কোটা সংস্কার ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান

মানসিক চাপ কাটাতে পারছেন না অনেকে

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১১:১১

দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গত ১৬ জুলাই থেকে দেশে ঘটে যাওয়া সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে সব বয়সের মানুষ। সৃষ্ট সহিংসতায় শত শত তাজা প্রাণ ঝরেছে, অসংখ্য মানুষ আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কষ্ট পাচ্ছে। এই সহিংসতা থেকে বাদ যায়নি শিশুরাও। হঠাত্ এত লাশ, রক্তের বন্যা, কিশোর-তরুণদের চোখ হারানো, হাত-পা  হারানোর ট্রমা পরিবারসহ যাদের জীবনে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছে তারা সবাই কমবেশি মানসিক ট্রমায় আছেন।

দেশে ঘটে যাওয়া এই রক্তক্ষয়ী সহিংসতা দেখেছে চিকিত্সক-নার্স, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। এছাড়া গুলির শব্দ, সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ, টিয়ার শেলের ধোঁয়া, বড় বড় ধারালো অস্ত্র দেখেছে কোমলমতি শিশুরাও। এত মারামারি, রক্ত আর বীভত্সতা দেখে অনেকে আহত ও নিহত হয়েছে এবং শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মানসিকভাবে ট্রমায় ভুগছেন। আন্দোলনের নির্মমতা নিজ চোখে দেখেছে শিশু-কিশোররা, এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে যে ট্রমা দেখা দিয়েছে, তার জন্য কাউন্সিলিংয়ের সুপারিশ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চোখের সামনে সহপাঠীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা, রক্তে ভিজে যাওয়ার মতো ঘটনা দেখেছে স্বজনেরা।

এছাড়া গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী মতাদর্শের ব্যক্তিদের পদত্যাগে বাধ্য করানো যে মহা উল্লাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে তা রীতিমতো সবার জন্যে আতঙ্কের। কর্মস্থলে লাঞ্ছিত বা নিগৃহীত হওয়ার ভয়ে অনেকে ছুটিতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকে আবার সময়ের আগেই অবসরে যাচ্ছেন। 

এদিকে গত ২৫ আগস্ট শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এ বিষয়ে বলেছেন, বল প্রয়োগ করে কাউকে পদত্যাগ করানো যাবে না। যদি কারো বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত অভিযোগ থাকে, তাহলে তার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করে অস্থিরতা সৃষ্টি করলে প্রশাসন ভেঙে পড়তে পারে।

শিক্ষা উপদেষ্টার এই নির্দেশনার আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বল প্রয়োগ করে প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। সম্প্রতি ২৭ আগস্ট, অপমানের ভয়ে রাজধানীর নীলক্ষেত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষদের জোর করে পদত্যাগ করানোর ঘটনা ছাড়াও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এই পরিস্থিতি দেখা গেছে। এমন সহিংসতায় ট্রমায় ভুগছেন অনেক কিশোর ও পূর্ণবয়স্ক মানুষও।

বঙ্গভবনের সামনে মিছিল নিয়ে জড়ো হয়েছে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। ছবি: তানভীর আহাম্মদ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার বলেন, এত বীভত্স দৃশ্য এর আগে দেখিনি। খেতে বসলেই রক্ত দেখি, ঘুমাতে গেলেই মায়েদের কান্না শুনি, হাসপাতালের আর্তনাদ শুনি। রাতে ঘুমের মধ্যে এসব নিয়ে দুঃস্বপ্নও দেখছি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সংবাদ কর্মী বলেন, সেদিন হাসপাতালে আহত শিশু-কিশোরদের দেখে, অফিসে ফিরে সে সবের বিষদ বর্ণনা দিতে গিয়ে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি, অন্য একজন সংবাদকর্মী বলেন, আন্দোলনে জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে গিয়ে দেখি আমার পাশেই একজন গুলি লেগে পড়ে গেল, আমি তাকে বাঁচাতেও পারলাম না—এই  অনুশোচনাগুলো কোনোভাবেই ভুলতে পারি না। খবরের সন্ধানে সারাক্ষণেই এসব সহিংসতার খোঁজ রাখতে হয়, এখন নিজের অজান্তেই মিছিলের শব্দ শুনতে পাই, অন্য যে কোনো শব্দ শুনলেই মনে হয়, আবার কি কোথাও গুলি বা সাউন্ড গ্রেনেড পড়ছে!

পঙ্গু হাসপাতালে আহত ইমন কবীর বলেন, এখনো মনে হয় ঘটনাগুলো যদি দুঃস্বপ্ন হতো। গুলিতে এক পা হারানো ১৭ বছরের রাকিব বলেন, এখনো মনে হয় আমার পুরো পা-টাই আছে। ঘুম ভেঙে গেলে যখন হাত দিয়ে দেখি আমার পা-টা নাই তখন খুব কান্না আসে, কষ্টে বুক ফেটে যায়। মায়ের কথা ভেবে কাঁদি না, আমার মা আমার টেনশনে ঠিকমতো ঘুমায় না।    

তেজগাঁও রেললাইন অবরোধ করেছে কোট আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। ছবি: আব্দুল গনি

 কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে দেশের অসংখ্য শিশু-কিশোর ও বড়রা ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন; তেমনি এই সহিংসতায় আহত কিশোর-তরুণ ও তাদের স্বজনরাও ট্রমায় ভুগছেন। গত সোম ও মঙ্গলবার জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং পঙ্গু হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, আহত অনেকে শরীরের একটি অঙ্গ হারিয়ে মানসিক চাপে পড়েছেন।     

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু-কিশোর ও পারিবারিক মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এ সব ঘটনাকে আমরা মনোসৃষ্ট দুর্যোগ বলি, এটা এক ধরনের ডিজাস্টার। শুধু শিশু নয়, শিশু বয়োবৃদ্ধ, এখানে যারা রাস্তায় থাকে, যারা সংবাদকর্মী, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যারা চিকিত্সা দিচ্ছেন, তাদের সবার মধ্যে কোনো না কোনো মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে। তবে শিশুদের মানসিক ট্রমার পরিণতি একটু দীর্ঘমেয়াদি হয়। এতে তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, তাদের মধ্যে ভয় কাজ করে, অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, স্ট্রেজ-এনজাইটি তৈরি হয়। তাদের ঘুমের সমস্যা হতে পারে, মনোযোগের সমস্যা হতে পারে, লেখাপড়ার সমস্যা হতে পারে এবং তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা হতে পারে। দেখা যায় তারা একটুতেই বিরক্ত হচ্ছে, কান্না করছে।

এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে এই মনোচিকিত্সক বলেন—যা ঘটে গেছে তা ফেরত আনা সম্ভব নয়; ফলে যে ক্ষতি হয়ে গেছে তা রিপিয়ার করা ছাড়া, কিংবা এটা যেন আর না হয়, তার চেষ্টা করতে হবে। শিশুদের সাহস দিতে হবে, শিশুদের সঙ্গে বাবা-মা বা কাছের মানুষ যেন গুণগত সময় দেয়। হঠাত্ করে ভাঙচুর হয়েছে, সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শিশুদের ভীত করেছে। এসব প্রত্যেকটি জিনিস আমাদের মনে রাখতে হবে। সংকট নিরসনের উপায় হচ্ছে অন্যের মতামতের ওপর শ্রদ্ধা রাখা। ফলে আমরা শিশুদের অন্যের মতামতের ওপর শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাব, সামাজিক দক্ষতা শেখাব। শিশু থেকে বড়রা সবার ঘুমের সময়টা লক্ষ রাখতে হবে, যেন সময়মতো রাতে ঘুমায় এবং দিনে প্রাণবন্ত থাকে।

ইত্তেফাক/এএইচপি