মালয়েশিয়া প্রবাসী ব্যবসায়ী শেখ সেলিম। তার গ্রামের বাড়ি গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ায়। বিয়ে করতে দেশে এলে ২০১৫ সালের নভেম্বরে তাকে আটক করা হয়। এর পর থেকে তার ওপরে চলে অমানুষিক নির্যাতন। ২০১৬ সালের মে মাসে তিনি ছয় মাসের জামিনে মুক্তি পান। কিন্তু এক মাসের মধ্যেই তার জামিন বাতিল করে আত্মসমর্পণ করতে বলা হয়। তখন তিনি পালিয়ে মালয়েশিয়া চলে যান। সম্প্রতি শেখ সেলিম তার আটক থাকা অবস্থায় আয়না ঘরের দুঃসহ নির্যাতনের কথা গণমাধ্যমের কাছে বর্ণনা করেন।
ব্যবসায়ী শেখ সেলিম বলেন, ‘একদিন আমাকে মেঘনা নদীর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। চোখ বাঁধা অবস্থায় ব্রিজের ওপর তোলা হয়। এ সময় একজন অপরজনের কাছে জানতে চায়। ওকে কি স্যুট করে মেরে ফেলব? উত্তরে ঐ লোক বলে, পেটে ব্লেড দিয়ে একটি পোঁচ দিয়ে দাও যেন লাশটা ভেসে না ওঠে—এমন সময় একটি ফোন আসে। ফোন আসার পরে আমাকে প্রচণ্ড মারতে শুরু করে। বলে তুই বলেছিলি তোদের কেউ প্রশাসনে নেই, এরপর তিন-চার জন মিলে আমার মুখের ওপর মারতেই থাকে। পরে আবার অন্য একটা জায়গায় নিয়ে যায়।’
সেলিম বলেন, ‘একদিন বিকালে আমি কাপাসিয়া ব্র্যাক ব্যাংকের পাশে আমাদের গ্যারেজে যাই। এ সময় আমার মোবাইলে ফোন আসে। তবে কোনো নম্বর দেখতে পাই না। শুধু রিং হচ্ছে—এমন সময় ছয়-সাত জন লোক আমার কাছে আসে, তাদের হাতে একটা মনিটরের মতো ছিল। আমাকে বলে, ‘তুমি সেলিম? আমি বলি হ্যাঁ। এ সময় তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে ওঠায়। পরে আমার হাত-চোখ বেঁধে ফেলে। রাজেন্দ্রপুর রেল ক্রসিং পার হওয়ার সময় আমি বুঝতে পারি। ক্যান্টনমেন্টের চেকপোস্টে গাড়িটা থামায়—প্রয়োজনীয় কথা শেষ করে তারা। গাড়িতে উচ্চ স্বরে গান বাজতে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে এক জায়গায় গাড়িটা থামে, একটি কেচি গেট খোলার শব্দ পাই। গাড়ি থেকে বের করে আমাকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামানো হয়। তারপর অনেক দূর হেঁটে যাই। একটি ঠান্ডা ঘরে আমাকে বসানো হয়। পরে আমার রক্তচাপ মাপা হয়। তারপর একজন নারী এসে আমাকে অনেক প্রশ্ন করে পরিবারেব কথা সব জানতে চায়। আমার কাছে জানতে চায়, আমি পঞ্চগড় গিয়েছি কি না। আমি না বলার পর জানতে চায় গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া আমি গিয়েছি কি না। আমার একই উত্তর। তারপর বলে কোটালিপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভায় আপনি বোমা পুঁতে রেখেছিলেন? তখন আমি বলি কোটালিপাড়ার নাম আমি আগে কখনো শুনিনি। তারপর আমার পরিবারে কেউ রাজনীতি করে কি না, আমার বয়স কত? আমার আসল নাম কী এমন সব প্রশ্ন করতে থাকে। তখন আমকে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। পরে অন্য রুমে নিয়ে চোখ খুলে দেয়। সেখানে দুই জনকে দেখতে পাই। এক জন এসে আমাকে জীবনবৃত্তান্ত লিখতে বলে, আমি লিখি। তারপর আবার চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার একই প্রশ্ন, আমি বোমা মেরেছি কি না? আমি একই উত্তর দিয়ে চলি। প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে আমকে প্রচণ্ড মারধর করে।’
পরে আমকে ডিবিতে আনা হয়—এর আগে আমাকে বলা হয় কোথায় ছিলে কেমন ছিলে কোনো কিছু কাউকে বলা যাবে না। বললে তুমি ও তোমার পরিবার শেষ। আমি বলি পরিবার নিয়ে বিদেশ চলে যাব, তারা বলে বিদেশে যেতে পারবে না। তোমার ওপর নজর রাখা হবে। আমাকে ডিবি কার্যালয়ে বন্দি করা হয়। আমি অনেক দিন সেখানে ছিলাম। আমার পরিবারকে ডাকা হয়। আমাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে ১৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু আমাকে ছাড়ে না। আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়ে অনেক মারধর করা হয়। রিমান্ডের কথা বলে আবার ৫ লাখ টাকা নেওয়া হয়। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আমার পরিবারের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। তারপর কোর্টে চালান করা হয়। আদালতে আমি বিচারককে সব জানাই। আদালত আমার পাসপোর্ট নম্বর নিয়ে সত্যতা নিশ্চিত করে। পরে মামলার কাগজপত্র ছুড়ে ফেলা হয়। বলা হয়— কী মামলা নিয়ে আসেন অভিযোগের সঙ্গে আসামির জবানবন্দির কোনো মিল নেই। সে দিনও টাকা নেওয়া হয়। তিন দিনের রিমান্ড ছিল। চার দিনের মাথায় আমাকে কেরানীগঞ্জ কারাগারে নেওয়া হয়। সেখান থেকে কাসিমপুর কারাগারে। কাসিমপুর থেকে আমি জামিন নিয়ে বের হই। দফায় দফায় টাকা নিয়ে আমার পরিবারকে নিঃস্ব করা হয়।
পরে আমি জানতে পারি মালয়েশিয়ার সেলিম নামের এক ব্যক্তি কোটালিপাড়ায় বোমা হামলায় জড়িত ছিল। ঐ সেলিমকে টার্গেট করে ওরা আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। যখন আমকে ছেড়ে দেয় তখন বলা হয়, এটা ওয়ানওয়ে রাস্তা কেউ এখান থেকে যেতে পারে না। আপনার কপাল ভালো ফিরে যেতে পারছেন। ছয় মাসের জামিন পাই। এক মাসের মধ্যেই ওরা জামিন বাতিল করে আমকে আত্মসমর্পণ করতে বলে। তবে আমি মালয়েশিয়ায় পালিয়ে আসি। এখানে আমাকে ওরা দূতাবাসের মাধ্যমে ধরতে চায়। আমি এসব কথা খুলে বলে সেখানে জাতিসংঘের সাহায্য চাই। পরে মালয়েশিয়া ইউএন অফিস আমাকে আশ্রয় দেয়। আমি নির্যাতনের বিচার চাই।
