নমনীয় সুদে ঋণ চায় ব্যবসায়ীরা

# সুদহার কমানো, ব্যাংক ঋণের কিস্তি তিন থেকে ছয় মাস বাড়ানোর দাবি

# ১ হাজার টাকার নোট বাতিলের কোনো পরিকল্পনা নেই

# ব্যাংকে বেআইনি তারল্য সহায়তা আর নয়: গভর্নর

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৪, ০২:৩৫

ব্যবসার নামে ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটকারীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, ব্যবসার নাম করে যারা লুটপাটে জড়িয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে ব্যবসায়ী সমাজ সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে বেতন-ভাতা পরিশোধে নমনীয় সুদে ঋণ, সুদহার কমানো, ব্যাংকঋণের কিস্তি তিন মাস থেকে ছয় মাস বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এমন কথা জানায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বাধীন একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল। বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার প্রতিনিধিদলটি গভর্নরের সঙ্গে কথা বলে।

ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিদলে ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আশরাফ আহমেদ, বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল প্রমুখ।

গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাত্ শেষে আবদুল আউয়াল মিন্টু সাংবাদিকদের বলেন, যারা অন্যায়ভাবে সম্পদ লুট করেছে, অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন করেছে এবং ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত দেয়নি, তাদের বিরুদ্ধ কঠোর ব্যবস্থা নিতে গভর্নরকে অনুরোধ করেছি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভালো ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে পারবে না।

গভর্নরের কাছে ব্যাংকঋণের কিস্তি তিন মাস থেকে ছয় মাস বাড়ানোর দাবি করেছেন বলে জানান এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমরা ঋণের কিস্তির সময়সীমা তিন মাস থেকে ছয় মাস বাড়ানোর কথা বলেছি। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তার পরও সময় না বাড়লে অনেক ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি হয়ে যাবে।’       

এফবিসিসিআই সভাপতি আরো বলেন, ‘জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের সরবরাহ-ব্যবস্থা ঠিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছি। এ বিষয়ে গভর্নর সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন। এছাড়া গত এক মাস থেকে দুই মাসে শিল্পকারখানার ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যবসায়ীদের নমনীয় সুদে ঋণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডলারের বিনিময় হারের কারণে লোকসানে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। এটা নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা গভর্নরকে বলেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসায়ী সমাজ অর্থনীতির পক্ষে। সরকারের যে কোনো ভালো পদক্ষেপে তারা সহায়তা করবেন।’

বিগত সরকারের সময়ে ভুল তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে যেসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেগুলো পুনর্বিবেচনার কথা বলেছেন ব্যবসায়ীরা। এই বিষয়টি জানিয়ে মোহাম্মদ হাতেম সাংবাদিকদের বলেন, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া ভুল তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে রপ্তানিপ্রণোদনা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব বিষয় পুনর্বিবেচনা করা দরকার।

দুর্বল ও সমস্যাযুক্ত ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে আর সহায়তা দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, হঠাত্ করে ব্যাংক বন্ধ করে কিংবা ব্যাংকের জন্য টাকা ছাপিয়ে কোনো সমাধানের পথে যাওয়া যাবে না।

গভর্নর জানান, ১ হাজার টাকার নোট বাতিলের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। ফলে এটা নিয়ে যেন গুজব ছড়ানো না হয়। তবে দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভাঙার বিষয়টি তাদের বিবেচনায় রয়েছে।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর দুর্বল পরিস্থিতি ও চলমান অস্থিরতা নিয়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। এসব ব্যাংকের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কী ভাবছে, তা জানতে চান তারা। জবাবে গভর্নর বলেন, এত দিন যা হওয়ার, তা হয়েছে। এখন ঐ ব্যাংকগুলোকে উদ্ধারের প্রক্রিয়া আলাদা হবে। তবে ব্যাংকগুলো থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যেন আর টাকা সরাতে না পারেন, সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকিং কমিশন গঠন হলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংখ্যা কমিয়ে বা তাদের একীভূত করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু ব্যাংক বন্ধ বা টাকা ছাপিয়ে তা সমাধান করা হবে না।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো থেকে গ্রাহকেরা আমানত তুলে নিচ্ছেন, জানিয়ে গভর্নরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকেরা। এ প্রসঙ্গে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমানত তুলে নেওয়া আমানতকারীর সার্বভৌম অধিকার। আমানতকারীরা নিরাপদ বোধ না করলে তারা টাকা তুলে নেবেন। সরকার সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার ওপর আমানতকারীদের আস্থা না থাকলে সেই ব্যাংক চলতে পারে না। সব সময় এমন ব্যাংককে উদ্ধার করতে যাওয়া ঠিক নয়। এই পরিস্থিতির জন্য ঐ ব্যাংক কর্তৃপক্ষই দায়ী; তারা নিজ দায়িত্বে এ অবস্থায় নিয়ে গেছে। ফলে আমরা তাদের এখন কোনো সহায়তা দেব না।’

সভায় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, তারা ব্যাংক থেকে টাকার জোগান কম পাচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে টাকা ছাপিয়ে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। এটা করতে হবে আমানত সংগ্রহের মাধ্যমে। ব্যাংকে তারল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়িয়ে তা দিয়ে আমানতের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো গেলে ঋণের সরবরাহও বাড়বে। পাশাপাশি সরকার বাজেটের জন্য যে বিপুল অর্থ ব্যাংক থেকে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিল, তা-ও কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

ইত্তেফাক/এমএএম