটার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুধুমাত্র ভোটার ভেরিফিকেশন ছাড়া বায়োমেট্রিক, ছবি তোলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিভিন্ন দেশে প্রবাসী ভোটারদের এই কার্যক্রমের আওতায় স্মার্ট কার্ড পাচ্ছেন। মঙ্গলবার সৌদি আরবের রিয়াদে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন নির্বাচন কমিশন মো. আনিসুর রহমান। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়ালের ছয় দিনের মালয়েশিয়ার সফর স্থগিত করেছেন। গত ২০ জুলাই সিইসির মালয়েশিয়া যাওয়ার পূর্ব নির্ধারিত শিডিউল ছিল। তবে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে জারিকৃত কারফিউয়ের কারণে সিইসি তার সফর স্থগিত করতে বাধ্য হন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ ইত্তেফাককে বলেন, ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকার কারণে শুধুমাত্র ভোটার ভেরিফিকেশন ছাড়া প্রবাসীদের আঙুলের ছাপ ও ভোটারের ছবি তোলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী ভোটার কার্যক্রমের উদ্বোধন সংক্রান্ত সিইসি মালয়েশিয়ার সফর স্থগিত করেছেন।
ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা কার্যক্রম জোরশোরে শুরু করেছে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
গত ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রবাসী ভোটার কার্যক্রমের গতি পেয়েছে। আরব আমিরাত, ইতালি, কুয়েত, কাতার ও যুক্তরাজ্যের পর প্রবাসীদের এনআইডি সেবার লক্ষ্যে সৌদি আরবে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বিগত কমিশন ২০১৯ সালে প্রবাসে এনআইডি সরবরাহের উদ্যোগটি নিলেও করোনা মহামারির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান কমিশন পুনরায় প্রবাসী ভোটার কার্যক্রম শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে নির্বাচন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া, দুবাই, কুয়েত ও কাতারে গিয়ে এই এনআইডি কার্যক্রমের উদ্বোধন করে এসেছেন।
প্রবাসী ভোটার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান সৌদি আরবের রিয়াদে এনআইডি কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। আজ জেদ্দায়ও এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন তিনি। তার সঙ্গে সিস্টেম ম্যানেজার মো. রফিকুল হক ও একান্ত সচিব শাহ মো. কামরুল হুদা সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন। অন্যান্য দেশের মতো এ দেশটিতেও অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় পুরো কার্যক্রমটি পরিচালিত হচ্ছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, ইতালি, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইতালি, কুয়েত, কাতার ও যুক্তরাজ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণ উদ্বোধন হয়েছে। কুয়েতে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবিব খান, যুক্তরাজ্যে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর, ইতালিতে বেগম রাশেদা সুলতানা এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রবাসী এনআইডি কার্যক্রমে যুক্ত হতে একের পর এক বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। পরে পর্যায়ক্রমে ওমান, বাহরাইন, জর্ডান, সিংগাপুর, লেবানন, লিবিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মালদ্বীপ ও কানাডাতে এনআইডি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০১৯ সালে প্রবাসে এনআইডি সরবরাহের উদ্যোগটি হাতে নেয়। এরপর ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের অনলাইনের ভোটার করে নেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করে ইসি। এর আগে ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রবাসীদের মাঝে এ কার্যক্রম শুরু করা হয়। তার আগে একই বছর ৫ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি এবং স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার অংশ হিসেবে অনলাইনে আবেদন নেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এরপর সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপে থাকা বাংলাদেশিদের জন্যও এ সুযোগ চালু করা হয়। সে সময় অনলাইনে আবেদন নিয়ে সেই আবেদন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপজেলা থেকে যাচাই করে সত্যতা পেলে সংশ্লিষ্ট দেশে দূতাবাস থেকে এনআইডি সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এরপর করোনা মহামারির কারণে থমকে যায় দূতাবাসের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা। কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সে কার্যক্রমকে ফের উজ্জীবিত করেন। এক্ষেত্রে আগের প্রক্রিয়াগুলো বাদ দিয়ে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে দেশের উচ্চ আদালত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার সংবিধান স্বীকৃত বলে ঘোষণা দেন। দীর্ঘ ২৬ বছরেও সেই ঘোষণা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বিশ্বের ১৫৭টি দেশে কোটির ওপরে প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। বর্তমান কমিশনের এই উদ্যোগে তাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের অবসান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা। এর আগে ১/১১ ড. শামসুল হুদা কমিশনের দুজন কমিশনার এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিতে যুক্তরাজ্য সফর করেছিলেন। এরপর কে এম নূরুল হুদা কমিশনও একই কার্যক্রম শুরু করেছিল। এর পেছনে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল। কিন্তু প্রবাসীদের ভোটার করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপ এবং আমেরিকা, কানাডাসহ বিশ্বের অনেক দেশে বহুসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক অবস্থান করছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও তারা দেশে আসার সুযোগ পান না। যার ফলে ভোটার তালিকায় তাদের নাম যেমন অন্তর্ভুক্ত হয় না, তেমনি তারা জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্রের পরিচিতি পত্র না থাকায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। এজন্য তাদের ভোটার করার ব্যাপারে বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশন ইতিবাচক।
