নিরাপত্তার অজুহাতে অফিস করছেন না মিরসরাইয়ে জনপ্রতিনিধিরা

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৪, ০৯:৫৬

মিরসরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ২টি পৌরসভায় দেখা মেলছে না জনপ্রতিনিধিদের। মেয়র, কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান ও মেম্বারগণ কার্যালয়ে না আসায় বিঘ্নিত হচ্ছে নাগরিক সেবা প্রদান। এতে করে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সেবা নিতে আসা নাগরিকরা। নিরাপত্তা শঙ্কা থাকায় জনপ্রতিনিধিরা অফিস করছেন না বলে জানান কয়েকজন জনপ্রতিনিধি। এদিকে সোমবার (১২ আগস্ট) বারইয়ারহাট পৌরসভাসহ ভাঙচুর করা কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদ পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাগণ।

জানা গেছে, গত ৫ আগষ্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর সারা দেশের ন্যায় মিরসরাইতেও এলাকাছাড়া হয়ে যান জনপ্রতিনিধিরা। মিরসরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। থানায় পুলিশ না থাকায় নিরাপত্তার ভয়ে তারা অফিস করছেন না বলে জানা গেছে। 

 বারইয়ারহাট পৌরসভার ভাঙচুরের দৃশ্য। ছবি: ইত্তেফাক

এদিকে ৫ আগষ্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর মিরসরাই পৌরসভা ও বারইয়ারহাট পৌরসভাসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মিরসরাই পৌরসভার মেয়রের গাড়ি, বর্জ্য নিষ্কাশনের গাড়িসহ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া অফিসের বিভিন্ন কক্ষের জানালার গ্লাসও ভাঙ্গা হয়েছে। ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল। 

এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মিরসরাই উপজেলা ও অঙ্গ সংগঠনের কার্যালয় সংবলিত ব্যানার টাঙিয়ে মিরসরাই পৌরসভার দ্বিতল বিশিষ্ট একটি ভবনে দখলেরও অভিযোগ উঠেছে। বারইয়ারহাট পৌরসভার মেয়রের ব্যবহৃত গাড়ি ভাঙচুর করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পৌর কার্যালয়ের অফিসকক্ষে ভাঙচুর করে বেশ কয়েকটি কম্পিউটার ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে বারইয়ারহাট পৌরসভায় অফিস কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। উপজেলার ৮নং দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাইনবোর্ড ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। তবে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে জনপ্রতিনিধিরা না আসলেও সচিব ও ডিজিটাল সেবাকেন্দ্রের উদ্যোক্তারা অফিস করছেন।

পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল বারইয়ারহাট পৌরসভার গাড়ি। ছবি: ইত্তেফাক
 
উপজেলার ১নং করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসে নজরুল ইসলাম বলেন, নাগরিক সনদের জন্য পরিষদে কয়েকদিন এসে ফিরে যেতে হয়েছে। কবে থেকে কার্যক্রম চালু হবে তাও বলা যাচ্ছে না।

উপজেলার ৮নং দুর্গাপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কাঞ্চন কান্তি পাল বলেন, দুর্বৃত্তরা ইউনিয়ন পরিষদের প্রবেশ পথে থাকা দুটি সাইনবোর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে। পরিষদে গত ৫ আগষ্টের পর থেকে জনপ্রতিনিধিরা আসছেন না। তবে নাগরিক সনদ প্রদানসহ কিছু সেবা চালু রাখা হয়েছে। জন্ম নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদের আবেদনসহ বিভিন্ন আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। চেয়ারম্যান, মেম্বাররা আসলে অফিসিয়াল কাজ শেষ করে তা প্রদান করা হবে।

বারইয়ারহাট পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা সমর কান্তি চাকমা বলেন, পৌরসভার মেয়রের গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ কম্পিউটার, গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে বিভিন্ন কক্ষ ও আসবাবপত্র। পৌরসভায় গত কয়েকদিন যাবৎ মেয়র আসছেন না। কয়েকজন কাউন্সিলর আসেন মাঝে মাঝে। পৌর এলাকায় পয়নিষ্কাশন, লাইটিং, নাগরিক সনদ দেওয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু সেবা চলমান রয়েছে। কম্পিউটার ভাঙচুরসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলায় নাগরিক সেবা প্রদান ব্যহত হচ্ছে।

মিরসরাই পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম বলেন, দুর্বৃত্তরা পৌরসভার মেয়রের গাড়ি, বর্জ্য অপসারণ গাড়িসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। ভাঙচুর করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল, বেশ কয়েকটি অফিসকক্ষ। এছাড়া পৌরসভার দ্বিতল বিশিষ্ট একটি ভবনে বিএনপির কার্যালয় লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর থেকে মেয়র, কাউন্সিলরগণ পৌরসভায় আসেন না। তবে পৌর এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও ওয়ারিশ সনদ প্রদানসহ কিছু কিছু নাগরিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে। মেয়র ও কাউন্সিলররা অফিস না করলেও সেবা প্রত্যাশীরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওয়ারিশ সনদ গ্রহণসহ বিভিন্ন সেবা নিচ্ছেন।

উপজেলার ৯নং মিরসরাই সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামছুল আলম দিদার বলেন, নিরাপত্তা জনিত কারণে আমি ও মেম্বাররা পরিষদে যাচ্ছি না। আমরা পালিয়ে যাইনি। থানায় পুলিশ আসলে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হলে সবাই ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে যাবো। পরিষদে না গেলেও আমি সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে নাগরিক সেবা প্রদানের জন্য বিভিন্ন কাজ নিয়মিত করছি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মাহফুজা জেরিন বলেন, উপজেলার ১নং করেরহাট, ২নং হিঙ্গুলী, ১৫নং ওয়াহেদপুর, ১২নং খৈয়াছড়া ইউনিয়ন পরিষদ ভাঙচুর করা হয়েছে বলে চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন। এছাড়া মিরসরাই পৌরসভা ও বারইয়ারহাট পৌরসভায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ১৬টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ের কাজ করা হচ্ছে। উপজেলার ১নং করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অন্যান্য ইউনিয়ন ও পৌরসভার সেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। 

জনপ্রতিনিধিদের নিরাপত্তা প্রদান ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে মোতায়েন করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। 

ইত্তেফাক/এসজেড