উচ্চ আদালতের রায়কে কেন্দ্র করে কোটা সংস্কারে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও ছাত্র সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগে সেই আন্দোলন এক পর্যায়ে রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সেই আন্দোলনকে দমাতে ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। প্রাণ হারায় শিক্ষার্থীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ। কিন্তু তারপরও দমানো যায়নি ছাত্র-জনতাকে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে ডাক আসে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই কর্মসূচি ঠেকাতে রাতেই জারি করা কারফিউ। মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। ৫ আগস্ট সেই কারফিউ ভেঙ্গে রাজধানীর অলিগলিতে অবস্থান নেন ছাত্র-জনতা। তাদেরকে মূল সড়কে উঠতে বাধা দেয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বেলা দুইটার সময় গণমাধ্যমে খবর বের হয় পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার রাজপথসহ সারাদেশে নেমে পড়েন লক্ষ লক্ষ ছাত্র-জনতা। তারা একে অপরকে ঘিরে ধরে বিজয় উল্লাস করতে থাকেন। নানা স্লোগানে প্রকম্পিত হয় রাজপথ। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ জড়ো হন শাহবাগে। সেখান থেকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের দিকে যাত্রা করে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-জনতা। গণভবনের পাশাপাশি জাতীয় সংসদ ভবনেও অবস্থান নেন তারা। সেই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের এক মাস পূর্তি আজ।
আজ ঢাকায় ‘শহীদি মার্চ’ কর্মসূচি পালন করবে বৈষ্যমবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এই আন্দোলনে আট শতাধিক মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর আওয়ামী লীগ সরকারের সব মন্ত্রী-এমপিসহ অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ।
কোটাপ্রথা নিয়ে এবারের আন্দোলন ছিল শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় দফা আন্দোলন। এর আগে ২০১৮ সালে আন্দোলন কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়েছিল। তখন আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধাসহ চাকরিতে সকল কোটা পদ্ধতি বাতিল করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৫ জুন হাইকোর্টের এক রায়ে চাকরিতে ফিরে আসে কোটা পদ্ধতি। কোটা পুনর্বহালের হাইকোর্টের রায় স্থগিতের জন্য দুই দফা আপিল বিভাগে আবেদন করেও ব্যর্থ হয় রাষ্ট্রপক্ষ। এরই মধ্যে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলা আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। তারা শাহবাগে অবস্থান করেন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শুরুতে তাদের উপর কোন ধরনের বল প্রয়োগ করেনি। চীন সফর শেষে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ করে ছাত্ররা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলা ওই বিক্ষোভ মিছিলে হামলা চালায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আহত হয় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী। এই হামলার পরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। তখন ছাত্রলীগসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। সেই সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গুলিতে ১৬ জুলাই প্রাণ হারান রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। ওই দিন সারাদেশে মারা যায় ৬ জন।
আন্দোলন সফল করার জন্য ৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি ঘোষণা করে, যার মধ্যে ২৩ জন সমন্বয়ক ও ৪২ জন সহ-সমন্বয়ক ছিলেন। আন্দোলনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার পর তিন আগস্টে সংগঠনটি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে ১৫৮ সদস্যের সমন্বয়ক দল গঠন করে, যার মধ্যে ৪৯ জন সমন্বয়ক ও ১০৯ জন সহ-সমন্বয়ক ছিলেন।
৬ জুলাই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের দিনের মতোই বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় আন্দোলনকারীরা সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, ছাত্র ধর্মঘট এবং সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের ডাক দেন। এর নাম দেওয়া হয় ‘বাংলা ব্লকেড’। ৭ জুলাই বাংলা ব্লকেডে স্থবির হয়ে পড়ে রাজধানী। অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা করা হয়। ৮ জুলাই ঢাকার ১১টি স্থানে অবরোধ, ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, তিনটি স্থানে রেলপথ অবরোধ এবং ছয়টি মহাসড়ক অবরোধ করা হয়।
১৬ জুলাই সারা দেশে দিনভর ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকার সমর্থকরা। রংপুরে আন্দোলনকারী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের বুলেটে নিহত হন। ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বিতাড়ন করে ‘রাজনীতিমুক্ত’ ঘোষণা দেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র বিক্ষোভ, সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, গায়েবানা জানাজা, কফিন মিছিল এবং দফায় দফায় সংঘর্ষ ও পালটাপালটি ধাওয়ার ঘটনা। ১৮ জুলাই দেশব্যাপী প্রতিরোধ, সহিংসতা, সংঘর্ষ ও গুলি করা হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারা দেশ ছিল প্রায় অচল। রাজধানী ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ, পালটাপালটি ধাওয়া, পুলিশের হামলা-গুলি ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নিহত ও আহত হয়েছেন অনেকেই। ফলে সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এদিন রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯ জুলাই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীরা জানান, ৯ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত চলবে ‘শাটডাউন’।
ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জনসাধারণ রাস্তায় নেমে পড়েন। আন্দোলন তীব্র গতি পায়। সারা দেশের মানুষ ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে। ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। দুপুরে জাতির উদ্দেশে ভাষণে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এ কথা জানান।
