কোটা আন্দোলন নিয়ে সহিংস ঘটনার পুরো বিষয়টি নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মূল্যায়ন শুরু করেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্যের গাফিলতি ছিল কিনা সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করতে গিয়ে উঠে এসেছে পুলিশে জনবল সংকট, পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকা, ভাড়া করা বাসা বাড়িতে থানা ও ফাঁড়ি স্থাপনসহ নানা সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির চিত্র। গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মতবিনিময়কালে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, ‘এত বড় সহিংসতা আগে থেকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দারা আগাম তথ্য দিতেও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’ এসব বিষয়ও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি আন্দোলনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা রয়েছে যাত্রাবাড়ি থেকে সানারপাড় এবং রামপুরা টিভি সেন্টার থেকে বাড্ডা পর্যন্ত। এরপর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, আজিমপুর এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হয়েছে। মেট্রোরেল স্টেশন, সেতুভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে সহিংসতা হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে ঘটে যাওয়া এত বড় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি হয়েছে কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, এ সহিংসতায় তিন পুলিশ সদস্যর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছে সহস্রাধিক।
রাজধানীর কদমতলী থানা প্রধান সড়ক থেকে অনেক ভিতরে আবাসিক এলাকায় একটা ভাড়া বাসায়। রাজধানী ছাড়াও সারাদেশে এই ধরনের ভাড়া করা ভবনে অপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে অনেক থানা। অথচ একটা থানা হওয়ার কথা এমন জায়গায়, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকবে, তাৎক্ষণিক যাতায়াত করা যাবে। ঘর ভাড়া করে থানা চালানো মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এখানে নিরাপত্তার প্রশ্ন আসে। কোন ঘটনা ঘটলে যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটে।
বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী পুলিশে জনবল কম। যানবাহন সংকটও চরম। এছাড়া অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও কম। যদিও বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় কম। সহিংসতায় যারা আহত হয়েছেন, তাদের অনেকে সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তারা বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পিছপা হয়নি পুলিশ। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ এই পুলিশই করেছিল। করোনা মহামারির সময়ও নিরাপত্তার পাশাপাশি সেবার কার্যক্রম আমরা অব্যাহত রেখেছিলাম। পিতার লাশ রেখে সন্তান চলে গেছে, সন্তানের লাশ রেখে পিতা-মাতা চলে গেছে। সেই লাশগুলোও আমরা আপনজনের মতো দাফন করেছি। ওষুধপত্রসহ খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছি। আমরা সেই পুলিশ বাহিনী। দেশের নিরাপত্তাসহ যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আসছি। এবারও এ যাবত্কালের ভয়াবহ সহিংস ঘটনা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম। আসলে এই বিষয়টি কেউ আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি। এটার পিছনে যে কত বড় গভীর ষড়যন্ত্র ছিল তা এখন সবাই বুঝতে পেরেছি। এখানে গোয়েন্দাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠাটা স্বাভাবিক। এটা এক দুই দিনে হয়নি। সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ছিল সরকারের বিরুদ্ধে।
যদিও আন্দোলনকারীরা বলেন, এই সহিংসতায় তারা জড়িত না। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি অপশক্তি পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। এ কারণে প্রাথমিকভাবে মোকাবেলা করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে হিমশিম খেতে হয়েছে। সেনাবাহিনী নামানোর পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন সদস্যের রহস্যজনক ভূমিকা আছে কিনা তা চিহ্নিত করা হবে। পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এরমধ্যে একাধিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, আমরা জনবলের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাই। কিন্তু তা অনুমোদন পায় না। এই ঘটনা প্রমাণ করে, পুলিশে বর্তমানে যে জনবল রয়েছে, তার চেয়ে তিনগুণ জনবল ও যানবাহন প্রয়োজন। অনেক সময় রিক্যুইজিশন গাড়ি দিয়ে ডিউটি করতে হয় পুলিশের। অথচ মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের স্কুলে কিংবা কাঁচাবাজারে যাওয়ার জন্য সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে আসছে। এটা রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়। একটি রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত হলো নিরাপত্তা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক থাকলে সব ঠিক। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। এসির মধ্যে বসে সব ঠিকঠাক আছে বললে হবে না। দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রধান চাবিকাঠি হলো নিরাপত্তা। এটাতে বাজেটও সেইভাবে বরাদ্দ রাখতে হবে। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে এই অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন বলে শীর্ষ কর্মকর্তারা অভিমত ব্যক্ত করেন।
