ভালোবাসার শহর বলা হয় প্যারিসকে। পুরো দুনিয়াকে ভালোবাসা ছড়িয়ে দিতে বলল প্যারিস অলিম্পিক। আকাশে দুই বিমান আচমকা এসে হাজির। বিকট শব্দ করে দুদিকে ছুটে গেল, প্যারিসের আকাশে অসাধারণ সৌন্দর্যে ফুটে উঠল ভালোবাসার চিহ্ন, লাভ। গোলাপি রঙের ভালাবাসা। প্যারিস অলিম্পিক গেমসের উদ্বোধনী দিনে ফ্রান্স জানিয়ে দিল সবাইকে ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধে নাও।
শুক্রবার বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টা, প্যারিসের ঘড়িতে বিকাল সাড়ে ৭টা। সূর্য ডুবতে তখনো কয়েক ঘণ্টা বাকি। প্যারিসের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সেইন নদীর তীরে লাখ লাখ মানুষের সমাগম। আরও কয়েক লাখ মানুষ নদীর তীরমুখী। ইংলিশ চ্যানেলের মোহনা থেকে আসা সেইন নদীর বাঁকে বাঁকে অলিম্পিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে আসা ছয় কিলোমিটার পর্যন্ত মানুষের ভিড়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে দর্শক। ফরাসিদের ভিড়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো, ফিনল্যান্ডসহ পৃথিবীর দুইশর বেশি দেশ থেকে দর্শক এসেছেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে।
এমন কিছু দেশের মানুষ এসেছেন যাদের দেশের নাম সাধারণ মানুষের অনেকেরই জানা নেই। সাধারণের কাছে খুব একটা পরিচিত না। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলে সবাই যেন এক হয়ে গেলেন। সবার আনন্দ এক স্রোতে। পৃথিবীর অলিম্পিক ইতিহাসে এমন সুন্দর অনুষ্ঠান আর হয়নি। স্টেডিয়ামের চার দেওয়ালের ভেতরে ঘিরে থাকা চিরায়িত অনুষ্ঠান সবার সামনে তুলে এনেছে ফ্রান্স। ১০০ বছর পর অলিম্পিক গেমসের আয়োজন করতে গিয়ে তারা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তা আর কারো পক্ষে করা সম্ভব কি না বলা কঠিন। নদীর বুকে আয়োজন। সবাই দেখবে।
প্যারিসের আবহাওয়া অফিস আগেই জানিয়েছিল দুই দিন বৃষ্টি হবে। প্যারিসে সকালে বৃষ্টি হলেও দুপুরে ছিল না। তার ওপর উদ্বোধনী দিনের সকালেই দীর্ঘ লাইন ঠেলে ঢুকতে হয়েছে। দুই মাস আগেই প্যারিসবাসীকে জানিয়েছিল ৩৩তম অলিম্পিক গেমস চলাকালীন প্যারিসে ঢুকতে হলে তিনটি কারণের একটি দেখাতে হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগেই খবর ছড়িয়েছিল রেল সেবা আক্রমণের শিকার হয়েছে, তাতেও থেমে যায়নি কেউ।
প্যারিসের প্যারিসের ১০০ কিলোমিটার আকাশ পাহারা দিয়েছে ফ্রান্স। ধারেকাছে সাধারণ বিমানও আসতে দেয়নি। জঙ্গি হামলার কথা জানার পরও সেইন নদীর বুকে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে খোলা যে সাহস দেখিয়েছে তা সারা জীবন মনে রাখার মতো। উদ্বোধনী দিনে প্যারিস শহরে পায়ে পায়ে পুলিশ সেনাবাহিনী। যেদিকেই চোখ সেদিকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কোথাও কোথাও গাড়ি দিয়ে রাস্তা আটকে দিয়েছে। প্যারিস শহরটাকে সব শহর থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। প্যারিসে ঢোকার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ভারী অস্ত্রসজ্জিত পুলিশ সোনাবাহিনী এমনভাবে দাঁড়িয়ে, মনে হচ্ছিল যুদ্ধময়দানে প্রবেশ করছেন সবাই। বিভিন্ন রাস্তায় নিরাপত্তার নিয়ম মেনে ঠেলেঠুলে নদীর তীরে আগেই জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা ছিল বড় ছোট, কোলের শিশু থেকে শুরু করে হুইল চেয়ারে আসা শারীরিক প্রতিবন্ধীদের মধ্যেও। সেতুর নিচে আগুনের সঙ্গে পানির সংমিশ্রণ, মুগ্ধ করেছে দর্শককে। বড় পর্দায় চলছিল টক শো। ফ্রান্সের যেসব ক্রীড়াবিদ দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন তাদের নিয়ে স্মৃতি কথায় মালা গাঁথছিলেন উপস্থাপক, আর তা দেখে দর্শক যেন মন্ত্রমুগ্ধ।
বড় পর্দায় মিউজিকের শব্দে আগমন ঘটে ৯৮ বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স অধিনায়ক জিনেদিন জিদানের। স্যুটেড-বুটেড জিদান মশাল নিয়ে ছুটছেন, আর তার পেছনে ছুটছে তিন শিশু। একটা সময় বাধ্য হয়ে নাছোড়বান্দা শিশুর হাতে মশাল তুলে দিয়ে জিদান ইশারা দিলেন, 'আগামী প্রজন্মের মশালবাহক তোমরা, এগিয়ে যাও।' এরই মধ্যে শুরু হয়ে যায় বৃষ্টি। আর যেন থামছেই না। ধারণা ছিল অনেকেই বাড়ি ফিরে যাবেন। কোলের শিশু কিংবা বৃদ্ধ কিংবা হুইল চেয়ারে আসা ৮৯ বছরের মানুষটি বৃষ্টি মানতে পারবে না। ঘুরে ঘুরে দেখা গেল উলটো চিত্র, পা রাখারও জায়গা হচ্ছে না। বৃষ্টি হচ্ছে মানুষ যেন স্ট্যাচুর মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। বৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে নদীর তীরে মানুষের ভিড় আরও বাড়ছে। ছাতা এনেছেন বৃষ্টিতে ভিজতে হচ্ছে, রেইন কোট এনেছেন তবুও ভিজতে হয়েছে। অনুষ্ঠানের উত্তেজনায় মানুষের ভেতরে উচ্ছ্বাস আরও বেড়ে যায়। বৃষ্টিতে ভিজছেন, অনুষ্ঠানও দেখছেন।
বিশ্ববিখ্যাত সংগীতশিল্পীদের গানের তালে নাচছেন সবাই, উপভোগ করছেন ফরাসিদের প্রিয় ফ্রেঞ্চ শো। একদিকে বড় পর্দার অনুষ্ঠান দেখছেন, অন্যদিকে নৌকায় করে ক্রীড়াবিদদের প্যারেড চলছে। ফাঁকে ফাঁকে বড় পর্দায় চলছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ফ্রান্স দেখাচ্ছে তাদের ইতিহাস, তারা কীভাবে বিশ্বের কাছে অন্যতম সেরা দেশ হয়েছে, শিল্প, সংস্কৃতি আর মানুষের প্রতি ভালোবাসার বন্ধন বেঁধে দিতে পারার নিপুণ কারিগর তারা। বলা হচ্ছে ভয়কে জয় করো, জীবনকে উপভোগ করো। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কী থাকবে তা নিয়ে এক মাস গোপন রাখা হয়েছিল, এমনকি মূল অনুষ্ঠানের এক দিন আগেও মহড়া করেনি। প্রমাণ করেছে ভয় মানুষকে পিছিয়ে দেয়। বুক ফুলিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে প্যারিস অলিম্পিক।
সেইন নদীর দিকে প্যারিসবাসীর চোখ ছিল না। ১০০ বছর ধরে নদীতে ময়লা পড়েছিল। জমতে জমতে এমন অবস্থা হয়েছিল যে এবার অলিম্পিক গেমস উপলক্ষ্যে নদী পরিষ্কার করতে নাকি আড়াই বছর লেগেছে। নদীতে প্রাণ ফিরেছে, পুরো দুনিয়া জেনে গেছে সেই নদীর গল্প। ইতিহাসের পাতায় সোনার হরফে লেখা হয়ে গেছে। বাংলাদেশের যারা সেইন নদীর এপার থেকে ওপার দেখেছেন তাদের কাছে মনে হবে এটি ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর চেয়ে ছোট। সেইন নদী দেখে বুড়িগঙ্গা নদীর জন্য আফসোস হয়, দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
