চাহিদা কম, দুধ নিয়ে বিপাকে খামারিরা

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৪, ০৮:১০

দেশের চলমান পরিস্থিতিতে পরিবহনসংকটের পাশাপাশি চাহিদা পড়ে যাওয়ায় খামারে উত্পাদিত দুধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পাবনাসহ আশপাশের অনেক জেলার দুগ্ধ খামারিরা। দেশের অন্যতম গরুর দুধ উৎপাদনকারী এসব এলাকার খামারিরা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ওপর পরিবহন সংকটের কারণে বাইরে থেকে খড়, ভুসিসহ বিভিন্ন ধরনের গোখাদ্য আসতে না পারায় হঠাৎ করেই গোখাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। এতে খামারিদের লোকসান আরো বেড়ে গেছে।

দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর এবং সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর, উল্ল­াপাড়া, চৌহালী, তাড়াশ উপজেলা নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের প্রধান গরুর দুধ উৎপাদনকারী এলাকা। প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী এ এলাকার ২৫ হাজারেরও বেশি খামারে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ লিটার গরুর দুধ উত্পাদিত হয়। প্রচুর দুধ উত্পাদিত হওয়ায় এ এলাকা থেকে মিল্ক ভিটা, আড়ং, প্রাণ ডেইরি, ফার্মফ্রেশ, অ্যামোমিল্ক, আফতাব, রংপুর ডেইরিসহ কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান তরল দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে সারা দেশে খোলা বাজারে বিক্রি করে থাকে।

খামারিরা অভিযোগ করে বলেন, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোই হলো খামারিদের দুধ বিক্রি করার প্রধান ভরসা। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান এমনিতেই দুধের সঠিক দাম দেয় না। এর ওপর কমপ্লিট শাটডাউন, কারফিউসহ দেশের চলমান সহিংসতার অজুহাতে এসব প্রতিষ্ঠান খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনাও কমিয়ে দিয়েছে। ফলে খামারিদের উত্পাদিত দুধের একটি বড় অংশ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। এই দুধ খামারিরা খোলা বাজারে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

খামারিদের ভাষ্য, গোখাদ্যের দাম ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার দুধের উত্পাদন খরচ পড়ে ৭০ টাকার কাছাকাছি। কিন্তু দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি লিটার দুধের দাম দেয় ৪৮ থেকে ৫২ টাকা। এমন দামেও দুধ বিক্রি করতে না পারায় খামারিদের লোকসানের পাল্লা আরো ভারী হচ্ছে।

খামারিরা জানান, কোটাবিরোধী আন্দোলন জোরালো হওয়ার পর থেকেই ঢাকা শহরে দুধের চাহিদা কমতে থাকে। এ ছাড়া এ এলাকার শতাধিক ছানা তৈরির কারখানাগুলোও দুধ কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ছানার কারখানাগুলো আগে প্রতিদিন ৬০ হাজার থেকে ৭০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে ছানা তৈরি করত। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ছানা সরবরাহ করা হতো। কয়েক দিন ধরে দেশের মিষ্টির দোকানগুলোর বন্ধ থাকায় এখন আর ছানার চাহিদা নেই। তাই বেশির ভাগ ছানা তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

বেড়া পৌর এলাকার আমাইকোলা মহল্লার দুধ ব্যবসায়ী মাসুদ শেখ জানান, স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে দুধ কিনে তিনি ঢাকার বিভিন্ন দোকানের মাধ্যমে বিক্রি করে থাকেন। কোটা আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে প্রতিদিন ২ হাজার থেকে ৩ হাজার লিটার ঢাকায় পাঠাতেন। অথচ গত এক সপ্তাহ ধরে ২০০ থেকে ৩০০ লিটার দুধ পাঠাচ্ছেন। তিনি জানান, খামারিদের কাছ থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতি লিটার দুধ ৫০ থেকে ৫২ টাকায় কিনতেন। অথচ কমপ্লিট শাটডাউন ও কারফিউয়ের কারণে চাহিদা পড়ে যাওয়ায় তিনি গত এক সপ্তাহ ধরে ৩৮ থেকে ৪০ টাকা লিটার দরে দুধ কিনেছেন। এর পরেও অনেক খামারির দুধ তিনি কিনতে পারেননি। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার যানবাহন চলাচল করায় দুধের চাহিদা কিছুটা বেড়ে যায়। এ কারণে দুধের দামও কিছুটা বেড়েছে। গতকাল তিনি খামারিদের কাছ থেকে ৪৫ থেকে ৪৬ টাকা লিটার দরে দুধ কিনেছেন।

বেড়া উপজেলা ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজা খানম বলেন, ‘এমনিতেই খামারিরা দুধের ন্যায্য দাম পান না। এর ওপর প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ সংগ্রহ কমিয়ে দেওয়ায় খামারিরা উৎপাদিত দুধ খোলা বাজারে ব্যাপক লোকসান দিয়ে বিক্রি করছেন। এর মধ্যে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে গোখাদ্যের দাম ব্যাপক বেড়েছে। এ অবস্থায় আমরা (খামারিরা) আর পারছি না।’

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে অবস্থিত মিল্কভিটার বাঘাবাড়ীঘাট দুগ্ধ এলাকার উপমহাব্যবস্থাপক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘খামারিদের সব রকম দুঃসময়ে আমরা তাদের পাশেই থাকি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ কমালেও আমরা বরং বাড়িয়েছি। আমাদের কাছে আসা সব খামারির দুধই আমরা নিয়ে নিচ্ছি। আগের মতোই স্ট্যান্ডার্ড মানের দুধের দাম ৫২ টাকা লিটার দরে নেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিন এই এলাকা থেকে আমরা এখন ৬৫ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করছি।’

বেড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, এ এলাকায় প্রচুর পরিমাণ দুধ উৎপাদিত হয়। তাই এ এলাকার বেশির ভাগ মানুষের সংসার চলে দুধ বিক্রি করে। নানা সমস্যায় তারা আজ চরম বিপাকে আছেন।

ইত্তেফাক/এসটিএম