ভালো ইভিএমগুলোও নষ্ট হওয়ার পথে

সুরক্ষায় মাঠ পর্যায়েও ওয়্যারহাউজ নির্মাণের পরিকল্পনা ইসির

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৪, ০৮:০০

বিভিন্ন নির্বাচনে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পড়ে থাকায় নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এমতাবস্থায় নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সতর্ক করে চিঠি দিয়েছেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা। এই পরিস্থিতিতে ১০টি অঞ্চলে ইভিএম সংরক্ষণের জন্য ওয়্যারহাউজ তৈরির প্রতি জোর দিয়েছেন তারা। গত বৃহস্পতিবার ইসি সচিব শফিউল আজিম স্বাক্ষরিত মাসিক সমন্বয়সভার কার্যবিবরণী থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

যদিও ইসির হাতে সংরক্ষিত দেড় লাখ ইভিএমের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার প্রায় নষ্ট। ভালো থাকা ৪০ হাজারও নষ্টের পথে। সেইগুলো সংরক্ষণের ওপর জোর দিতে বলেছেন কর্মকর্তারা।

এতে বলা হয়েছে, বর্তমানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইভিএম সংরক্ষিত আছে এবং কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের নিচতলায় স্যাঁতসেঁতে অবস্থায় আছে। এতে ইভিএমগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইভিএম সংরক্ষিত থাকায় সেই সব প্রতিষ্ঠানে পাঠদানেও অসুবিধা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক ১০টি অঞ্চল তথা ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর ও রাজশাহীর মধ্যে সম্প্রতি ঢাকায় একটি ওয়্যারহাউজের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে উন্নতমানের এসব ভোটযন্ত্রর সুরক্ষায় ইসির কোনো সংরক্ষণব্যবস্থা নেই।

ইসি সচিব বলেন, ইতিমধ্যে তারা ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে একটি ওয়্যারহাউজ তৈরির জন্য জমি চেয়েছেন। জমি পেলে ইভিএম সংরক্ষণসহ সার্বিক ব্যবস্থা নেবে কমিশন। সুরক্ষা নিশ্চিতে এবার ঢাকার বাইরেও ওয়্যারহাউজ তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। 

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মাসিক সমন্বয়সভায় ওয়্যারহাউজ নির্মাণের আলোচনার পর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ইভিএম প্রকল্প পরিচালক ও সব আঞ্চলিক কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন ইসি সচিব শফিউল আজিম।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ইভিএম সংরক্ষণের জন্য অঞ্চলভিত্তিক ওয়্যারহাউজ তৈরির খসড়া ডিজাইন, জমি এবং অন্যান্য ব্যয়ের প্রাক্কলন প্রদান করতে হবে। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের চাহিদা পাঠাতে হবে।

২০১০ সালের ১৭ জুন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন দেশের ভোট-ব্যবস্থায় ইভিএম ব্যবহার শুরু করে। সে সময় তারা বুয়েট থেকে ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে মেশিন তৈরি করে নেয়। ঐ কমিশনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশনও ভোটযন্ত্রটি ব্যবহার করে। তবে ২০১৫ সালে রাজশাহী সিটি নির্বাচনে একটি মেশিন অচল হয়ে পড়ায় তা আর ব্যবহারের উপযোগী করতে পারেনি রকিব কমিশন। পরে তারা বুয়েটের তৈরি স্বল্পমূলের ঐ মেশিনগুলো পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং উন্নতমানের ইভিএম তৈরির পরিকল্পনা রেখে যায়। ২০১৭ সালে কে এম নূরুল হুদার কমিশন এসে বুয়েটের তৈরি ইভিএমের চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি দামে মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) কাছ থেকে উন্নতমানের ইভিএম তৈরি করে নেয় তারা। এতে মেশিনপ্রতি ব্যয় হয় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকার মতো। হাতে নেওয়া হয় ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প।        

সেই প্রকল্প থেকে দেড় লাখ ইভিএম কেনে রকিব কমিশন। প্রকল্পের সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের ব্যবস্থা না থাকায় সেই উন্নতমানের ইভিএমের মেয়াদ ১০ বছর হলেও পাঁচ বছর যেতে না যেতেই অকেজো হওয়া শুরু করে। ২০২৩ সালে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে এসে প্রায় প্রতিটি সেটেই কোনো না কোনো সমস্যা দেখা দেয়। প্রায় ৪০ হাজারের মতো মেশিন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। অবশিষ্ট ১ লাখ ১০ হাজার মেশিনের মধ্যে অধিকাংশগুলোতে ধরা পড়ে নানা ধরনের ত্রুটি। বর্তমানে অকেজো ইভিএমের সংখ্যা আরো বেড়েছে।

ইভিএম প্রকল্প পরিচালক কর্নেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, বর্তমানে ১ লাখ ১০ হাজার মেশিন ব্যবহারের অনুপযোগী। আর ৪০ হাজারের মতো মেশিন নির্বাচনে ব্যবহার করা যাচ্ছে। তবে শতভাগ ত্রুটিমুক্ত মেশিন একটিও নেই। সব মেশিনেই কোনো না-কোনো সমস্যা আছে। তবে সেগুলো সারিয়ে নির্বাচনে ব্যবহারযোগ্য।

ইত্তেফাক/এমএএম