ফেনীর বন্যা

দুঃস্বপ্নের মতো দিনগুলো

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৪, ১৮:০৪

অর্ধশত বছর কিংবা তারও বেশি সময়ের মধ্যে এবার বন্যার কারণে সবচেয়ে তীক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন ফেনীবাসী। দুই মাসের মধ্যে তিনবার বন্যা; সর্বশেষ ১৯ আগস্ট শুরু হওয়া বন্যা ছাড়িয়ে গেল সবকিছুকেই। পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া - এলাকা তিনটি পাশাপাশি। তিন উপজেলার প্রশাসনিক বিভাজন ঘুচিয়ে দিয়েছে বন্যা। তারপর যোগ হলো ফেনী সদর। সবশেষে দাগনভূঁইয়া ও সোনাগাজী। বলা চলে, একে একে ডুবে যায় পুরো ফেনী। ভয়াল এই বন্যার কিছু খণ্ড চিত্র ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হলো-

সঙ্কটময় পরিস্থিতি ও রেহানের গল্প

একটা অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করা যাক। ফুলগাজীর উত্তর ধর্মপুর গ্রামটি একেবারেই নদীর কোলঘেঁষে। মুহুরী ও কহুয়া; দুই নদীর মিলনম্থল বলা যায়। গত মঙ্গলবার আমরাই প্রথম সেখানে খাদ্য ও মেডিকেল সামগ্রী নিয়ে সেখানে যাই। ওই গ্রামের প্রতিটি ঘরই অন্তত তিনদিন পানির তলায় ছিল। শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সবাই আশ্রয় নেয় উচু এক রাস্তায়, সেটাও ছিল স্যাঁতসেঁতে। আমরা যখন সেই গ্রামে প্রবেশ করি, সবাই অঝোরে কাঁদতে লাগলো। প্রথমত ক্ষুধার্ত, দ্বিতীয়ত প্রায় সবাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, বিশেষ করে শিশুরা। অনেকের ঘর ভেঙে মিশে গেছে মাটিতে। যোগাযোগ ব্যবস্থাও নেই, রাস্তার কিছু অংশ ভেঙে মিশে গেছে নদীতে। সব মিলিয়ে সবাই অসহায়।

গ্রামের ৬১ বছরের হাজেরা বেগম বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রটাও অনেক দূরে। প্রথমদিকে তারা মসজিদের ছাদে আশ্রয় নেন। নাতির সাহায্য নিয়ে ছাদে উঠে শুধু প্রাণটা বাঁচাতে পেরেছেন। প্রথম তিন দিন কোনো খাবারই জোটেনি। শুধু পানি খেয়ে ছিলেন।'

ওই রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় চোখে পড়লো কিছু বই, যেগুলো জামা-কাপড়ের সঙ্গেই শুকানো হচ্ছে। জানতে পারলাম, রেহান (৮) তার বইগুলো বন্যার পানি থেকে খুঁজে শুকাতে দিয়েছে। রেহান, দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। বন্যায় তাদের ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ড। রাস্তার উপরই তাবু খাটিয়ে বসবাস করছে তাদের পরিবার। তার বইগুলোর কিছু পৃষ্ঠা ছিঁড়েও গেছে। তার এখন একটাই চিন্তা, 'এসব ছেঁড়া বই নিয়ে গেলে শিক্ষক বকবে কি-না।'

নিশ্চয়ই, ফেনীতে উত্তর ধর্মপুরের মতো গ্রাম একটি নয়। এমনকি এরচেয়েও সঙ্কটময় পরিস্থিতি থাকতে পারে অনেক গ্রামে।

ফেনী শহরের দৃশ্য পাল্টে প্রতি ঘণ্টায়

বুধবার (২১ আগস্ট) বিকেলে যখন ফেনী শহরে পৌঁছাই, তখন থেকেই লোডশেডিং শুরু। দোকানে দোকানে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার হিড়িক। মোমবাতি, কয়েল ও টর্চ লাইটের সঙ্কট বেশ তীব্র। ব্যবসায়ীরা গুদামের চাল, ডাল ও অন্যান্য পণ্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

সেদিন সন্ধ্যায়ও ফেনী শহরের বেশিরভাগ রাস্তায় যানবাহন চলাচল করতে পারছিলো। শহরের একাডেমি রোড সবচেয়ে নিচু হওয়ায় সেখানে হাঁটু পরিমাণ পানি ছিল। তবে বৃষ্টি না থামায় শহরের জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছিলো বাকি রাস্তাগুলোও। নানা শঙ্কা ও আতঙ্ক নিয়ে সেদিন রাতে শহরের উঁচু ভবনের মানুষগুলো হয়তো ঘুমিয়েছে; অনেকে আবার আশ্রয় নিয়েছিল রেলস্টেশনে।

পরদিন সকালে ফেনী শহরের যে দৃশ্য দেখা গিয়েছিল, তা কখনো কল্পনাই করেনি কেউ। পুরো শহরে থৈ থৈ পানি। কোথাও ৬ ফুট, কোথাও ৪ ফুট পানি। শত শত মানুষ রাস্তায় গলা পরিমাণ পানিতে দিগবিদিক ছুটছে। স্বেচ্ছাসেবক ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা নৌকা নিয়ে পানিতে আটকে পড়া শহুরে মানুষদের উদ্ধার করছেন। এদিকে অনেকে বুধবার বিকেল থেকেই ঢাকা-চট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে হাসপাতাল মোড়ে আটকা পড়েছেন; কারণ ফেনী থেকে ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরামের যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছিল।

মহাসড়কেও তীব্র স্রোত

বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম অংশে পানির তীব্র স্রোত দেখা দেয়। যার ফলে সড়কে দীর্ঘ যানযটের সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে প্রাইভেট কার, ট্রাক, বাস, কাভার্ড ভ্যানসহ সকল প্রকার যানবাহন। বলা চলে, ফেনীর সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ থমকে যায়। দুপুরে তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা দেখা দেয় ফেনীর লালপোল ও লেমুয়া অংশে। এক পর্যায়ে লেমুয়া ব্রিজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রওনা হওয়া স্বেচ্ছাসেবকরাও আটকে যান যথারীতি। কোনো কোনো নৌকাবাহী ট্রাক চট্টগ্রাম থেকে ফেনীপর্যন্ত আনতে ১৫/২০ ঘণ্টাও লেগে যায়।

স্বেচ্ছাসেবকরা আসেন সারাদেশ থেকেই

ব্যাপক এক আন্দোলনে সরকার পতনের পর পুলিশসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা যখন নড়বড়ে, তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে এই বন্যা। তবে সেই বন্যা মোকাবেলায় সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সাড়াও দেখা গেছে। ফেনীর এই আকস্মিক বন্যার খবর পেয়ে সারাদেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবকরা ছুটে আসতে শুরু করেন। বৃহস্পতিবার থেকেই নৌকা, ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে জড়ো হতে শুরু করেন ফেনী শহরে। শহরের সালাহউদ্দিন মোড়, দোয়েল চত্বর ও হাসপাতাল মোড় থেকে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর মহাযজ্ঞ।

সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজে ও রোদ্রে শুকিয়ে ফেনীর বিভিন্ন জায়গায় তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে, রাতে মাথা গোজান ঠাঁই খুঁজতেন। মসজিদ-মন্দির, ট্রাক, কার্ভার্ড ভ্যানে রাত কাটান অনেক স্বেচ্ছাসেবক। আবার অনেক তরুণকে ফুটপাতেও গা এলিয়ে দিতে দেখা গেছে। তাদের এই আত্মত্যাগ মনে গেঁথে রাখার মতো।

মহামায়া একটি উদাহরণ

সারাদেশের স্বেচ্ছাসেবকরা তো বটেই, ফেনীর বিভিন্ন এলাকার তরুণদের একতাবদ্ধ হয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোটা ছিল দেখার মতো। আমি আমার নিজ এলাকা ছাগলনাইয়ার মহামায়ার কথাই উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি। তারা বন্যা কবলিত এলাকায় গিয়ে মানুষকে যেভাবে উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় এনেছে, তা দৃষ্টান্তই বলা যায়। তাদের কাছে ছিল না লাইফ জ্যাকেট, পর্যাপ্ত নৌকা; বৃদ্ধ- শিশুদের কোলে তুলে পানিতে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল।

রাজনীতি বা সংগঠনের উর্ধ্বে গিয়ে সবাই এক হয়ে কাজ করাটা বেশ আনন্দের ব্যাপার। বুধবার থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তারা এমন এমন এলাকায় উদ্ধারকর্ম ও ত্রাণ বিতরণের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন, সেখানে তারাই প্রথম গিয়েছিলেন অতি দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে। পার্শ্ববর্তী এলাকা গতিয়ার সোনাপুরের অনেকে বলেছেন 'চাঁদগাজীর (মহামায়া) ছেলেপেলেগুলো না থাকলে, আমাদের এলাকার অনেক মানুষই ভেসে যেতো।'

নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন ও প্রবাসীদের উৎকণ্ঠা

বাংলাদেশে যেসব জেলাগুলোতে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসে, তার একটি ফেনী। গত সপ্তাহের আকস্মিক এই বন্যা যেখানে ভয়াল হয়ে দেখা দিয়েছিল, সেই এলাকা হচ্ছে ফেনীর ভারত সীমান্তের উপজেলা ছাগলনাইয়া। সেখানে টানা ৭দিন বিদ্যুৎ ছিল না, বন্ধ ছিল মোবাইল নেটওয়ার্কও। যেহেতু এই অঞ্চলের বেশিরভাগ তরুণই প্রবাসী, তাদের মধ্যে বন্যা নিয়ে উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। তাদের পরিবার-পরিজন, ঘরবাড়ি কতটুকু নিরাপদ; তা জানতে রাত-দিনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু নেটওয়ার্ক না থাকায় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তারাও। অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে দেশেও চলে আসেন।

ছাগলনাইয়ার নাজমুল হাসান ও তার বাবা ইতালিতে থাকেন। বাড়িতে মা ও ছোটভাইকে রেখে গেলেও, বন্যায় ইন্টারনেট ও ফোনে কোনো যোগাযোগই করতে পারেননি। পরবর্তীতে জরুরিভাবে দেশেই চলে আসেন তিনি। নাজমুল জননান, এমন বন্যার মুখে তারা কখনও পড়েননি, ফলে প্রস্তুতি নেয়ার অভিজ্ঞতাও কারও নেই। তাই অতিরিক্ত চিন্তায় সরাসরি ফেনীই চলে আসি ইতালি থেকে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন ভঙ্গ

ভয়াবহ বন্যায় কেড়ে নিচ্ছে হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর স্বপ্ন। ফেনী শহরতলীর পশ্চিম সোনাপুরে মাজার গেইট এলাকায় ছোট একটি দোকানের রোজগারে সংসার চলে শহিদুল ইসলাম সাহেদের। তার পরিবারে দুই সন্তান, স্ত্রী, ৪ বোন। বন্যায় কেড়ে নিলো তার সহায়–সম্বল। ৬ দিন ধরে ৫ ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে বসতঘর, দোকান ও গোড়াউন। সামনের দিনে আয়–রোজগার নিয়ে দুশ্চিন্তায় চোখে নেই ঘুম তার। ৮ লাখ পুঁজি তারম মধ্যে ৫ লাখ টাকা ঋণ এ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর। 

ব্যবসায়ীর স্ত্রী মর্জিনা আক্তার জানান, স্বামীর ব্যবসা ও নিজের সাজানো সংসার লন্ডভন্ড করেছে বন্যার পানি। ডুবে গেছে আসবাপত্র, সন্তানের বই খাতা। ঘরের মেঝে ভাসছে রান্নাঘরের সব জিনিসপত্র। কষ্টে বুকভরা কান্নায় বলছে প্রাণ নিয়ে কোনোমতে এক কাপড়ে দিন পার করছেন।

সাহেদের মতো হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর এখন এমন পরিস্থিতি ফেনীর প্রতিটি এলাকায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেকের দোকান বন্যার পানিতে বিলিন হয়ে গেছে।

ভারতের সমালোচনা

ফেনীতে বন্যার্তদের দেখতে যান যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর সাংবাদিক রেবেকা রাইট এবং আন্না কোরেন। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং ফেনীর মানুষদের সঙ্গে কথা বলে তারা একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। বন্যার বিবরণে তারা লেখেন, বুকসমান কাদাপানি ঠেলে তারা দেখেছেন ফেনীর মানুষ মাথায় ত্রাণের দ্রব্য নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে যাচ্ছেন। তারা কেউ এমন বন্যা কখনো দেখেননি ফেনীতে।

এ দুই সাংবাদিক বলছেন, বাংলাদেশ জুড়ে রয়েছে নদী ও জলপথ। মাছ ধরা এবং ধান চাষ এখানকার মানুষের অত্যাবশ্যক জীবিকার উৎস। দেশটি বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে পরিচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যা বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানব সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা বাড়িয়ে তুলেছে। তারপরও এ বন্যা ফেনীবাসীকে অবাক করেছে এবং ‘এখানকার লোকেরা ভারতের কর্মকর্তাদের দোষারোপ করেছে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ফেনী। সেখানকার বেশ কয়েকজন ব্যক্তি নয়াদিল্লিকে দায়ী করেছে যে তারা ত্রিপুরা রাজ্যের ডম্বুর বাঁধ থেকে কোনো সতর্কতা ছাড়া পানি ছেড়ে দিয়েছে। এ দুই সাংবাদিক যখন বন্যাকবলিত বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখনো কিছু লোক চিৎকার করে ভারতের সমালোচনা করেন।

যেমন- শরিফুল ইসলাম নামের ২৯ বছর বয়সী একজন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর্মী, যিনি ঢাকা থেকে অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে উদ্ধারকাজ শেষে ফিরছিলেন; তিনি বলেন, তারা গেট খুলেছিল, কিন্তু কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। যদিও ভারত জানিয়েছে, ইচ্ছাকৃতভাবে তারা বাঁধ ছেড়ে দেয়নি। তারা বলেছে, অত্যধিক বৃষ্টির কারণে পানির তোড়ে স্বয়ংক্রিয় বাঁধের কপাট নিজেই খুলে গেছে। বাংলাদেশের বন্যার্তদের মধ্যে এখন ক্ষোভ বাড়ছে তাদের ঘরবাড়ি প্লাবিত পানির উৎস নিয়ে।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি