কোটার আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে রহস্য

  • শুরুতে আন্দোলন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক, ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা চলছিল কর্তৃপক্ষের
  • নেপথ্যের কারণ খুঁজছেন গোয়েন্দারা
আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৪, ০১:৩২

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কারের যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেটা শুরুতেই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য এলাকায়। এরপর সেটা শাহবাগ পর্যন্ত যায়। সে সময় শিক্ষকদের একটি গ্রুপের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আলোচনাও চলছিল। কিন্তু কাদের ইন্ধনে এ আন্দোলন বাইরে ছড়িয়ে যায়, নেপথ্যের সে কারণ খুঁজছেন গোয়েন্দারা। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের একটি গ্রুপ আগে থেকেই সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তারা চেষ্টা করেছেন আন্দোলন বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার। অন্যদিকে যারা সত্যিকারের কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছিলেন, তারা চেয়েছিলেন আলোচনার মাধ্যমে সামাধান। কিন্তু একটা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন আর তাদের হাতে থাকেনি, সরকারবিরোধী শক্তি এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফলে এ সহিংসতার সঙ্গে প্রকৃত কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা জড়িত নন। তারা এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত নন। তারা নিজেরাও দাবি করেছেন, তাদের এ প্ল্যাটফর্মটি একটি চক্র ব্যবহার করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষকদের একটি দল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। দফায় দফায় আলোচনা চলাকালে হঠাৎ করেই বিস্ফোরণ ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে পড়ে সরকারবিরোধী একটি গ্রুপ। তারা চেষ্টা করেছে আন্দোলন বাইরে ছড়িয়ে দিতে। একজন শিক্ষক এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। যদিও সরকার থেকে আমাদের এমন কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তবুও আমরা শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করতে তাদের দাবিগুলো একত্রিত করে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের সঙ্গে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাও ছিলেন। তাদেরও বিষয়টি জানানোও হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে যে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়েছে, তাদের প্রস্তুতি আগে থেকেই ছিল। একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, সেটা আগে থেকে প্রস্তুতি ছাড়া সম্ভব নয়। হুট করেই এভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো যায় না। সরকারি স্থাপনাগুলোতে শত শত গাড়ি পোড়ানো হয়েছে। এগুলো পোড়াতে গান পাউডার ছাড়াও বিপুল পরিমাণ পেট্রোল ও কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হয়েছে। সেগুলো আগে থেকে সংগ্রহে না থাকলে হুট করেই সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বুধবার বলেছেন, এমন একটা কিছু হতে পারে আগে থেকেই আমরা ধারণা করেছিলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, শুরুতে যদি শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনকে গুরুত্ব দেওয়া হতো, তাহলে পরিস্থিতি এদিকে যেত না। শিক্ষার্থীদের দাবিকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং অনেকে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। আবার নানা বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে তাদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে একটি চক্র। চক্রটি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দিতে চেষ্টা চালিয়ে গেছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই দেশি-বিদেশি নানা চক্র সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তত্পর রয়েছে। নির্বাচন হয়ে গেলেও সে চক্র থেমে নেই, এমন কথা অনেক বার প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন। ফলে এ আন্দোলন ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া এবং এর পেছনে কারা অর্থ দিয়েছে, তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এদের শনাক্ত করার কাজও চলছে।

শিক্ষার্থীদের শুরুতেই নিবৃত্ত করা যেত কি না—জানতে চাইলে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক ইত্তেফাককে বলেন, ‘শুরুতেই যদি শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হতো, তাহলে পরিস্থিতি এদিকে যেত না। আগেও আমরা দেখেছি যে কোনো অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ বা সরকারবিরোধী পক্ষ ঢুকে পড়ে। তখনই এ ধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ে। এবারও একই ঘটনা দেখলাম। পরিস্থিতিকে এদিকে যেতে দেওয়া ঠিক হয়নি। সবাই যদি সংযত থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন, তাহলে ভালো হতো। দেরিতে হলেও সবার শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। ফলে আমরা আবারও স্বাভাবিক একটা অবস্থার দিকে দ্রুতই যেতে পারব বলে আমি আশা করছি।’

ইত্তেফাক/এসটিএম